জীবনানন্দ দাশের ছোট গল্প এবং কিছু প্রসঙ্গ || আজফার হোসেন

বছর কয়েক আগে আমার একটা লেখায় জীবনানন্দ দাশের দুইটা ছোটো গল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। দারুণ উপেক্ষিত দুইটা ছোটো গল্প। গল্প দুইটা...


বছর কয়েক আগে আমার একটা লেখায় জীবনানন্দ দাশের দুইটা ছোটো গল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। দারুণ উপেক্ষিত দুইটা ছোটো গল্প। গল্প দুইটার নাম ‘হিসেব-নিকেশ’ এবং ‘কথা শুধু—কথা, কথা, কথা, কথা, কথা’। শেষের গল্পটা কিছুদিন আগে আবারও পড়লাম। এবং মনে হোলো ওই গল্পটার একটা ‘সিম্পটোম্যাটিক’ পাঠ সংক্ষেপে আবারও হাজির করি, ফেসবুকে আমার বন্ধুদের সঙ্গে সংহতির স্পিরিেটই।

তাহলে তাকানো যাক ওই গল্পটার দিকে, যার নাম ‘কথা শুধু—কথা, কথা, কথা, কথা, কথা’। এখানে ‘কথা’ শব্দটাকে অনায়াসে ‘টাকা’ পড়া যায়ঃ টাকা শুধু—টাকা, টাকা, টাকা, টাকা, টাকা। গল্পটা আন্তন চেকভ-এর ‘গুজবেরিস’ গল্পকে মনে করিয়ে দেয়, যে-গল্পে টাকার সঙ্গে ভাষার মিল খোঁজা হয়, যে-গল্পে টাকাই তো আসল কথা হয়ে ওঠে। চেকভ নিজেই বলেন, “ভদকার মতোই টাকা সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটায়”।

অন্যদিকে আবার জীবনানন্দ দাশের গল্পের ওই দুর্দান্ত, তুলনাহীন শিরোনাম কালো কবি ল্যাংস্টন হিউস-এর একটা ছোটো কবিতার কথাও মনে করিয়ে দেয়। কবিতাটাকে অবশ্য উল্টো দিক থেকে পড়ার কথা বলেছিলেন হিউস (বিশেষ করে নিচ থেকে উপর দিকে)ঃ

হাঁসফাঁস দামড়া হাঁস
পাড়ে

$$$$$
$$$$
$$$
$$
$

হ্যাঁ, ডলার বাড়তে থাকে, বাড়তেই থাকে, n-পদ পর্যন্ত। এই বাড়াটাই আচ্ছন্ন করে রাখে ‘কথা শুধু’ গল্পের প্রধান চরিত্র ভবশঙ্করের মনোজগৎকে।

কিন্তু কে এই ভবশঙ্কর? ‘কথা শুধু’ গল্পের শুরুতেই জীবনানন্দ দাশ ভবশঙ্করকে পরিচয় করিয়ে দেন এভাবেঃ “ভবশঙ্কর একটা মস্ত বড় বাঙালি লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান কিন্তু প্রত্যেক মিটিংয়েই সেক্রেটারি তাকে প্যাঁদায়”। প্যাঁদায়? জীবনানন্দের এই ‘প্যাঁদায়’ চিহ্নায়কটি যেন মুহূর্তেই বুদ্ধদেবীয় বাবু-বাংলাকে প্যাঁদাতে থাকে, এমনকি তার পোঁদে বা পাছায় লাথিও মারে।

সত্য, একবার কবিতায় জীবনানান্দ দাশ ‘ঠ্যাং’ শব্দটা ব্যবহার করাতে বুদ্ধদেবের বিস্ময় জেগেছিল (ইতিবাচক অর্থেই)। কিন্তু এও সত্য যে, ওই ‘প্যাঁদায়’ শব্দটা বুদ্ধদেবের ভাষিক মেজাজ থেকে তারার দূরত্বেই বিরাজ করে। এখানেই শেষ নয়। ওই দুইটা গল্পে জীবনানন্দ দাশ বেশ উৎসাহে ও উল্লাসে বেশ কিছু অনুকারাত্মক ও ধন্যাত্মক শব্দ ও পদ চালু রাখেন; শব্দগুলার একটা ফর্দ উপস্থিত করেছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য এক সময় এভাবেঃ “হালু হালু, টস টস, ফ্যা ফ্যা, ফুঃ ফুঃ, হি হি, খুচ খুচ, ঢুই ঢুই এবং তৎসহ গজকন্দা, দমফাই, মেয়ে পটকানো, গয়ারাম, গুখখুরি”। এবং ‘প্যাঁদায়’।

তাহলে ফিরে আসা যাক জীবনানন্দ দাশের ‘কথা শুধু’ গল্পের ভবশঙ্করের কাছে। এই ভবশঙ্কর উৎপাদন-সম্পৃক্ত পুঁজি নিয়ে কারবার করে না; বরঞ্চ টাকা দিয়ে আরও টাকা আনার ব্যাপারটা মুখ্য হয়ে উঠে ভবশঙ্করের কাছে। ভবশঙ্কর সকালের চায়ে ঠোঁট ভেজায়, সুরুত সুরুত করে চুমুক দেয়, টোষ্টে তেলতেলে জেলি মাখায়, ডিমের হলদে কুসুমে দাঁত বসায়, তারপর কামড়ে ধরে কলা। এরপর গুলতি মারার মতোই সে শব্দ মারেঃ “বিজনেসে লেগে থাকলে এই হবে শুধু—টাকা হবে, আরও টাকা হবে, আরও টাকা হবে, আরও টাকা হবে”।

ভবশঙ্করের জবানে জীবনানন্দ যে বয়ান পুরে দিয়েছেন, তা যেন কার্ল মার্কসের M-M’-এর প্রতিধ্বনি তোলে বারবার (যেখানে M মানে টাকা আর M’ মানে টাকা)। আর ওই M-M’ এর স্বার্থেই ভবশঙ্কর ভোল পাল্টাতে দ্বিধাবোধ করে না মোটেইঃ সে তার ফটকাবাজি বিভিন্ন এলাকায় জারি রাখে। উদাহরণ হিসাবে বলা যাবে আলবার্ট হলে লেফটদের সামনে ভবশঙ্করের বক্তৃতার কথা। প্রথমে সে ভুলে বলে ফেলে, “আমি বলশেভিক নই”। আর যায় কোথায়? অমনি আমজনতার শোরগোল ও ধিক্কার ওঠে। কিন্তু নিমেষেই ভবশঙ্কর ভোল পালটায়। জীবনানন্দ নিজেই তার গল্পে জানান দেনঃ “রাশিয়ার চাষাভুষোর গুণগান করলেন ভবশঙ্কর। নিতান্ত নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সোভিয়েতের গুণগান করলে, বলশেভিকদের জয়জয় করলে। জয়জয়কার পড়ে গেল ভবশঙ্করের”।

একেবারে ফটকাবাজির ওপর চোখ রেখেছেন জীবনানন্দ দাশ আর ধরিয়ে দিয়েছেন কীভাবে ভদকার মতোই টাকা সব অদ্ভুত কারবার করে।

টাকা কী কী করতে পারে তা বোঝানোর জন্য কার্ল মার্কস মাঝে মাঝে বেশ আগ্রহ নিয়ে শেক্সপিয়রকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর _ইকনমিক অ্যান্ড ফিলসফিক্যাল ম্যানিউস্ক্রিপটস_ নামের বইয়ে মার্কস দারুণভাবে টুকে দিয়েছেন শেক্সপিয়রের নাটক _টাইমন অফ এথেন্স_ থেকে বেশ কিছু লাইন। এভাবেই মার্কস বুঝিয়েছেন যে, টাকার জোরে এমনকি নিজের মুখ নিজের পোঁদকে চুমু খায়। আর টাকাকে বলা হয়েছে “দৃশ্যমান হলুদিয়া আল্লাহ”।

জীবনানন্দ দাশও তাঁর কিছু গল্পে ওই মুখ ও পোঁদের চুমাচুমির মুহূর্তকে পুঁজিবাদের একটা বিশেষ পর্বে খপ করেই ধরে ফেলেছেন, যে গল্পগুলোকে তাঁর অন্যান্য গল্প থেকে অনেক আলাদা মনে হয়।

এই অন্য স্বরের, অন্য সুরের, অন্য ভাষার এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির জীবনানন্দ দাশকেও চিনে রাখা দরকার।

ভালটার বেনজামিন: একটি সংক্ষিপ্ত নোট || আজফার হোসেন

ভালটার বেনজামিন: একটি সংক্ষিপ্ত নোট বোদলেয়র, কাফকা ও প্রুস্তের দুর্দান্ত পাঠ হাজির করেছিলেন জর্মন মার্কসবাদী সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক ভাল...


