রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই ছাড়া অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয় || আজফার হোসেন

ওই কথাটা আবারো ফিরে এলঃ আমরা বাস্তববাদী কেননা আমরা "অসম্ভব"-এর স্বপ্ন দেখি। জানি, তথাকথিত "বাস্তববাদীরা" বিপ্লব কথাটা নি...

ওই কথাটা আবারো ফিরে এলঃ আমরা বাস্তববাদী কেননা আমরা "অসম্ভব"-এর স্বপ্ন দেখি। জানি, তথাকথিত "বাস্তববাদীরা" বিপ্লব কথাটা নিয়ে হাসাহাসি করেন, টিটকারি দেন, যারা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন তাদের উজবুক বলেন। তাহলে "উজবুকের" পক্ষেই আমি।

কিন্তু, সত্যি, যারা বিপ্লবকে তাদের স্বপ্ন থেকেই মুছে ফেলেছেন, তারা তো তাদের মতো করেই থাকে্ন, তার বেশী কিছু না। কিন্তু এও বোধ করি সত্য যে, একটি নির্দিষ্ট ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের সঙ্গে বিপ্লবের মেলা পার্থক্য আছে, যদিও একটি ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন বিপ্লবে রূপান্তরিত হতে পারে--কে জানে? তবে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন সেই দাবী তোলে যা বিরাজমান ব্যবস্থায় মেটানো সম্ভব আর বিপ্লব সেই দাবি তোলে--সেই "অসম্ভব" দাবি--যা বিরাজমান ব্যবস্থায় মেটানো সম্ভব না বলেই তাকে সে ভেঙ্গে ফেলেই নতুন ব্যবস্থার দিকে এগুতে চায়।

সত্য, আন্দোলনের জন্য সুনির্দিষ্ট ইস্যু চাই, কিন্তু সেই ইস্যুগুলাকে কি এমন ভাবে তোলা বা সাজানো সম্ভব যাতে কান-টানলে-মাথা-আসার মতো পুরা ব্যবস্থাকেই সবসময়ই দৃষ্টিতে রেখে তাকে চ্যালেঞ্জ করা যায় এবং কমপক্ষে তাকে সংকটাপন্ন করে তোলা যায়। আর ওই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং বদলানোর আরেক অর্থ হচ্ছে আমাদের শাসক শ্রেণীর রাজনীতিকেই উচ্ছেদ করার লক্ষে লড়াই করা।

আসলে গোটা ব্যবস্থাটাই এমন যে, দেশের শাসক শ্রেণী, 'মূলধারা'র রাজনীতিক, বিত্তশালী ব্যাবসায়ী, প্রভাবশালী আমলা ও শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলো এবং বাইরের মাল্টিন্যাশনালগুলোও একটা "orchestrated class alliance"-এর ভেতর দিয়ে কাজ করে থাকে নিজেদের স্বার্থেই, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের বিপক্ষেই।

মেয়েরা যে আরো ধর্ষিত হবেন, শ্রমিকরা যে আরো পুড়ে মরবে্ন, সাধারণ মানুষের দুর্দশা যে আরো বাড়বে, এবং দেশের নিরাপত্তা ও এমনকি সার্বভৌমত্ব যে আরো বিঘ্নিত হতে থাকবে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কারণ নাই, কেননা আমাদের দেশে তিলে তিলে তিলোত্তমা করে গড়ে উঠেছে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তা দেশকে সাধারণ মানুষের জাহান্নাম করার পক্ষে আগেও ছিল, এখনো আছে।

তাই সর্বসাধারণের বড় মাপের এবং লাগাতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই ছাড়া অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। আর বসে থেকে হতাশ হয়ে পড়লে, কিংবা 'সিনিক' হয়ে পড়লে, ওই পরিবর্তনের বিরুদ্ধেই তো কাজ করা হয়।

Theoretical Casteism || Azfar Hussain

The more I read B.R. Ambedkar's 1946 essay called "Caste, Class, and Democracy"--better known as "What Congress and Gandh...