ভালটার বেনজামিন: একটি সংক্ষিপ্ত নোট

বোদলেয়র, কাফকা ও প্রুস্তের দুর্দান্ত পাঠ হাজির করেছিলেন জর্মন মার্কসবাদী সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক ভালটার বেনজামিন। তাঁর সেই বোদলেয়র পাঠ নিজেই তো অনন্ত পাঠযোগ্য। এখানে বিশেষ করে বলতে হয় বেনজামিনের কাজ ‘অন সাম মোটিফস ইন বোদলেয়র’ (১৯৩৯)-এর কথা। এই কাজে তিনি বিশেষ করে তিনটি বিষয়ে--শ্রেণী, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি বিষয়ে--তাঁর ধারণাকে উপস্থিত করেছেন। শুধু তাই নয়, ফ্যাসিবাদ এবং প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের তীব্র সমালোচনা করতে গিয়েই এসব ধারণাকে তিনি সামনে এনেছেন এবং বেনজামিনের বোদলেয়র পাঠে আমরা লক্ষ্য করি ফ্রয়েড ও লুডভিগ ক্লাগেসের ফ্যাসিবাদী নৃ-তত্ত্বের কিছু কৌশলের পাল্টা প্রয়োগ।

বস্তুক ও আধ্যাত্মিক ইডিয়মের রসায়নই বেনজামিনকে টেনেছে বোদলেয়রের দিকে। ধারণাটি যথার্থ দিয়েছেন আমাদের কমরেড রিচার্ড কার্নি। তবে বিশেষভাবে দেখতে হয় যে, বোদলেয়রের কবিতায় বেনজামিন দেখেছেন সেই ভবঘুরে প্রবণতাকে, যার উপস্থিতি সম্ভব কেবল বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে, পশ্চিমা মুলুকের পুঁজিবাদের জমে- ওঠা পর্যাযে। এই ভবঘুরে--বা বোদলেয়রের যাযাবর--যে অভাবনীয পথ-পরিক্রমা রচনা করে, তা বন্ধ আর্কেডকে ভেঙে দিয়ে উন্মুক্ত, প্রশস্ত রাস্তা তৈরি করেছে। বেনজামিনের বিবেচনায়, বোদলেয়রের ভবঘুরে সত্তা যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, সে রাস্তার দু’পাশে দোকানপাট নেই, বরং আছে বৃক্ষশ্রেণী। এভাবে বেনজামিন তাঁর বোদলেয়রকে দাঁড় করাচ্ছেন পুঁজিবাদ-প্রভাবিত বদ্ধ নগরায়নের বিরুদ্ধে।

বোদলেয়রের নগর-দর্শনকে বেনজামিন গভীর মনোযোগসহকারে পাঠ করেছেন। প্যারিসের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অর্থ ঘড়ির কাঁটা ধরে প্রগতি কিংবা গতিকে নির্ণয় করা নয়, বরং সেই অর্থকে বোঝা বা চালনা করা, যা কেবল স্পেসেই নির্ণয়যোগ্য। বেনজামিনের বিবেচনায় পুঁজিবাদী-বুর্জোয়া মতাদর্শ সময়ের রৈখিক ক্রমকে সমাদর করে, কিন্তু দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রশ্রয় দেয় স্পেসের অরৈখিকতাকে, যেখানে স্পেসেই শ্রেণী সংগ্রামের অনুপুঙ্খকে প্রত্যক্ষ করা যায়। বোদলেয়র ‘সময়’ এর কবি নন, বরং ‘স্পেস’-এর কবি--এই ধারণাটাকে সামনে এনেই বেনজামিন বোঝাতে চেয়েছেন যে, বোদলেয়র সেই কবি যিনি উনিশ শতকের ফরাসি বুর্জোয়া মতাদর্শকে, বুর্জোয়া স্থিতি ও নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। যন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়া আর ঘড়ির কাঁটা দিয়ে বাস্তবতাকে নিউটনীয কায়দায় মেপে মেপে পুরো স্পেসকে (শোষণের ক্ষেত্রকে) আড়াল করার বুর্জোয়া কৌশলকে বোদলেয়র নাকচ করেছেন বলেই মার্কসবাদী বেনজামিনের কাছে বোদলেয়র অনুপ্রেরণা হয়ে থাকেন, যার সুবাদে বেনজামিন বলেছিলেন বিপ্লবের 'টপোলজি'র (স্থানতত্ত্বের) কথা।

বেনজামিন যে ফটোগ্রাফির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন, তারও একটা কারণ হচ্ছে বেনজামিনের স্পেসপ্রীতি ও বোদলেয়রপ্রীতি। ফটোগ্রাফি, বোদলেয়রের চিত্রকল্পের মতোই, সময়কে মহাকালের কাছে বলি না দিয়ে তাকে ধারণ করে স্পেসের ভেতর। অন্য কথায়, ফটোগ্রাফি সময়কে স্পেসে রূপান্তরিত করে। কিন্তু এও সত্য যে, বেনজামিনের কাছে ফটোগ্রাফি কিংবা স্পেস কোনো নির্দিষ্টবাচকতা বা একরৈখিকতা বা নিশ্চিতিকে নির্দেশ করে না; সেখানেও অর্থ ঊনপঞ্চাশটাই হতে পারে এই অর্থে যে, পাঠ তো আর থেমে থাকে না। সেও বোদলেয়রের ভবঘুরের মতোই ছুটে চলে ঊনপঞ্চাশটি পথে। অর্থাৎ স্পেস মানেই কোনো জমাটবাঁধা স্থান নয়।

বোদলেয়রের কাছ থেকে বেনজামিন যে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাটি লাভ করেন, তা হচ্ছে নগরীর অভিজ্ঞতা। বেনজামিন মনে করেন, একেকটি নগরী হচ্ছে একেকটি ‘ছোট পৃথিবী’, যেখানে ইতিহাসের অর্থগুলো বিভিন্ন বস্তুর কোলাজে ধরা পড়ে, ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও। নাগরিক প্রাত্যহিকতায় কিংবা নগরীতে সংঘটিত বড়, সাধারণ ও ক্ষুদ্র ঘটনায় বিপ্লবের ব্যঞ্জনা লুকিয়ে থাকতে পারে বলে বেনজামিন মনে করেছেন। এ কারণে তিনি মাছের বাজার কিংবা 'বেশ্যালয়' কিংবা রাস্তার ধারের জটলা কিংবা চায়ের দোকানের আলাপকে সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন এবং এও দেখা গেছে যে, রেস্টুরেন্টের আড্ডা থেকে উঠে আসা কোনো ‘ক্লিশে’কে কিংবা রাস্তা থেকে তুলে আনা কোনো গুজবকে বেনজামিন রীতিমতো র‍্যাডিক্যাল প্রবচনে রূপান্তরিত করেছেন। এও বোদলেয়র-পাঠের ফসল বৈকি।


একগুচ্ছ 'দর্শনাখ্যান' || আজফার হোসেন

১ দার্শনিক মার্টিন হাইডিগার স্থান-সংক্রান্ত ভাবনাকে খানিকটা টেনে বলা যায় : সত্তার সত্যকে চিহ্ন দিয়ে ঝলকিয়ে তোলে স্থান। সত্তার সত্য উ...


দার্শনিক মার্টিন হাইডিগার স্থান-সংক্রান্ত ভাবনাকে খানিকটা টেনে বলা যায় : সত্তার সত্যকে চিহ্ন দিয়ে ঝলকিয়ে তোলে স্থান। সত্তার সত্য উদ্ঘাটিত হওয়ার জায়গা হচ্ছে স্থান।
কিন্তু কী এই স্থান? শুধুই স্পেস? স্থান নিজেই স্পেস বটে, কিন্তু সমস্ত স্পেস আবার স্থান নয়। স্পেস দিয়ে স্থান তৈরি করা হয়। তাই স্পেস বাদে কোনো স্থান নেই।
স্থান বস্তুক। কর্তাসত্তার প্রতিদিনের পুনরুত্পাদন ঘটে স্থানেই। সেখানে সে থাকে, বসবাস করে, তার কাজে সে নিয়োজিত হয়, সেখানেই সে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। স্থানে থেকেই সে তার স্থানের অর্থ খোঁজে। যখন বলা হয়‘আপনার বাড়ি কোথায়?’ তখন ওই প্রশ্নটা আসলে স্থানের সঙ্গে কর্তাসত্তার সম্পর্ক নিয়েই জিজ্ঞাসা হাজির করে আমাদের সামনে।
‘সামনে-পেছনে’ কিংবা‘ডানে-বাঁয়ে’ কিংবা‘উত্তরে-দক্ষিণে’ চিহ্ন সব স্থানের জ্যামিতিকতাকেই নির্দেশ করে। জ্যামিতিকে যদি স্পেসের বিশেষ অঙ্ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তাহলে তাকে স্থানেরও বিশেষ অঙ্ক হিসেবে দেখা চলে; যদিও জ্যামিতির স্থান আরো বড়, আর স্থানের জ্যামিতি স্থানকে ভেঙে ভেঙে বোঝার বিশেষ কৌশল।‘আমিন’ যখন জমি মাপে, তখন সে স্থানেরই জ্যামিতি কষে।
স্পেস শূন্য হতে পারে, তবে স্থান‘পূর্ণ’। অর্থাত্ স্থান হয়ে ওঠে স্থান তখনই, যখন মানুষ তাকে সৃষ্টি করে, যখন মানুষ সেখানে বসবাস শুরু করে, যখন মানুষ তার পুনরুত্পাদনে নিজেকে দিনের পর দিন হাজির রাখে। মানুষ স্থান বদলায়, স্থানকে বদলায়, এমনকি স্থানকে ধ্বংসও করে।
স্পেস ও সময়ের মতোই স্থান সামাজিকভাবে গঠিত হয়। স্থান শুধুই থাকে না, স্থান হয়ে উঠতে থাকে। অর্থাত্ স্থান ক্ষেত্রবিশেষে‘বিয়িং’ এবং ক্ষেত্রবিশেষে‘বিকামিং’। অর্থাত্ স্থান একই সঙ্গে প্রক্রিয়া এবং প্রক্রিয়ার ফলাফল। স্থানেই মানুষ তার প্রতিদিনের অনুশীলন অব্যাহত রাখে। আর এভাবে মানুষ স্থানের সঙ্গে তার নির্দিষ্ট সম্পর্কের নিরিখে নিজের অর্থ ও সংজ্ঞা তৈরি করে কিংবা বদলাতে থাকে। আর এভাবে স্থান মানুষকে বদলায় যেমনি, মানুষও তেমনি স্থানকে বদলায়।
মানুষ স্থানের নাম দেয়, স্থানও মানুষের নাম দেয়।
স্থান হারিয়ে ফেলার অর্থ হচ্ছে পরিচয় হারিয়ে ফেলা। পরিচয় হারিয়ে ফেলার অর্থ আবার স্থান হারিয়ে ফেলা।
স্থানের পদার্থবিজ্ঞানী ব্রুয়েগম্যানের কিছু ধারণার পথ ধরে বলা যায়, স্থান হচ্ছে সেই স্পেস, যার ঐতিহাসিক অর্থ ইতিহাসের ভেতরেই জমা হতে থাকে। স্থান হচ্ছে সেই স্পেস, যেখানে ঘটনা ঘটে, সেই স্পেস যেখানে ঘটে-যাওয়া ঘটনার স্মৃতি জমা হয়, সেই স্পেস যেখানে স্মৃতি আর ইতিহাসের ছন্দঃস্পন্দে স্থানের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। স্থান হচ্ছে সেই স্পেস যেখানে হরফের ওপর রক্ত পড়ে টুপটাপ, যেখানে বিভিন্ন বয়ান আর আখ্যান জীবনের মহাকাব্যে জড়ো হয়, যেখানে মানুষের মৃত্যু সত্ত্বেও তার জীবন্ত চিহ্নসব ভেসে বেড়ায়, যেখানে মানুষের লড়াই হয়ে ওঠে তার প্রাত্যহিক জীবনের ভাষা, যেখানে প্রেম আর বিদ্রোহ হাত ধরাধরি করে চলে।
১০
স্থান লিখিত হয় ইতিহাসে। ইতিহাস লিখিত হয় স্থানে।
১১
স্থান সময়কে তর্জমা করে নির্দিষ্ট দৃশ্যে কিংবা চিহ্নে। এমনকি স্থান সময়কে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে চায়। আর ইতিহাস শুধু সময়কে নিয়ে নয়, স্থানকে নিয়েও।
১২
স্থান নিয়ে কথা বলা মানেই তার নামধাম, ঠিকানা, চেহারা, চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, স্থানাঙ্ক আর মানচিত্র নিয়েও কথা বলা। ভূগোলবিদ, ভূতাত্ত্বিক, জ্যামিতিবিদ, মানচিত্রকার, স্থানভাষ্যকার, নকশা-আঁকিয়ে, জ্যোর্তিবিজ্ঞানী, নগর-পরিকল্পক, নগরায়ণ সমাজতাত্ত্বিক, প্রকৌশলী, এমনকি ভাষাবিজ্ঞানী, অন্দর-নকশাবিদ, মঞ্চ-ব্যবস্থাপক, স্থপতি, সামরিক কৌশলী, গেরিলা যোদ্ধা, পরিবেশবিজ্ঞানী, ধর্মতাত্ত্বিক, সৃষ্টিতাত্ত্বিক, আমিন, গল্পকার সবাই—তাদের পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও—কোনো না কোনোভাবে স্থানকে গুরুত্ব দেয়, পরখ করে, বয়ানে চিহ্নিত করে, হতে পারে সে স্থান একেবারে সাক্ষাত্ বাস্তব কিংবা কল্পিত, বস্তুক কিংবা রূপকার্থিক।
১৩
প্রায় প্রতিটি গল্পই ভ্রমণ গল্প—স্থান থেকে স্থানে যাওয়ার গল্প—স্থানিক অনুশীলনও—এমনই একটা কথা বলেছিলেন ফরাসি তাত্ত্বিক মিশেল দ্য স্যর্তো, যিনি স্থান আর স্থানান্তরের‘মাইক্রো-ক্যালকুলাস্’ নিয়েও তত্ত্ব ফেঁদেছিলেন। স্যর্তোর ইঙ্গিতকে সম্প্রসারিত করে বলা চলে, যে স্থানের নির্দিষ্ট গল্প আছে যেমন, তেমনি গল্পেও নির্দিষ্ট স্থান আছে। এবং স্থান ছাড়া গল্প নেই। এই স্থান হতে পারে বাস্তব কিংবা কল্পিত, পুরনো কিংবা নতুন, বড় কিংবা ছোট।
১৪
বিশ্বে যতটা না স্থান আছে তার চেয়ে বেশি আছে তা বিশ্বসাহিত্যে।
১৫
মহাকাব্যের প্রসঙ্গ আনা যাক। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মহাকাব্য‘গিলগামেশ’ কিংবা ভারতের মহাকাব্য‘রামায়ণ’‘মহাভারত’ কিংবা জাপানি সামরিক মহাকাব্য‘হাইকানামা’ কিংবা মধুসূদন দত্তের‘মেঘনাদবধ কাব্য’ অথবা দক্ষিণ আফ্রিকার কবি মাজজিসি কুনেনের জুলু মহাকাব্য‘সম্রাট শাকা’ বিভিন্নভাবে স্থানকে ব্যবহার করেছে—কখনো পটভূমি, কখনো প্রস্থানভূমি, কখনো পরিপ্রেক্ষিত, কখনো বিষয়, কখনো এমনকি চরিত্র হিসেবেও। স্থান নির্মাণের ও ভাঙনের এবং স্থান দখলের গল্প এবং চিত্র বিভিন্ন মহাকাব্যে বিভিন্নভাবে উপস্থিত। এমনকি মহাকাব্যিক স্থান—কল্পিত কিংবা সাক্ষাত্ কিংবা ঐতিহাসিক—মহাকাব্যের নায়ককে চরিত্রায়িত করে। অন্যভাবে বলা যায়, মহাকাব্যের নায়ককে চেনা যায় স্থানের সঙ্গে তার নির্দিষ্ট সম্পর্কের নিরিখে। মহাকাব্যের এই নায়ক যুদ্ধ করে, স্থান দখল করে কিংবা স্থানের পতন ঘটায় কিংবা এমনকি হারানো স্থানকে আবার উদ্ধারও করে অথবা নিজের বা অপরের স্থানকে বদলাতেও থাকে। স্থান ছাড়া মহাকাব্যের নায়কের কোনো সাক্ষাত্ লিপ্ততা বা তত্পরতা নেই।
১৬
ইতালীয় কবি দান্তের মহাকাব্য ‘ডিভাইন কমেডি’ থেকে তার বিচিত্র স্থান যদি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে মহাকাব্যটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। কবি নিজেই যে অনুপ্রাণিত নকশাবিদ কিংবা নিরূপক হয়ে ওঠেন, তার প্রমাণ‘ডিভাইন কমেডি’র দান্তে নিজেই। এই মহাকাব্য নান্দনিকতার সঙ্গে গাণিতিকতার, গাণিতিকতার সঙ্গে ভৌগোলিকতার, ভৌগোলিকতার সঙ্গে স্থাপত্যবিদ্যার অভূতপূর্ব যোগসাজশে স্থান নির্মাণের প্রক্রিয়া জারি রেখেছে দোজখ থেকে বেহেশত পর্যন্ত। আর মহাকাব্যিক অভিযাত্রা মানেই স্থান থেকে স্থানে যাত্রা।