The more I read B.R. Ambedkar's 1946 essay called "Caste, Class, and Democracy"--better known as "What Congress and Gandhi Have Done to the Untouchables" (I also keep thinking of Ambedkar's 1943 speech "Ranade, Gandhi and Jinnah")--the more I see how the general critique of "nationalism"--feminist, leftist, subaltern, regionalist, all--has rendered the question of "caste" marginal, if not always totally absent. True, "nationalism" is no "unitary" thing, as Aijaz Ahmad rightly pointed out quite some time back; but there's the putative conflation of class and caste, instead of a dialectical relation between the two, in even some "Marxist" analyses. In other words, even when the question of caste surfaces, it either gets dissolved in class or it just becomes an addendum (as a result of an afterthought). Or caste is consigned to a blank, let alone being "organic" to their critiques of nationalism. Read in the light of Ambedkar's work, the entire theoretical and critical machinery mobilized in the critique of nationalism comes to reveal what might be called "theoretical casteism," so aggressively prevalent in South Asia, I reckon.

এমে সেজেয়ার || আজফার হোসেন

এমে সেজেয়ার! শুধু ক্যারিবীয় সাহিত্য ও রাজনীতিতে কেন, কিংবা শুধু আফ্রিকার সাহিত্যেই-বা কেন, বলা যাবে যে, গোটা এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার...

এমে সেজেয়ার!
শুধু ক্যারিবীয় সাহিত্য ও রাজনীতিতে কেন, কিংবা শুধু আফ্রিকার সাহিত্যেই-বা কেন, বলা যাবে যে, গোটা এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও রাজনীতির পরিসরেই এই ক্যারিবীয় কবি-তাত্ত্বিক-অ্যাক্টিভিস্ট এমে সেজেয়ারের বয়ান ও জবান একইসঙ্গে টগবগ করে ফুটছে ইতিহাসের চুল্লিতে। এই বয়ান ও জবান একইসঙ্গে এখনও দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে কবিতা ও তত্ত্ব যুগপৎ বিস্ফোরণের আকার ধারণ করে; কিভাবে একেকটি শব্দ হাতবোমা হয়ে নিক্ষিপ্ত হয় পশ্চিমা অধিবিদ্যা আর পশ্চিমা মানবতাবাদের ঝলমলে রেটোরিকের চোখে মুখে; কীভাবে ‘সমুদ্রের মতো ঝাঁপিয়ে পড়া চিত্রকল্প সব’ (সেজেয়ারের নিজস্ব ভাষ্য) করে রব যুগ-যগ জমাট-বাঁধা নৈঃশব্দের গভীরে; এবং কীভাবে অচেতন নিজেই হয়ে ওঠে ভাষার মতো, যে ভাষায় আফ্রিকা খুঁজে পায় তার দেহ, যে ভাষায় পৃথিবীর তাবৎ কালো মানুষের ক্ষোভ, ধিক্কার, বিকার, যন্ত্রণা, আর্তনাদ, হতাশা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, সৃষ্টি-সুখের উল্লাস, আত্মাবিষ্কারের আনন্দ ইত্যাদি বিভিন্ন চেহারায় উপস্থিত হয়ে ইতিহাসকে হেগেলীয় বর্ণবাদী ইউরোপকেন্দ্রিকতার বাইরে নিয়ে আসে।

হাঁ, পশ্চিমা মেটাফিজিকসের বর্ণবাদী ও ইউরোপকেন্দ্রিক সংস্করণের অন্যতম প্রতিনিধি হেগেলের সঙ্গে তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিরোধে জড়িয়ে থাকেন এমে সেজেয়ারসহ একাধিক কালো লেখক--সেই ক্যারিবীয় ঔপন্যাসিক জর্জ ল্যামিং থেকে শুরু করে কেনিয়ার ঔপন্যাসিক-নাট্যকার তাত্ত্বিক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো। তবে ফিরে আসা যাক এমে সেজেয়ারের জবান ও বয়ান প্রসঙ্গে।