১৭
রূপকথায় আর উপকথায় কিংবা কিংবদন্তিতে কিংবা নীতিগল্পে বিভিন্ন মাত্রায় স্থানের ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়।‘আরব্য রজনী’র কথাই ধরা যাক।‘আরব্য রজনী’র প্রতিটি গল্পময় রাত শুধু সময়েই নয়, স্থানেরও। সেই স্থান আরব দেশীয়। আর যাকে আরব দেশীয় গল্প বলা হয়, তা বিশুদ্ধ আরব্য নয়, কেননা সেখানে থাকে পারস্য আর ভারত। মৃত্যুকে না-বলা গল্পকার শাহেরজাদের প্রায় প্রতিটি গল্পেই স্থান আছে এবং স্থানান্তর আছে। গল্পের গতি ও প্রবহকে নিয়ন্ত্রণ করে স্থান; আবার সেই গতি ও প্রবহ স্থানকেও পাল্টা নিয়ন্ত্রণ করে। স্থান নিজেই যেমন গল্প তৈরি করে, তেমনি গল্পও তৈরি করে স্থান।
১৮
যাকে ‘উপন্যাস’ নামে আমরা ডেকে থাকি, তার স্থাপত্যনীতির অন্যতম ভিত্তিভূমি হচ্ছে স্থান। মার্ক্সবাদী ভূবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ডেভিড হার্ভির একটা কথাকে খানিকটা টেনে এভাবে বলা যায়, স্থানের ও সময়ের সূচকের সমবায়ে উপন্যাসের একটি নির্দিষ্ট সমগ্র মূর্ত হয় এমনভাবে যে, সময় নিজেই তার দেহ লাভ করে কিংবা নান্দনিকভাবেই সময় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আর অন্যদিকে সময়, প্লট ও ইতিহাসের গতিকে ধারণ করে স্থান ভরে ওঠে, প্রাণ পায়। এভাবেই মানবিক ভূগোলশাস্ত্রে স্থান পরিগঠিত হয়।
১৯
যাকে‘নগর’ বলি, তা আসলে প্রথমেই স্থান। অথবা নগর হচ্ছে বিভিন্ন স্থানের গতিশীল সমগ্র। আর গল্পরা স্থানকে জড়ায়, বানায়, সংগঠিত করে, নির্বাচিত করে, এমনকি ভাঙেও। গল্পরা স্থানকে মূর্ত করে কিংবা ভুতুড়ে করে। জেমস জয়েসের ডাবলিন কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ঢাকা—তাদের ভিন্ন চেহারা ও চরিত্র সত্ত্বেও—কখনো জাহিরি বা সাক্ষাত্ বাস্তব, কখনো কাল্পনিক, কখনো ঐতিহাসিক, আবার কখনোবা পুনর্নিমিত। আবার বিভিন্ন চিহ্নে, দৃশ্যে, কর্তাসত্তায় সেই ঢাকা বা ডাবলিন ভাষায় উদ্ভাসিত। আর এই ঢাকা ও ডাবলিনের স্থানিক অনুপুঙ্খে প্রাত্যহিকতা তার নাম লেখে—এমনকি ঘোষণাও করে। যেখানে ঢাকা নেই, ডাবলিন নেই, সেখানে ইলিয়াসের আর জয়েসের চরিত্র নেই। এমনকি ঢাকা আর ডাবলিন মাঝেমধ্যে চরিত্রও হয়ে ওঠে। জয়েসে আর ইলিয়াসে স্থান চরিত্রের কথা বলে আর চরিত্র স্থানের কথা বলে।
২০
স্থানও ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
২১
কোনো কোনো কবির জন্য স্থান হয়ে ওঠে রূপক আর রূপক হয়ে ওঠে স্থান। এখানে জীবনানন্দ দাশের কথা বলতে হয়। তাঁর কবিতায় রূপক আর স্থানের স্থান বদলাবদলি দেখা যায়। এমনকি দেখা যায় স্থানের ভেতরে স্থান। জীবনানন্দের‘বনলতা সেন’ ভৌগোলিক ও স্থানিক কল্পনার কবিতা। কবিতার প্রথম স্তবকেই চিহ্নের প্রবহে ঝলকে ওঠে স্থান : সিংহল আর রাতের অন্ধকারে মালয়; বিম্বিসার আর অশোকের ধূসর স্পেস; এবং দূর নগরী বিদর্ভ। আর থাকে নাটোর—সেই স্থান যেখানে বনলতা থাকে, আবার থাকেও না। কবিতার অল্প স্পেসেই মহাকাব্যিকতাও আছে। আছে স্থান থেকে স্থানের মহাকাব্যিক আয়তনের অভিযাত্রা। কিন্তু এসব স্থান আবার রূপকেরও চেহারা নেয়। হাজার-বছর-ধরে-হাঁটা অভিযাত্রীর বিভিন্ন মুড ও মেজাজের এবং এমনকি অভিজ্ঞতার রূপক হয়ে ওঠে স্থান নিজেই। বনলতা সেনের‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’ প্রশ্নটা একই সঙ্গে সময় ও স্থানের প্রশ্ন। অন্যদিকে‘পাখির নীড়’ স্থান হয়েও রূপক হিসেবে কাজ করে। এই রূপকের স্পেসে‘চিহ্নায়ক’ ও‘চিহ্নিত’ যেন একই বিন্দুতে মিলতে চায়। বনলতা এখানে একজন নির্দিষ্ট স্থানিক কর্তাসত্তা যেমন, তেমনি সে শান্তির আবাসেরও রূপক। আসলে জীবনানন্দ দাশ তাঁর কাজের সমগ্রে মানচিত্রল কল্পনায় স্থানকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন। আর তাকে ব্যবহার করেছেন এমনভাবে যে তাঁর কবিতায় স্থান নিজেই ভাষা হয়ে ওঠে।
২২
চিহ্নে-চিহ্নে আর স্মৃতিতে-স্মৃতিতে খেলা করে স্থান।
২৩
অস্তিত্বের প্রকৃতিকে নির্দেশ করে স্থান। কর্তাসত্তাকে ভিত্তিভূমি দেয় এবং এমনকি তাকে সংজ্ঞায়িতও করে স্থান। একজন শুধু হয় না; সে হয়ে ওঠে। একইভাবে স্থান শুধু হয় না; স্থান হয়ে ওঠে। এই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় স্থান আর কর্তাসত্তা উভয়েই পরস্পরকে একটা বহমান সম্পর্কে জড়িয়ে রাখে।
২৪
স্থান কেবল বিশেষ্য নয়, স্থান ক্রিয়াও। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষণও। লাতিন আমেরিকার ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর মহাকাব্যিক আয়তনের উপন্যাস‘শত বছরের নির্জনতা’য় মাকোন্দো নামের এক কাল্পনিক শহরকে প্রথমত স্থান হিসেবেই উপস্থিত করেন। এই স্থান কোনো স্থির স্পেস নয়। মাকোন্দো তার অন্তর্গত ছন্দঃস্পন্দে এবং বাইরের ঘটনা ও অবস্থার চাপে ও তাপে বদলাতে থাকে। যা ছিল না মাকোন্দো, তাই হয়ে ওঠে মাকোন্দো। গাণিতিক রূপক ব্যবহার করে বলা চলে, এমনকি মাকোন্দোর যোগ চিহ্ন রূপান্তরিত হয় তার বিয়োগ চিহ্নে। শহর বা স্থান হিসেবে মাকোন্দো তার নিজস্ব কিন্তু বদলাতে-থাকা গুণাগুণকে প্রকাশ করতে থাকে। মাকোন্দো তার বসবাসকারীদের বিভিন্ন অনুশীলনের সমগ্র হয়ে ওঠে; এমনকি বিভিন্ন অনুশীলনের গুণাগুণকে সে চিহ্নিত করতে থাকে একের পর এক। অন্যদিকে স্থান বা শহর হিসেবে মাকোন্দো তার গল্প বলে যেমন, তেমনি সে আবার বিভিন্ন কিসিমের গল্পকে টেনে আনে এবং একসঙ্গে জড়ো করে। মহাকাব্যিক উপন্যাসের ভেতরে মাকোন্দো হয়ে ওঠে গল্পময়। এমনকি গল্প-বলিয়েও। যেখানে মাকোন্দো নেই, সেখানে গল্পও নেই।
২৫
স্থান সত্তাতাত্ত্বিক যেমন, তেমনি সে জ্ঞানতাত্ত্বিকও। স্থান দিয়ে মানুষ জানতে পারে সে কোথায় আছে। স্থান হয়ে ওঠে জ্ঞানের উত্পাদকও। স্থান আবার অবস্থানও। সে কারণে স্থানই জানিয়ে দেয় কার স্থান কোথায়। স্থান নির্ণয়ের বিষয়টি সরাসরি জ্ঞানোত্পাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। যাকে শ্রেণিবিন্যাস বলা হয়, তা স্থানবিন্যাসও। এই স্থানবিন্যাস বিভিন্নভাবেই জ্ঞান অর্জনের উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে।
২৬
স্থান রাজনৈতিক। বিভিন্নভাবেই রাজনৈতিক। যখন কোনো স্থানকে নাম দিয়ে ডাকা হয়, তখন সেই স্থানকে একই সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়, শনাক্ত করা হয়, অন্য স্থান থেকে তাকে আলাদা করা হয়, তাকে এমনকি নির্দিষ্ট স্পেস ধার্য করে ন্যায্যতা দেওয়া এবং এভাবে স্থান নির্দিষ্ট ক্ষমতা-সম্পর্কে জড়িত হয়, এমনকি নিজের ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে থাকে।

A Quick Note on Poetics || Azfar Hussain

The Latin American revolutionary poet Roque Dalton's "Ars Poetica" is a poem of three lines--"Poetry/ Forgive me for ...


The Latin American revolutionary poet Roque Dalton's "Ars Poetica" is a poem of three lines--"Poetry/ Forgive me for having helped you understand/ You're not made of words alone." As Claire Gebeyli, a Lebanese writer, puts it: "Of what use is the pen if it forgets to press down on people's chests? If the words it pours forth are mere particles sewn and resewn on the body of language?" On a somewhat different register, the Black feminist poet Audre Lorde underlines the task of a poet as being one "to name the nameless so it can be thought." Dalton, Gebeyli, and Lorde--their differences notwithstanding--converge at least around the idea that poetry is more than "word-making," more than even a clever play of words.

Is poetry, then, a kind of world-making? The worlding of the word and the wording of the world? Isn't the poet an Orphic singer who brings things into being for the first time? Isn't poetry also the letting go of language itself? And another, somewhat different question: What can thinking learn from poetry? These questions are not merely Heideggerian questions, as some of those Heideggerians would love to have us believe. Such questions, among many others, were already prompted by Lalon Fakir's own lyrical theories of the body and language, although in different contexts. This morning I was looking at the following "song-text" by Lalon, one that doesn't itself specifically ask the questions I ask above but one that surely prompted those questions for me:

দেহের খবর বলি শোন রে মন।
দেহের উত্তর দিকে আছে বেশি দক্ষিণেতে আছে কম।।
দেহের খবর না জানিলে
আপ্ততত্ত্ব কিসে মেলে
লাল জরদ ছিয়া ছফেদ
বাহান্ন বাজার এই চারিকোণ।।
আগে খুঁজে ধর তারে
নাসিকাতে চলে ফেরে
নাভিপদ্মের মূল দুয়ারে
বসে আছে সর্বক্ষণ।।
আঠারো মোকামে মানুষ
যে না জানে সেহি তো বেহুঁশ
লালন বলে থাকরে হুঁশ
আদ্য মোকামে তার আসন।।

এনলাইটেনমেন্টের প্রডাক্ট হচ্ছে কার্ল মার্কস || আজফার হোসেন

এনলাইটেনমেন্টের প্রডাক্ট হচ্ছে কার্ল মার্কস —  আজফার হোসেন [আজফার হোসেন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টে...

আজফার হোসেন

এনলাইটেনমেন্টের প্রডাক্ট হচ্ছে কার্ল মার্কস— আজফার হোসেন


[আজফার হোসেন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটি-তে লিবারেল স্টাডিজ এবং ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজ-এ অধ্যাপনা করছেন। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড্ স্টাডিজ্’-এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসাবে বর্তমানে কাজ করছেন এবং সেখানে তিনি ইংরেজি, বিশ্বসাহিত্য এবং ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজ-এর অধ্যাপকও।  তিনি ইংরেজি সাহিত্য, কালচারাল স্টাডিজ এবং এথনিক্ স্টাডিজ পড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি, বৌলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটি-তে। পড়াশুনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে, যেখান থেকে তিনি শীর্ষস্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ‘ডিসটিংসন্’সহ ইংরেজি ও বিশ্বসাহিত্যে ডক্টরেট করেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় তিনি লিখে থাকেন। ভাষা, সাহিত্য, সাহিত্যতত্ত্ব, সংস্কৃতি, দর্শন, ইতিহাস, রাজনৈতিক অর্থনীতি, এবং রাজনীতি-সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি কয়েকশ’ প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখেছেন, যেগুলো বিভিন্ন সময়ে দেশে ও বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি ভাষা থেকে তার ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। বাংলায় ও ইংরেজিতে তার কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে, যেমন প্রকাশিত হয়েছে তার বেশ কিছু ব্যঙ্গরচনা এবং ট্র্যাভেলগ। বাংলাদেশে থাকাকালীন তিনি প্রচুর রাজনৈতিক কলাম লিখেছেন এবং একাধিক পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন, যেমন তিনি নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সময় পত্রিকাটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন এবং ইংরেজি সাপ্তাহিক সানডে এক্সপ্রেস-এর প্রদায়ক সম্পাদক ছিলেন। এক সময় তিনি বাংলাদেশ লেখক শিবিরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবেও কাজ করেছেন। নিউইয়র্ক-এর হার্টকোর্ট ব্রেইস থেকে প্রকাশিত সংকলন রিডিং অ্যাবাউট দ্য ওয়াল্ড (১৯৯৯)-এর দুই খণ্ড সম্পাদনা করেছেন পল ব্রায়ানস্-এর সঙ্গে। এছাড়া তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন একাধিক বই। আর বর্তমানে প্রেসে আছে তার বেশ কয়েকটি বাংলা বই : ১. সাম্রাজ্যবাদ ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি; ২. পঠনঃ শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের রাজনীতি; ৩. কেরামতনামা; এবং ৪. চিহ্ন ভাসে অবশেষে। তার সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলেন কবি, লেখক ও চিন্তক জাহেদ সরওয়ার। তাদের সেই আলাপচারিতা ২০১৬ সালের ২২ জুলাই বাংলা ট্রিভিউনে প্রকাশ হয়। আর আজকে কথাবলির পাঠকদেরদের আবার প্রকাশ হলো]