ওই জবান ও বয়ানের মৃত্যুহীনতা নিয়ে এক তরুণ কালো কবির কিছু পঙক্তি উপস্থিত করা যায়। কিউবার কবি। কিউবার বাইরে তেমন পরিচিত নন। নাম ভিক্তর বেম্বা। আমার দ্রুত অনুবাদে তাঁর কয়েকটি পঙক্তি:

সেজেয়ার, তোমার শব্দ সব জ্বলে দাউদাউ
তোমার শব্দ সব গর্জে ওঠে নৈঃশব্দ্যের
আঁধার-চেরা দিগন্ত ভেদ করে, তোমার শব্দ সব
ইতিহাসের কক্ষপথ থেকে উঠে এসে বলে যায়:
‘আমরা আছি, আমরা থাকব, এইখানে, যুদ্ধে’।
বুলেটের খোঁচায় রক্তাক্ত তোমার শব্দ সব,
তোমার শব্দ সব তারপরও মার্চ করে অন্তহীন।

কবিতায় বেম্বার ভাষ্য হেগেলের টুপি-পরা বুর্জোয়া নন্দনতাত্ত্বিকদের ইঙ্গিতজ্ঞাপকতার মানদন্ডে যুৎসই ঠেকবেনা জানি। তবে বেম্বা স্পষ্টতই লক্ষ্য করেছেন সেজেয়ারের লড়াকু কাব্যতত্ত্বকেই। এ কাব্যতত্ত্বের মূল কথাটা তৃতীয় বিশ্বের আরেক লড়াকু কবি, লাতিন আমেরিকার অর্থাৎ এল সালভেদরের কমিউনিষ্ট কবি রোকে ডালটনের সেই বিখ্যাত 'মিলিট্যান্ট পোয়েটিকস'-এর সুবাদে এভাবে সাজিয়ে বলে নিতে চাই: ক্ষমতা-দখলের গুরুত্বপূর্ণ (একমাত্র না হলেও) শর্ত হচ্ছে ভাষা-দখল, কেননা ক্ষমতা-সম্পর্ক নিজেই যেমন ভাষা-সম্পর্ক, তেমনি ভাষা সম্পর্কও ক্ষমতা সম্পর্ক বটে।

এই ভাষা-দখলের ও ভাষা-সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজটাকেই এগিয়ে নিয়ে গেছেন ক্যারিবীয় কবি-তাত্ত্বিক-আ্যাক্টিভিস্ট এমে সেজেয়ার। তবে তাঁর জন্য কেবল ক্ষমতা নয়; ভাষা হচ্ছে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদ- বিরোধী লড়াইয়ের মোক্ষম অস্ত্র ও ক্ষেত্র।

Mike Marqusee || Azfar Hussain

Our comrade Mike Marqusee--writer, journalist, left political activist--died today (January 13, 2015) at 61 after a long and fearless strug...

Our comrade Mike Marqusee--writer, journalist, left political activist--died today (January 13, 2015) at 61 after a long and fearless struggle against cancer about which he wrote a beautiful, oppositional, life-affirming book _The Price of Experience: Writings on Living with Cancer_. It was just last month when I talked to Mike and enthusiastically told him how much my students and I enjoyed, and benefited from, his book on Dylan that I used in my class on Bob Marley and Bob Dylan last semester, a book that I even wrote about in my mother tongue. But Mike is surely more than his work on Dylan. In fact, his work on health issues (in defense of the National Health Service), on politics, on different aspects of popular culture, on the Indian subcontinent, and on cricket remains an inspiration to us. It's not for nothing that our comrade Mike Davis once described him thus: "Both in the eloquence of his writing and the deep humanism of his vision, Mike Marqusee stands shoulder to shoulder with the spirits of Isaac Deutscher and Edward Said."
Indeed, his principled, dignified indignation at the arrogance of power and his consistent anticapitalist-antiimperialist-antiracist voice continue to echo near and far with apt resonance. In other words, although Mike Marqusee is no longer with us physically, he'll continue to remain alive in his words and works--and in our words and works--as well as in our struggles against all forms and forces of oppression and injustice.

A few months back I had the pleasure of sharing with him a poem by the Salvadoran communist poet Roque Dalton--a poem that he loved. I think I'd do well to post that poem in his memory here:

Like You
by Roque Dalton
[Translated by Jack Hirschman]

Like you I
love love, life, the sweet smell
of things, the sky blue
landscape of January days.

And my blood boils up
and I laugh through eyes
that have known the buds of tears.

I believe the world is beautiful
and that poetry, like bread, is for everyone.

And that my veins don't end in me
but in the unanimous blood
of those who struggle for life,
love,
little things,
landscape and bread,
the poetry of everyone.

Badruddin Umar || Azfar Hussain

Yesterday (January 12, 2016) I spent quite an evening--charged and vibrant as it was--with none other than Badruddin Umar at his own residen...

Yesterday (January 12, 2016) I spent quite an evening--charged and vibrant as it was--with none other than Badruddin Umar at his own residence after nearly half a decade.

The poet Alfred Khokon generously accompanied me to Umar’s place. The country’s foremost Marxist thinker and most uncompromising militant activist--one who has been fearlessly speaking truth to power for nearly six decades now--Umar is the author of countless articles and more than a hundred books, some of which, including his monumental multi-volume work on our language movement, is groundbreaking. Indeed, we are yet to assess the entire range--staggering as it is--of Umar’s contributions to such areas as politics, the politics of culture, and historiography, among others. I had the privilege and honor of working with Umar quite closely for several years in the 1990s, as I worked as the Acting General Secretary of Bangladesh Lekhok Shibir (a national organization of writers, artists, and activists on the left), an organization founded by Umar, among others.

The evening yesterday was full of Umar’s energetic and spirited presence, accompanied by his unflagging verbal zest. He told Khokon and me many stories of his life, including the ones that are not covered in his multi-volume autobiography published now. Even at 84, Umar continues to "rub his conceptual blocs together in such a way that they catch fire," to use Marx’s own words. Although I worked quite closely with him, I did not know until yesterday that Umar could recite so wonderfully well! And he recited to us--at one point--verses first from Madhusudhan Dutta and then from Rabindranath Tagore. And finally from--guess what?--Ghalib and Faiz Ahmed Faiz. His memory and enunciation are both phenomenal at 84.

And speaking of Faiz, Umar fondly recalled his meetings with Faiz, while telling us how he felt when he received a lovely letter from Faiz at a time when Faiz was visiting Algeria, as Umar also fondly recalled his several conversations with the Marxist Ernest Mandel, the author of _Late Capitalism_ as well as his (Umar’s) exchanges with the American Marxist political economist Paul Sweezy, both of whom, so far as I know, respected Umar a lot for his work. It’s not that Umar always agreed with them, but his appreciation of their committed political work, by and large, appeared evident.

Our conversation with Umar was a freewheeling one. We talked about numerous things—way more things than I can possibly recount here. At one point when we asked him about his pathbreaking book on Iswarchandra Vidyasagar, he told us how it went almost unnoticed in our own country. But he gratefully acknowledged the enthusiastic responses to his work on Vidyasagar he had received from such figures as Kazi Abdul Wadud, Annada Shankar Roy, Abu Sayeed Ayub, Bishnu Dey, and--of course--the filmmaker-activist Ritwik Ghatak, some of whose "drunken" moments Umar joyously and humorously recalled in our conversation yesterday.

And, of course, we talked about Bangladesh and the future of revolutionary politics a great deal. I cannot go into the detail of that part of our conversation here, but I intend to write at some length about that part for Bidhan Rebeiro's magazine soon.

But one last thing: At one point when I impersonated my favorite writer and thinker and activist Ahmed Sofa bhai--who was, of course, a great admirer of Umar and who once ardently maintained, "I feel proud of being alive in the time of Umar"--my teacher and comrade Badruddin Umar couldn’t stop laughing. Umar knows how to laugh with his comrades and laugh at his enemies. Indeed, our evening yesterday was full of love and light and laughter.