জাহেদ সরওয়ার : আমরা আজ এই অবস্থায় কেন?
আজফার হোসেন : আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের যে মূলনীতিগুলো ঘোষিত হয়েছিল, যে নীতিগুলো আমি মনে করি বিপ্লবী নীতি, যেমন- সাম্য বা সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা- সেই সব নীতিকে যদি আমরা বাস্তবায়িত করতে চাই, সমাজের সব স্তরে যদি এই তিনটি নীতির প্রতিফলন চাই- শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে ও রাজনীতিতে যদি তাদের বাস্তবায়ন দেখতে চাই, তাহলে আমাদের যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, আমাদের যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাকে বদলানো ছাড়া গতি নাই। এই নীতিগুলো বাস্তবায়নের জন্যই মানুষ যুদ্ধ করেছিলেন। মানুষ বলতে আমি অধিকাংশ জনগণকে বুঝাচ্ছি। মানুষ এখানে কোনো ফাঁকা বুলি নয়।
জাহেদ সরওয়ার : মানুষ কারা তবে?
আজফার হোসেন : আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধ কিন্তু জনযুদ্ধ ছিল। এই জনযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশকে যাঁরা স্বাধীন করেছিলেন, যাঁরা লড়াইয়ের ময়দানে থেকে তাঁদের সবকিছু হারিয়েছেন, মানুষ তারাই। মানুষ হচ্ছেন কৃষক ও শ্রমিক। যাঁদের উপর নির্ভর করে দেশের অর্থনীতি। আমাদের যে মুক্তিযুদ্ধ তা ছিল কৃষকের মুক্তিযুদ্ধ, শ্রমিকের মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাঁরা আজ কোন জায়গায়?
জাহেদ সরওয়ার : তাদের কেন এই অবস্থা?
আজফার হোসেন : আজকে আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, উপনিবেশবাদের সঙ্গে যুক্ত যে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি গড়ে উঠেছে এসবের কারণে। আর এই সংস্কৃতিতে আপনাকে আর আমাকে ধরে নিয়ে যে কোন সময় মেরে ফেলা সহজ। তবে এখানে বিস্মিত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু এটা দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক।
জাহেদ সরওয়ার : না মেরে ফেলা প্রসঙ্গে আমি একটু বলতে চাই আজফার ভাই, সমগ্র পৃথিবীটাইতো এখন সাম্রাজ্যবাদ বা পুঁজিবাদের কলোনি। হতে পারে সেটা রাজনৈতিক, হতে পারে অর্থনৈতিক কলোনি। যেমন এখানে একাত্তরের পর থেকে চরমপন্থি নিধনের নামে এক ধরনের বিশেষ হত্যা জারি আছে।
আজফার হোসেন : কথা সত্য। তবে এখন এখানে এগুলো অনেকেই অস্বীকার করে বলে যে, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এগুলো পুরানো বর্গ। কিন্তু তাদের কাছে একটা প্রশ্ন- নতুন বর্গ তাহলে কি? নতুন সংজ্ঞা কি? তারা সেসব ব্যাপারে নিরব। খালি পুরানা বর্গগুলোই নাকি অচল। তারা আসলে এসব বলে বিরাজমান যে বাস্তবতা তাকে ধামাচাপা দিতে চায়। এবং বিদ্যমান অবস্থাকে তারা জারি রাখার জন্যই আসলে এসবকে পুরানা বর্গ বলে চেপে যায়।
জাহেদ সরওয়ার : এই যে চেপে যাওয়া, সাম্রাজ্যবাদ বা ক্রমপ্রসারমান পুঁজিবাদকে পুরানো বর্গ বলে অস্বীকার করা ও তার বিকিরিত গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিষফোঁড়াকে নীরবে সমর্থন দিয়ে যাওয়া এটাও তো তাদের একটা প্রজেক্ট। সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পদ্ধতির ভিতর দিয়ে খুব সূক্ষ্মভাবে তারা এমন কারিকুলাম প্রতিষ্ঠা করে চলেছে যে, প্রতিরোধ প্রতিবাদ এইসবও আজ বেশ পুরানো বলে মনে হচ্ছে। মানে নীরবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতির দিকেই মনে হয় আমরা এগুচ্ছি।
আজফার হোসেন : হ্যাঁ, আজকে যদি পশ্চিমের দিকেও আমরা তাকাই প্রায় সেটাই দেখি। পশ্চিম আমাদের ওপর আজও তাদের বিভিন্ন কায়দায় নানা কিসিমের আধিপত্য জারি রেখেছে। এবং যেখানে তাদের আধিপত্য নাই সেখানেও তা বিস্তার করে যাচ্ছে। এগুলো আমরা জানি। এই বিষয়গুলো যদি নতুন তত্ত্ব দিয়েও বলতে হয়, তাহলেও তো এগুলোর ভেতর পুঁজিবাদ বা সাম্রাজ্যবাদের কথা আসবেই। আমাদের এখানে ‘পেরিফেরাল ফরমেশন’ থেকে একদল আছে যারা মনে করে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ সম্পর্কে কথা বলা মানে অনেক পুরানো কথাবার্তা বলা। এটা একটা বিরাট সমস্যা। মানে চিন্তা করার আগে চিন্তাকে থামিয়ে দেয়ার মতো।
জাহেদ সরওয়ার : তাহলে আমরা এটাকে এভাবে নিতে পারি না- যারা এসব বলে তারা আসলে জেনেই বলছে? তারা পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদেরই পক্ষের। তারা ঐ প্রজেক্টেরই অংশ। এখানে একটা ইমেজ দাঁড় করানো যায় কিনা চেষ্টা করে দেখি, যদি আপনি অনুমতি দেন। অকস্মাৎ যদি আপনি হলিউডের হরর মুভি দেখেন। আমি একবার দেখেছিলাম। হররকে যদি আমরা পুঁজিবাদ হিসেবে কল্পনা করি, যেখানে সে কিচেনে রান্না করা অবস্থায় বাড়ির গৃহিণীকে আক্রমণ করে। তার ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে রক্তপান করে সরে যায়। কিন্তু গৃহিণী যখন সুস্থ হয়ে ওঠে, বাচ্চারা মা মা করছে ঠিকই, কিন্তু গৃহিণী তো আর আগের মা নাই। বাচ্চারা জানেও না যে, কিছুক্ষণ পরেই তাদের ঘাড়ের রক্ত খাবে মায়ের ছদ্মবেশি এই হরররূপী পুঁজিবাদ। এই হরর-রূপসী এত মা ও শিশুদের রক্ত খেয়েছে যে তারা আজ কোনটা তাদের মা আর কোনটা তাদের খুনী সেটা পরখ করতে পারছে না? এবং তারা যে একসময় সুস্থভাবে চিন্তা করতো তাকেই তারা বলছে সেসব পুরানো। কারণ হরর-রক্ত ইতিমধ্যে তাদের ভেতর প্রবাহিত? তারা আজ বলেছে সাম্রাজ্যবাদ পুরানা বর্গ, আধিপত্যবাদ আজ পুরানা বর্গ। মার্কসবাদ আজ পুরানা বর্গ।
আজফার হোসেন : আপনি খুব চমৎকার একটা প্রসঙ্গ তুলে আনলেন জাহেদ। স্বয়ং কার্ল মার্কসও কিন্তু পুঁজিবাদকে ঘাড়ত্যাড়া ভূতের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এই যে তারা বলছে, মার্কসবাদ একটি পুরানা বর্গ। কিন্তু মার্কসবাদের যে একটা ঐতিহ্য আছে তা বৈশ্বিক। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরে পুরা লাতিন আমেরিকা জুড়ে তার যে রূপ তাকে অস্বীকার করি কি করে? মার্ক্সীয় তত্ত্ব ও রাজনীতির একটা ঐতিহ্য আছে, ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসটা আবার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেনি। সেটা প্রবাহমান। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। ইতালীয় মার্কসবাদী আন্তনিও গ্রামসির একটা কথা এখানে বলা যায় : যারা জোর করে নতুন হতে চায় তারাই বরং যান্ত্রিক। যে তাকে জোর করে নতুন হতে হবে, অরিজিনাল হতে হবে। কিন্তু জোর করে নতুন হওয়া যায় না।
জাহেদ সরওয়ার : হ্যাঁ, হয়তো চমস্কিরা এটাকেই বলেছিলেন সম্মতি উৎপাদন। এটাও এক ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়া বটে। জোর করে সম্মতি উৎপাদন করা আর সেটা বজায় রাখা। এবং সেখান থেকে আরো সম্মতি উৎপাদন করা। মতামতও এখান থেকে উৎপাদিত হতে পারে। যেমন সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ বা মার্কসবাদ পুরানা বর্গ- এসব বলাও এক ধরনের উৎপাদিত মতামত। যা ঐতিহাসিক বিকাশের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যায় না।
আজফার হোসেন : আরেকটা কথা এখানে বলা যায় যে, মতামতের উৎপাদনের সঙ্গে আধিপত্যবাদ সম্পর্কযুক্ত। আরো বলা দরকার যে, মার্কসবাদের আরো অনেক ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। ইউরোপে হচ্ছে, লাতিন আমেরিকায় হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বে হচ্ছে। নতুন নতুন সব কাজ। কিন্তু এগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশে তথাকথিত বামপন্থীদের কোনো রিলেশন নেই, কানেকশন নেই। আরেকটা কথা এখানে বলা হয় যে, মার্কস নিজেও পশ্চিমা ভাবধারার। কিন্তু আমরা ক’জন জানি মার্কস নিজেই আলজেরিয়াতে গিয়েছেন, সেখানে থেকেছেন। সেখানকার যে মুসলমান সমাজ তাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। ভারতীয় সমাজ ও অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বকে তিনি বিভিন্নভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন। এই মার্কসকে তো আমরা চিনতে শিখিনি। আমরা ঐ মার্কসকেও চিনতে শিখিনি যে মার্কস এনলাইটেনমেন্ট প্রজেক্টের যে রৈখিকতা, ‘রিজন’, তার যে আধিপত্য সেই আধিপত্যেরও বিরোধিতা করেছেন। আমরা সেই মার্কসকেও চিনতে শিখিনি যিনি প্রগতির রৈখিক ধারাকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন। এই রকম বহু বিষয়ের মার্কস আছে। সেই মার্কসকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র খণ্ডিত মার্কস, শুধুমাত্র স্টিরিয়োটিপিক্যাল মার্কস সম্পর্কে যে ধারণা তা নিয়ে কথা বলে বেশি দূর যাওয়া যায় না। তো, এরা মার্কসবাদের ঐতিহ্যকেই অস্বীকার করে। যারা বিপ্লববিরোধী তারা তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়। এমন কি বিপ্লব কথাটা এক সময় ভাত পায় নাই, সেটা হচ্ছে উত্তরাধুনিকতাবাদীদের আধিপত্যের সময়। বিশেষ করে নব্বইয়ের দিকে। বিপ্লব শব্দটি হারাম ছিল, মার্কসবাদ হারাম, কমিউনিজম হারাম ছিল।
জাহেদ সরওয়ার : কবিতার মধ্যে মার্কসবাদী প্রতিরোধী বা বিপ্লবী শব্দাদি ব্যবহৃত হলে তাকে কবিতা নয় বলে তকমা মারা হয়েছে। এসবকে অচল পুরাতন বলা হয়েছে।