Photo: Alfred Khokon

জীবনানন্দ দাশের ছোট গল্প এবং কিছু প্রসঙ্গ || আজফার হোসেন

বছর কয়েক আগে আমার একটা লেখায় জীবনানন্দ দাশের দুইটা ছোটো গল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। দারুণ উপেক্ষিত দুইটা ছোটো গল্প। গল্প দুইটা...


বছর কয়েক আগে আমার একটা লেখায় জীবনানন্দ দাশের দুইটা ছোটো গল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। দারুণ উপেক্ষিত দুইটা ছোটো গল্প। গল্প দুইটার নাম ‘হিসেব-নিকেশ’ এবং ‘কথা শুধু—কথা, কথা, কথা, কথা, কথা’। শেষের গল্পটা কিছুদিন আগে আবারও পড়লাম। এবং মনে হোলো ওই গল্পটার একটা ‘সিম্পটোম্যাটিক’ পাঠ সংক্ষেপে আবারও হাজির করি, ফেসবুকে আমার বন্ধুদের সঙ্গে সংহতির স্পিরিেটই।

তাহলে তাকানো যাক ওই গল্পটার দিকে, যার নাম ‘কথা শুধু—কথা, কথা, কথা, কথা, কথা’। এখানে ‘কথা’ শব্দটাকে অনায়াসে ‘টাকা’ পড়া যায়ঃ টাকা শুধু—টাকা, টাকা, টাকা, টাকা, টাকা। গল্পটা আন্তন চেকভ-এর ‘গুজবেরিস’ গল্পকে মনে করিয়ে দেয়, যে-গল্পে টাকার সঙ্গে ভাষার মিল খোঁজা হয়, যে-গল্পে টাকাই তো আসল কথা হয়ে ওঠে। চেকভ নিজেই বলেন, “ভদকার মতোই টাকা সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটায়”।

অন্যদিকে আবার জীবনানন্দ দাশের গল্পের ওই দুর্দান্ত, তুলনাহীন শিরোনাম কালো কবি ল্যাংস্টন হিউস-এর একটা ছোটো কবিতার কথাও মনে করিয়ে দেয়। কবিতাটাকে অবশ্য উল্টো দিক থেকে পড়ার কথা বলেছিলেন হিউস (বিশেষ করে নিচ থেকে উপর দিকে)ঃ

হাঁসফাঁস দামড়া হাঁস
পাড়ে

$$$$$
$$$$
$$$
$$
$

হ্যাঁ, ডলার বাড়তে থাকে, বাড়তেই থাকে, n-পদ পর্যন্ত। এই বাড়াটাই আচ্ছন্ন করে রাখে ‘কথা শুধু’ গল্পের প্রধান চরিত্র ভবশঙ্করের মনোজগৎকে।

কিন্তু কে এই ভবশঙ্কর? ‘কথা শুধু’ গল্পের শুরুতেই জীবনানন্দ দাশ ভবশঙ্করকে পরিচয় করিয়ে দেন এভাবেঃ “ভবশঙ্কর একটা মস্ত বড় বাঙালি লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান কিন্তু প্রত্যেক মিটিংয়েই সেক্রেটারি তাকে প্যাঁদায়”। প্যাঁদায়? জীবনানন্দের এই ‘প্যাঁদায়’ চিহ্নায়কটি যেন মুহূর্তেই বুদ্ধদেবীয় বাবু-বাংলাকে প্যাঁদাতে থাকে, এমনকি তার পোঁদে বা পাছায় লাথিও মারে।

সত্য, একবার কবিতায় জীবনানান্দ দাশ ‘ঠ্যাং’ শব্দটা ব্যবহার করাতে বুদ্ধদেবের বিস্ময় জেগেছিল (ইতিবাচক অর্থেই)। কিন্তু এও সত্য যে, ওই ‘প্যাঁদায়’ শব্দটা বুদ্ধদেবের ভাষিক মেজাজ থেকে তারার দূরত্বেই বিরাজ করে। এখানেই শেষ নয়। ওই দুইটা গল্পে জীবনানন্দ দাশ বেশ উৎসাহে ও উল্লাসে বেশ কিছু অনুকারাত্মক ও ধন্যাত্মক শব্দ ও পদ চালু রাখেন; শব্দগুলার একটা ফর্দ উপস্থিত করেছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য এক সময় এভাবেঃ “হালু হালু, টস টস, ফ্যা ফ্যা, ফুঃ ফুঃ, হি হি, খুচ খুচ, ঢুই ঢুই এবং তৎসহ গজকন্দা, দমফাই, মেয়ে পটকানো, গয়ারাম, গুখখুরি”। এবং ‘প্যাঁদায়’।

তাহলে ফিরে আসা যাক জীবনানন্দ দাশের ‘কথা শুধু’ গল্পের ভবশঙ্করের কাছে। এই ভবশঙ্কর উৎপাদন-সম্পৃক্ত পুঁজি নিয়ে কারবার করে না; বরঞ্চ টাকা দিয়ে আরও টাকা আনার ব্যাপারটা মুখ্য হয়ে উঠে ভবশঙ্করের কাছে। ভবশঙ্কর সকালের চায়ে ঠোঁট ভেজায়, সুরুত সুরুত করে চুমুক দেয়, টোষ্টে তেলতেলে জেলি মাখায়, ডিমের হলদে কুসুমে দাঁত বসায়, তারপর কামড়ে ধরে কলা। এরপর গুলতি মারার মতোই সে শব্দ মারেঃ “বিজনেসে লেগে থাকলে এই হবে শুধু—টাকা হবে, আরও টাকা হবে, আরও টাকা হবে, আরও টাকা হবে”।

ভবশঙ্করের জবানে জীবনানন্দ যে বয়ান পুরে দিয়েছেন, তা যেন কার্ল মার্কসের M-M’-এর প্রতিধ্বনি তোলে বারবার (যেখানে M মানে টাকা আর M’ মানে টাকা)। আর ওই M-M’ এর স্বার্থেই ভবশঙ্কর ভোল পাল্টাতে দ্বিধাবোধ করে না মোটেইঃ সে তার ফটকাবাজি বিভিন্ন এলাকায় জারি রাখে। উদাহরণ হিসাবে বলা যাবে আলবার্ট হলে লেফটদের সামনে ভবশঙ্করের বক্তৃতার কথা। প্রথমে সে ভুলে বলে ফেলে, “আমি বলশেভিক নই”। আর যায় কোথায়? অমনি আমজনতার শোরগোল ও ধিক্কার ওঠে। কিন্তু নিমেষেই ভবশঙ্কর ভোল পালটায়। জীবনানন্দ নিজেই তার গল্পে জানান দেনঃ “রাশিয়ার চাষাভুষোর গুণগান করলেন ভবশঙ্কর। নিতান্ত নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সোভিয়েতের গুণগান করলে, বলশেভিকদের জয়জয় করলে। জয়জয়কার পড়ে গেল ভবশঙ্করের”।

একেবারে ফটকাবাজির ওপর চোখ রেখেছেন জীবনানন্দ দাশ আর ধরিয়ে দিয়েছেন কীভাবে ভদকার মতোই টাকা সব অদ্ভুত কারবার করে।

টাকা কী কী করতে পারে তা বোঝানোর জন্য কার্ল মার্কস মাঝে মাঝে বেশ আগ্রহ নিয়ে শেক্সপিয়রকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর _ইকনমিক অ্যান্ড ফিলসফিক্যাল ম্যানিউস্ক্রিপটস_ নামের বইয়ে মার্কস দারুণভাবে টুকে দিয়েছেন শেক্সপিয়রের নাটক _টাইমন অফ এথেন্স_ থেকে বেশ কিছু লাইন। এভাবেই মার্কস বুঝিয়েছেন যে, টাকার জোরে এমনকি নিজের মুখ নিজের পোঁদকে চুমু খায়। আর টাকাকে বলা হয়েছে “দৃশ্যমান হলুদিয়া আল্লাহ”।

জীবনানন্দ দাশও তাঁর কিছু গল্পে ওই মুখ ও পোঁদের চুমাচুমির মুহূর্তকে পুঁজিবাদের একটা বিশেষ পর্বে খপ করেই ধরে ফেলেছেন, যে গল্পগুলোকে তাঁর অন্যান্য গল্প থেকে অনেক আলাদা মনে হয়।

এই অন্য স্বরের, অন্য সুরের, অন্য ভাষার এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির জীবনানন্দ দাশকেও চিনে রাখা দরকার।

ভালটার বেনজামিন: একটি সংক্ষিপ্ত নোট || আজফার হোসেন

ভালটার বেনজামিন: একটি সংক্ষিপ্ত নোট বোদলেয়র, কাফকা ও প্রুস্তের দুর্দান্ত পাঠ হাজির করেছিলেন জর্মন মার্কসবাদী সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক ভাল...


ভালটার বেনজামিন: একটি সংক্ষিপ্ত নোট

বোদলেয়র, কাফকা ও প্রুস্তের দুর্দান্ত পাঠ হাজির করেছিলেন জর্মন মার্কসবাদী সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক ভালটার বেনজামিন। তাঁর সেই বোদলেয়র পাঠ নিজেই তো অনন্ত পাঠযোগ্য। এখানে বিশেষ করে বলতে হয় বেনজামিনের কাজ ‘অন সাম মোটিফস ইন বোদলেয়র’ (১৯৩৯)-এর কথা। এই কাজে তিনি বিশেষ করে তিনটি বিষয়ে--শ্রেণী, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি বিষয়ে--তাঁর ধারণাকে উপস্থিত করেছেন। শুধু তাই নয়, ফ্যাসিবাদ এবং প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের তীব্র সমালোচনা করতে গিয়েই এসব ধারণাকে তিনি সামনে এনেছেন এবং বেনজামিনের বোদলেয়র পাঠে আমরা লক্ষ্য করি ফ্রয়েড ও লুডভিগ ক্লাগেসের ফ্যাসিবাদী নৃ-তত্ত্বের কিছু কৌশলের পাল্টা প্রয়োগ।

বস্তুক ও আধ্যাত্মিক ইডিয়মের রসায়নই বেনজামিনকে টেনেছে বোদলেয়রের দিকে। ধারণাটি যথার্থ দিয়েছেন আমাদের কমরেড রিচার্ড কার্নি। তবে বিশেষভাবে দেখতে হয় যে, বোদলেয়রের কবিতায় বেনজামিন দেখেছেন সেই ভবঘুরে প্রবণতাকে, যার উপস্থিতি সম্ভব কেবল বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে, পশ্চিমা মুলুকের পুঁজিবাদের জমে- ওঠা পর্যাযে। এই ভবঘুরে--বা বোদলেয়রের যাযাবর--যে অভাবনীয পথ-পরিক্রমা রচনা করে, তা বন্ধ আর্কেডকে ভেঙে দিয়ে উন্মুক্ত, প্রশস্ত রাস্তা তৈরি করেছে। বেনজামিনের বিবেচনায়, বোদলেয়রের ভবঘুরে সত্তা যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, সে রাস্তার দু’পাশে দোকানপাট নেই, বরং আছে বৃক্ষশ্রেণী। এভাবে বেনজামিন তাঁর বোদলেয়রকে দাঁড় করাচ্ছেন পুঁজিবাদ-প্রভাবিত বদ্ধ নগরায়নের বিরুদ্ধে।

বোদলেয়রের নগর-দর্শনকে বেনজামিন গভীর মনোযোগসহকারে পাঠ করেছেন। প্যারিসের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অর্থ ঘড়ির কাঁটা ধরে প্রগতি কিংবা গতিকে নির্ণয় করা নয়, বরং সেই অর্থকে বোঝা বা চালনা করা, যা কেবল স্পেসেই নির্ণয়যোগ্য। বেনজামিনের বিবেচনায় পুঁজিবাদী-বুর্জোয়া মতাদর্শ সময়ের রৈখিক ক্রমকে সমাদর করে, কিন্তু দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রশ্রয় দেয় স্পেসের অরৈখিকতাকে, যেখানে স্পেসেই শ্রেণী সংগ্রামের অনুপুঙ্খকে প্রত্যক্ষ করা যায়। বোদলেয়র ‘সময়’ এর কবি নন, বরং ‘স্পেস’-এর কবি--এই ধারণাটাকে সামনে এনেই বেনজামিন বোঝাতে চেয়েছেন যে, বোদলেয়র সেই কবি যিনি উনিশ শতকের ফরাসি বুর্জোয়া মতাদর্শকে, বুর্জোয়া স্থিতি ও নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। যন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়া আর ঘড়ির কাঁটা দিয়ে বাস্তবতাকে নিউটনীয কায়দায় মেপে মেপে পুরো স্পেসকে (শোষণের ক্ষেত্রকে) আড়াল করার বুর্জোয়া কৌশলকে বোদলেয়র নাকচ করেছেন বলেই মার্কসবাদী বেনজামিনের কাছে বোদলেয়র অনুপ্রেরণা হয়ে থাকেন, যার সুবাদে বেনজামিন বলেছিলেন বিপ্লবের 'টপোলজি'র (স্থানতত্ত্বের) কথা।

বেনজামিন যে ফটোগ্রাফির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন, তারও একটা কারণ হচ্ছে বেনজামিনের স্পেসপ্রীতি ও বোদলেয়রপ্রীতি। ফটোগ্রাফি, বোদলেয়রের চিত্রকল্পের মতোই, সময়কে মহাকালের কাছে বলি না দিয়ে তাকে ধারণ করে স্পেসের ভেতর। অন্য কথায়, ফটোগ্রাফি সময়কে স্পেসে রূপান্তরিত করে। কিন্তু এও সত্য যে, বেনজামিনের কাছে ফটোগ্রাফি কিংবা স্পেস কোনো নির্দিষ্টবাচকতা বা একরৈখিকতা বা নিশ্চিতিকে নির্দেশ করে না; সেখানেও অর্থ ঊনপঞ্চাশটাই হতে পারে এই অর্থে যে, পাঠ তো আর থেমে থাকে না। সেও বোদলেয়রের ভবঘুরের মতোই ছুটে চলে ঊনপঞ্চাশটি পথে। অর্থাৎ স্পেস মানেই কোনো জমাটবাঁধা স্থান নয়।

বোদলেয়রের কাছ থেকে বেনজামিন যে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাটি লাভ করেন, তা হচ্ছে নগরীর অভিজ্ঞতা। বেনজামিন মনে করেন, একেকটি নগরী হচ্ছে একেকটি ‘ছোট পৃথিবী’, যেখানে ইতিহাসের অর্থগুলো বিভিন্ন বস্তুর কোলাজে ধরা পড়ে, ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও। নাগরিক প্রাত্যহিকতায় কিংবা নগরীতে সংঘটিত বড়, সাধারণ ও ক্ষুদ্র ঘটনায় বিপ্লবের ব্যঞ্জনা লুকিয়ে থাকতে পারে বলে বেনজামিন মনে করেছেন। এ কারণে তিনি মাছের বাজার কিংবা 'বেশ্যালয়' কিংবা রাস্তার ধারের জটলা কিংবা চায়ের দোকানের আলাপকে সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন এবং এও দেখা গেছে যে, রেস্টুরেন্টের আড্ডা থেকে উঠে আসা কোনো ‘ক্লিশে’কে কিংবা রাস্তা থেকে তুলে আনা কোনো গুজবকে বেনজামিন রীতিমতো র‍্যাডিক্যাল প্রবচনে রূপান্তরিত করেছেন। এও বোদলেয়র-পাঠের ফসল বৈকি।