আজফার হোসেন : হ্যাঁ, কবিতা তো অনেক কারণেই না হয়ে উঠতে পারে। আমি মনে করি, মার্কসবাদ সম্পর্কে বস্তাপচা ধারণাগুলোর পিছনে আছে ইতিহাসবিচ্ছিন্নতা, মার্কসের কাজ নিয়ে অজ্ঞতা, আবার কায়েমি স্বার্থও আছে। মার্কসবাদ প্রয়োগে যে যান্ত্রিকতা তারও তো একটা ইতিহাস আছে। এগুলোর পর্যালোচনা হতে পারে। আরেকটা কথা বলা যায়, মার্কসবাদের জন্য মানুষ না, মানুষের জন্য মার্কসবাদ। এ রকম একটা কথা বলেছিলেন ক্যারিবিয়ান কবি এমে সেজেয়ার। তিনি বলেছিলেন যে, আমাদের যে স্ট্রাগল আমাদের যেই সংগ্রাম তার জন্যই মার্কসবাদ কিন্তু মার্কসবাদের জন্য আমাদের সংগ্রাম না।
জাহেদ সরওয়ার : না একটা আবেগের জায়গা থেকে যদি মার্কসবাদকে নাও দেখি। ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ব্যাখ্যা বা বিচার করার জন্য মার্কসবাদের চেয়ে কার্যকরী টুলসতো আর নাই। যারা মার্কসবাদের বিরুদ্ধে সচেতন মতামত উৎপাদন করে চলেছে তারাও তো সমাজকে ব্যাখ্যা ও বিচার করার ক্ষেত্রে মার্কসের স্মরণ নেয়।
আজফার হোসেন : হ্যাঁ, আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২০০৮ সালে পুঁজিবাদের যে সঙ্কট আবারো দেখা দিল, তখন লিবারাল থিওরিস্টরা যুক্তরাষ্ট্রে ও তার বাইরে এটাকে বলল ফাইনানসিয়াল ক্রাইসিস। অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা। কিন্তু এই সঙ্কট তো পুঁজিবাদের অন্তর্গত বিষয়। পুঁজিবাদের ইতিহাস যেমন তার আগ্রাসি বিস্তারের ইতিহাস, তেমনি পুঁজিবাদের ইতিহাস হচ্ছে তার সঙ্কটেরও ইতিহাস। এবং এই সঙ্কট অতিক্রমনেরও ইতিহাস। এটা ওয়ালস্ট্রিটের লোকরাও, এমনকি ডানপন্থিরাও স্বীকার করেছেন। তবে খানিকটা ব্যাখ্যা করা পর্যন্ত তারা মার্কসে থাকে, কিন্তু সমাধান যখন বিপ্লব তখন তারা থামে।
জাহেদ সরওয়ার : আমার মনে হয় সমস্যাটাও এর কাছাকাছি, একদিকে মার্কসবাদ দিয়ে সমস্যাগুলোকে ব্যাখ্যা ও চিহ্নিত করা যাচ্ছে, আর মার্কসীয় সমাধানের কথা ভাবতে গেলে সেটা বিপ্লবের দিকে যাচ্ছে। ইয়াস্তান গাডারের ‘সোফির জগত’ নামের ফিলসফিকাল ফিকশনে মার্কসিয় দর্শনের পরিচয় পর্বের শিরোনাম ছিল এরকম ‘ইউরোপকে তাড়া করছে একটি দৈত্য’।
আজফার হোসেন : এই মেটাফরটা খুবই ইন্টারেস্টিং। দৈত্যের মেটাফরটা মার্কস নিজেই ব্যবহার করেছেন। হরর মুভির কথা যেটা বললেন, তা বলতে গেলে পুঁজিবাদ যে একটা বিশেষ ধরনের হরর মুভি সেটা কেমন হতে পারে মার্কস সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন। পাশ্চাত্যের বির্নিমাণবাদী দাশর্নিক, ডি-কনস্ট্রাকসনিস্ট বলা হয় যাকে, যদিও শব্দটা এক্সাক্টলি বির্নিমাণ না, জাক দেরিদার একটা বই আছে, যার নাম স্পেকটার্স অব মার্কস। এই বইয়ে তিনি বলছেন, পুঁজি হচ্ছে স্পেকট্রাল, ভূতুড়ে। মার্কস নিজেই এই ভূত দ্বারা অবসেস্ড ছিলেন। সত্য, মার্কসে ভূতের মেটাফর ঘুরে ফিরে আসে। জাক দেরিদার তাঁর বইয়ের এক পর্যায়ে বলছেন, আমাদের হাতের আঙ্গুল গুণে ভূতের হিসাব রাখা দরকার। মার্কস এই ভূতের মেটাফরটা বহুবার ব্যবহার করেছেন। এই গুণাগুণতির ভেতর দিয়ে দেরিদা দেখাচ্ছেন মার্কস একটা ভূতুরে পলিটিক্স ও পোয়োটিক্সের উদ্বোধন ঘটাচ্ছেন। কিন্তু এখানে মজার ব্যাপার আছে। দেরিদার সীমাবদ্ধতা এই জায়গায়, মার্কসকে ভূতুড়েপনার মধ্যে আটকে রেখে তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নেয়ার যে জায়গাটা সে জায়গাটাকেও ভূতুড়ে করে তুলেছেন। অর্থাৎ ভূতুড়েপনাকে তিনি একপেশে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বৈপ্লবিক পথটাকে তিনি বন্ধ করতে চাচ্ছেন। মার্কস এত মেটাফর ব্যবহার করতে পারেন, এর থেকে একটা ভূতুড়ে কাব্যতত্ত্ব বেরিয়ে আসতে পারে। দেরিদা নিজেকে ম্যাটেরিয়েলিস্ট দাবি করেন। কিন্তু তিনি ভূতুড়েপনায় আচ্ছন্ন থেকে যান। এটাকে আমি বলি ‘টেক্সুয়াল ফেটিশিজম’। আপনি তত্ত্ব তৈরি করবেন, করবেন না কেন? কিন্তু তা তো বাস্তবতা ও মানুষের চলমান সংগ্রামের ইতিহাস তার ভিতর দিয়েই করবেন, জীবনঘনিষ্টভাবে যার প্রায়োগিক দিকটাও দেখতে হবে। আমি এখানে একটা মাওবাদি অবস্থান নিচ্ছি। জাক দেরিদার ‘বিনির্মাণবাদী’ রাজনীতির একটা বড় সমস্যা হচ্ছে তার টেক্সুয়াল ফেটিসিশম, যা আবার বিভিন্ন ধরনের ফেটিশিজম-এর লজিক উৎপাদন করতে থাকে। আর এই টেক্সুয়াল ফেটিশিজম বাস্তবে বিরাজমান উৎপাদন-সম্পর্ক ও ক্ষমতা-সম্পর্ককে কেবল ধোঁয়াশা করেই রাখে না; তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধী পদক্ষেপকেও ‘ডিজএইবল্’ করে।
জাহেদ সরওয়ার : এই জন্যই মনে হয় চারিদিকে আমাদের এতো অজস্র অলস বুদ্ধিজীবী। যারা স্বপ্নে আর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে মনে করেন যে তাদের বিপ্লবী দায়িত্ব সমাপ্ত।
আজফার হোসেন : এরা স্বপ্নেও যে বিপ্লব করে তাও না। এরা নিৎসে পড়ে, দেরিদা পড়ে। এদেরকে যেন আগে ভাগেই দেখতে পেয়েছিলেন এমে সেজেয়ার তাঁর বই ডিসকোর্স অন কলোনিয়ালিজম-এ। সেখানে চমৎকার একটা লাইন আছে। যেটা আমি ব্যবহার না করে পারছি না। ‘এইসব খাটাস, নিৎসের উরু থেকে জন্ম নেয়া বাকস্বর্বস্ব বুদ্ধিজীবী।’ তাদের কাজ হচ্ছে শুধু বকবক করা। এদের কথা আবার আন্তনিও গ্রামসিও এমে সেজেয়ারের অনেক আগেই বলেছিলেন, নিৎসীয় বকবককারী। এবং নজরুল ইসলামেরও একটা সুন্দর কথা আছে : ‘পলিটিকাল তুবড়িবাজি।’
এতে হয় কি, নিজেকে তারা খুব সুখী ভাবে। তারা ভাবে তুবড়িবাজি করে একটা জায়গায় গেলাম। এটা পুঁজিবাদি লজিকের সঙ্গে যায়, তার আলোকে একে দেখা যেতে পারে।
জাহেদ সরওয়ার : পুঁজিবাদের যে স্ট্রাকচার সেটা পাশবিক। আমি এখানে পশুদের নিচু করতে চাচ্ছি না। বলছি পশুদের মতো গোয়ার। আপনি দেখবেন পুঁজিবাদের পাণ্ডাদের আচরণ বৃষের মতো। এই বৃষকে আমরা সক্রাতাস প্লাতনের সংলাপের ভেতর যেমন দেখি, ম্যাকিয়াভেলিতেও দেখি। তাদের ক্ষেপিয়ে তুলতে দেখি নিৎসেকে।
আজফার হোসেন : আরেকটা কথা এখানে বলা দরকার। পুঁজিবাদের যে চেহারা তারও তো রূপান্তরের ইতিহাস আছে : বাণিজ্য পুঁজি, শিল্প পুঁজি, ফাইন্যান্স পুঁজি, আজকের বহুজাতিক ‘টেলি-টেকনো-মিডিয়াটিক’ পুঁজি ইত্যাদি। আর আমরা বলে থাকি, পুঁজিবাদ এখন অনেক বেশি আগ্রাসি, অনেক বেশি ক্রুর। এছাড়াও আরো দুটি বৈশিষ্ট্য আছে- একটা হলো, পশুর যে মেটাফরটা আপনি এনেছেন, পশু তারপরও ভাল। এমন কি মানুষের যে বিকাশ, মানুষের যে সৃজনশীলতা, পুঁজিবাদ তার বিকাশ চায়, তবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ সেটার বিনিময় মূল্য থাকে। যে সৃজনশীলতা মুনাফাকে সম্ভব করে, যে সৃজনশীলতার বাজার মূল্য আছে, তাকে পুঁজিবাদ সৃজনশীলতা বলে, বাদবাকি অসৃজনশীল! আমি যে দুটো বৈশিষ্ট্যের কথা বলছিলাম, তাদের একটা হচ্ছে ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ আরেকটি হচ্ছে ‘ফিক্সিটি’। দুটোই আবার তার নিজস্ব ফর্মেটে।
জাহেদ সরওয়ার : ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ এই প্রবাদটি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ হয়ে আজ প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত। মাঝে মাঝে ভাবি কি সর্বনাশ! এ মানুষকে কোথায় ঠেলে দিচ্ছে? ঠেলে দিচ্ছে না বরং আজকে বলা যায়, অন্য সব জীবন মানুষ তার নিজের স্বার্থে কোরবানি দিয়েছে। যখন খুশি যেকোনো কিছুকে সে ভোগ করার অধিকারী মনে করছে নিজেকে। অথচ প্রতিটি প্রাণিরই তো বাঁচবার অধিকার আছে দুনিয়ায়। একমাত্র বুদ্ধকে দেখলাম বলতে ‘জীবহত্যা মহাপাপ’ বলতে।
আজফার হোসেন : না, এই প্রশ্ন মার্কসও তুলেছেন। আমরা যদি মার্কসের ইকনমিক অ্যান্ড ফিলসফিকাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট পড়ি তাতে দেখবো, মার্কস বলছেন মানুষ হওয়াটা এখনো পর্যন্ত একটা আনফিনিশড প্রজেক্ট। মানুষ যে আমরা হয়ে উঠিনি সে জন্যই তো বিপ্লব, সে জন্যই তো সংগ্রাম। মানুষ হয়ে উঠেছি এটা আগেভাগে ধরে নিলে তো আর কিছুতেই অভিযোগ থাকবে না। মানুষ হয়ে-ওঠাটা একটা অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রকল্প। এখনো আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পারছি না, কিন্তু হয়ে উঠতে হবে। এ প্রসঙ্গে মানবতাবাদের কথা আসে। মানবতাবাদের অনেক রকম ভার্সন আছে, প্রকার আছে। পশ্চিমা মুলুক মানবতার কথা বলে, তবে সেখানে বলতেই হবে রেনেসাঁসের কথা। ইংরেজি রেনেসাঁস, তার আগে ছিল ইতালিয় রেনেসাঁস। ইতালিয় রেনেসাঁসের প্রভাব ইংরেজি রেনেসাঁসের ওপর আছে। ইংরেজি রেনেসাঁসের গর্ভে আসলে ব্যক্তির জন্ম হয়েছে। আর সেই ব্যক্তি হচ্ছে মানুষ। আর সে মানুষ হচ্ছে শাদা মানুষ। আমরাও উপনিবেশায়িত হয়ে একটা কথা ব্যবহার করি যে, ‘ম্যান ইজ দ্যা মেঝর অব এভরিথিং’। মানুষ হচ্ছে সবকিছুর পরিমাপক। মানে, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই। এই মানুষ রেনেসাঁসের মানুষ। এই মানুষ শাদা মানুষ। এই শাদা মানুষ সমস্ত কিছু মাপবে শাদা মানুষের মানদণ্ডে যে মানুষ ব্যক্তিকে সামনে আনে, যে মানুষ উপনিবেশকে সামনে আনে। অর্থাৎ রেনেসাঁসের যে প্রকল্প তা বর্ণবাদী উপনিবেশবাদ কায়েমের পক্ষে গেছে। এই কথাটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। না হলে তলিয়ে যাবার একটা সম্ভাবনা থাকবে। রেনেসাঁসকে আমরা এখনো দারুণভাবে উদযাপন করি। এই প্রকল্প ধরে নিয়েছে যে, মানুষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যে মানুষ হতে পারিনি, তার জন্যই তো এই সংগ্রাম, এই বিপ্লবের স্বপ্ন। এই মানবতাবাদ সম্পর্কে আরেকটু বলা দরকার। পরবর্তী সময়ে ইউরোপে এর দীর্ঘ বিস্তার ঘটেছে এনলাইটেনমেন্ট হিসাবে। এই এনলাইটেনমেন্টের প্রডাক্ট হচ্ছে কার্ল মার্কস। তবে কার্ল মার্কসকে শুধুই এনলাইটেনমেন্টের প্রডাক্ট বলাটা যথেষ্ট না। এই প্রজেক্টের অনেক কিছুকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। ধরা যাক, এনলাইটেনমেন্ট প্রজেক্টের ‘রিজন’-এর ব্যাপারটা। এই হেগেলীয় রিজনকে মার্কস শুধুমাত্র যে যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করেছেন তা না। তাকে তিনি চ্যালেঞ্জও করেছেন। হেগেলের আগে কান্ট। তাঁকে আমরা বলি রিজনের দার্শনিক। তিনি ক্রিটিক অব পিওর রিজন লিখেছেন; লিখেছেন তিনি ক্রিটিক অব প্র্যাকটিকাল রিজন আর ক্রিটিক অব জাজমেন্ট; কান্ট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলতে পারে। এখানে কান্ট রিজনের পাওয়ারটা শনাক্ত করেছেন, রিজনের সীমাবদ্ধতাও শনাক্ত করেছেন। সেটা মার্কস নিজেও স্বীকার করেছেন। মার্কসকে আবার কান্টীয় মার্কসও বলেন কেউ কেউ। মার্কস যে এনলাইটেনমেন্ট প্রজেক্টের খপ্পরে পড়ে শুধু রিজনটাকে নিয়েছিলেন সেটা না। যাই হোক, ওই রিজনকে ব্যবহার করা হচ্ছে পুঁজিবাদের বিস্তারের স্বার্থেও, ওই রিজনকে ব্যবহার করা হচ্ছে উপনিবেশবাদ পোক্ত করার স্বার্থেও। আর মার্কস পুঁজিবাদবিরোধী ও উপনিবেশবাদবিরোধী অবস্থান থেকে এই রিজনকেও প্রশ্ন করেছেন। দেখিয়েছেন যে, এটা সত্যিকারের রিজন না। রিজনেরও যে বিকাশ সেটাও অসমাপ্ত- তার মানে মানুষের বিকাশও অসমাপ্ত। এই যে এনলাইটেনমেন্টের যে সীমাবদ্ধতা ও তার মানুষের ধারণাকে মার্কস প্রশ্ন করেছেন। আর পশ্চিমের যে মানবতাবাদ সেটার প্রভাব পড়েছে আমাদের এখানেও। আমি যদি ব্রিটিশ উপনিবেশী শাসনামলের অবিভক্ত ভারতের কথা বলি, তাহলে দেখি রাজা রামমোহন রায় থেকে এই মানবতাবাদের যাত্রা শুরু হয়। এই মানবতাবাদকে আমরা আসলে উদারনৈতিক মানবতাবাদ বলতে পারি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথও এই মানবতবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কিন্তু আবার নতুন মানবতাবাদ বা এমনকি বিপ্লবী মানবতাবাদের কথা বলা যেতে পারে। সেটা হচ্ছে মার্ক্সীয় মানবতাবাদ। ফিলসফিকাল ম্যানুস্ক্রিপ্টের যে মার্কস তিনি মানবতাবাদী মার্কস। ফরাসি মার্কসবাদী তাত্ত্বিক লুই আলথুজার বলছেন, আর্লি মার্ক্স হচ্ছেন মানবতাবাদী মার্কস। এই জায়গায় রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ আসতে পারে। যদিও সেটা আরেক আলোচনা। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলেছিলেন, ম্যানেজারের সাথে কুলির যে ঐক্য সেটা সত্য ঐক্য নয়। পশ্চিমা মানবতাবাদ বা উদারনৈতিক মানবতবাদ বা এনলাইটেনমেন্টের মানবতাবাদ বা তার আগের রেনেসাঁসের মানবতাবাদ- মানুষ মানুষ বলে ডাক দেয় ঠিকই- কিন্তু তুমিও মানুষ আমিও মানুষ বলে ডাক দিয়ে সমাজে যে অসম ক্ষমতা-সম্পর্কটা আছে, শ্রেণি সম্পর্কটা আছে, জেন্ডার সম্পর্কটা আছে, সেগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করে। মানুষের জয়গান গেয়ে মানুষের সমাজে অসম শ্রেণি সম্পর্কগুলো মুছে ফেলতে চায় তারা। এই মানবতাবাদ বৈপ্লবিক রাজনীতির পরিপন্থি। তাই মার্কস বলছেন যে সত্যিকার মানুষের ইতিহাস শুরুই হয়নি। মানুষ হয়ে উঠার যে প্রকল্প তা দুর্দান্তভাবে অসমাপ্ত। মানুষ তার পূর্ণ স্বাধীনতা পায়নি। এমনকি তিনি বলছেন মানুষের পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের যে মুক্তি সেটাও পায়নি মানুষ। এখানে নজরুলের কথাও আসতে পারে। তিনি বলছেন, ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে নহে কিছু বড় নহে কিছু মহিয়ান।’ তবে তিনি শুধু এখানে থেমে থাকছেন না, তিনি এও বলছেন যে, মানুষে মানুষে কোনো বৈষম্য চলবে না। এটা হচ্ছে বৈপ্লবিক মানবতাবাদ। এই ধারায় যে বিপ্লবী মানবতাবাদ তা চে গুয়েভারার মধ্যে ছিল। ফ্রানৎস্ ফানো’র মধ্যে ছিল। আফ্রিকার আমিলকার কাব্রালের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ নজরুল, চে গুয়েভারা, ফ্রানৎস্ ফানো আর আমিলকার কাব্রালের কথা আমি একসঙ্গে ও বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম এখানে।
জাহেদ সরওয়ার : তালাল আসাদের কথা বলবো না?
আজফার হোসেন : তালাল আসাদ তো অন্য জায়গায় অন্য প্রসঙ্গে এনেছেন। তালাল আসাদকে আমি এই ধারার কোনো বিপ্লবী তাত্ত্বিক মনে করি না। তালাল আসাদ আমাদের সময়ের বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তের কিছু দিককে অসাধারণ ক্ষমতার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তালাল আসাদের সাথে মার্কসবাদের সম্পর্ক তো টানাপোড়েনের সম্পর্ক।
জাহেদ সরওয়ার : আচ্ছা, আজফার ভাই, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে মানুষ তার নিজেকে উৎরে যেতে না পারার কারণ হচ্ছে তার প্রাণিজ স্ট্রাকচার। যেহেতু মানুষ এক ধরনের প্রাণি। তার অরিজিনেরই কোথাও কোনো সমস্যা আছে। হয়তো সেটা সমস্যা না। যেমন ধরেন, দুনিয়ার সমস্ত সমস্যার পিছনেই আছে ক্যাপিটালিজম। এই ক্যাপিটালিজম কিন্তু বিকাশের ধারাবাহিকতায় এসেছে। তাহলে এটা আসবে কোত্থেকে যদি মানুষের স্বভাবের মধ্যেই সেটা না থাকে। মুনাফা লুটবার ইচ্ছে বা অন্যকে বঞ্চিত করবার ইচ্ছে। পুঁজির বল্গাহীন বিকাশের কারণে সমস্যা ও বৈষম্য ছড়াতে থাকে। এইটা একটা নেটওয়ার্কের কারণে ইলেকট্রনিকাল ক্ষতিকর কোনো রশ্মির মতো। যার চাপ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত সবার উপর এসে পড়ে। যত তারা মুনাফা লুটবার আয়তন আর পণ্য বাড়াচ্ছে ততই সমস্যাও বাড়ছে। তো এই যে বৈষম্য, এই যে চাপ, এই যে অসন্তোষ তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে এগুলো কমার কোনো লক্ষণ নাই। তো আজকে যদি পারমাণবিক যুদ্ধে দুনিয়াটা নরকে যায় বা ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে এটা বলা যাবে না যে মানুষের বয়স পৃথিবীতে খুব কম ছিল। কাছাকাছি কিছু সমস্যা নিয়ে তারা কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে বাস করছে। তাহলে এই সমাজের জারিকৃত বৈষম্য এইটার সাথেও গণমানুষ পরিচিত কিন্তু তারা বুঝেও বুঝে না যে তারা সাফারার। তাদের মধ্যে বৈষম্য জারি রাখতে ক্ষমতাবানদের যে জারিজুরি তা এখনো তারা ভেদ করতে পারলো না, বা সে ইচ্ছেও তাদের আছে কিনা সন্দেহ কিন্তু সাফারিংসটা আছে তো। এই জারিকৃত প্রায় সব কাজই কিন্তু আম-পাবলিকের ভাল করার দোহাই দিয়ে। ধরেন রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যবাদের সকল প্রকল্পই কিন্তু বলা হচ্ছে মানবজাতির মঙ্গলের জন্য। কিন্তু আসলে তো তা না তারাতো করছে তাদের মুনাফার জন্য। ধরেন, আমাদের দেশে আজকে প্রায় সব খাবারে বিষমাখানো। বাজারে এমন কোনো খাবার পাবেন না যাতে মানুষের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য বা ভেজাল মেশানো না। তো যে মানুষটি চিনির সাথে সার মেশাচ্ছে। খারাপ চালের সাইজ পরিবর্তন করে অধিক দামে বিক্রি করছে। রঙ মেখে অতি সবুজ করে সবজি বিক্রি করছে। ফরমালিন দিয়ে মাছ, বিভিন্ন ধরনের ফল বিক্রি করছে। এইটা যে মানুষের ক্ষতি করছে তা আপাত চোখে না দেখা গেলেও দেশে যে পরিমাণ হাসপাতাল বেড়েছে। কিডনি ফাউন্ডেশনে গেলে, ডায়াবেটিক হাসপাতালে গেলে, হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে গেলে চোখে পড়বে যে কি পরিমাণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ। কিন্তু যে মেশাচ্ছে সেও মানুষ, তার কাছে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ না, মুনাফা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশে তো এটাকে খাদ্য বিষক্রিয়ায় নীরব গণহত্যা বলা যায়। তো এই যে মানুষগুলো দিনের পর দিন এগুলো জেনে-বুঝে-শুনে যেন কিছুই হয় নাই এমন ভান করে থাকছে। এইখানে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটিরও কথা আসবে। কিন্তু সেটাতো মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদেরই প্রতিষ্ঠান। সেটা সব সময় ভেজাল দিলেও, বিষ দিলেও, সাধারণ মানুষ মরলেও তার জিডিপি আগানো থাকলেই সে খুশী। ফলে এই যে সাধারণ মানুষগুলোর প্যাসিভনেস। নীরবে মার খাওয়ার প্রবণতা এইটা আমার মনে হয় তার জিনগত সমস্যা।
আজফার হোসেন : এর পিঠে একটা কথা হচ্ছে মানুষ আদৌ স্ট্রাকচার কিনা। মানুষ তো কেবল স্ট্রাকচার না। আন্তনিও গ্রামসি একটা কথা বলছেন। মানুষ হচ্ছে একটা প্রসেস, একটা প্রক্রিয়া। কিন্তু কিছু কিছু স্ট্রাকচার আছে যা মানুষকে প্রভাবিত করে। জিনের ব্যাপারটা তো আরেক আলোচনা। আমি জেনেটিক ডিটারমিনিজমের ব্যাপারটা বিশ্বাস করি না। আমি প্রসেস নিয়ে কথা বলবো। মানুষ একটা প্রসেস। সে হয়ে উঠছে। এগজিস্টিং যে সব স্ট্রাকচার আছে, সামাজিক কাঠামো, রাজনৈতিক কাঠামো ইত্যাদি, সে সব তো মানুষকে প্রভাবিত করে বটে, তবে মানুষও তাদের পাল্টা প্রভাবিত করে, তাদেরকে এমনকি বদলাতেও পারে। পুঁজিবাদ হচ্ছে একটা সর্বগ্রাসি কাঠামো। পুঁজিবাদের চেয়ে এত সর্বগ্রাসি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো আমরা আর দেখিনি। কিন্তু পুঁজিবাদ কি শুধু জোর করে টিকে? পুঁজিবাদ তো উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে বসে। তার বিভিন্ন ছলছাতুরি আছে। এই যে আপনি বললেন, সে ভাল করার নাম করে মুনাফা লুটে। আবার তার সঙ্গে থাকে তার সহযোগি অলঙ্কারশাস্ত্র। সঙ্গে থাকে তার পাইক-পেয়াদা-মাস্তান বাহিনি। পুঁজির পুনরুৎপাদনে আরো কিছু বিষয় থাকে। তার নিজের তৈরি করা আইডিয়োলজি আছে। মতাদর্শের ব্যাপার আছে। পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে মতাদর্শ হচ্ছে পুঁজিবাদী পুনরুৎপাদনের সাথে যায় এমন ধ্যান-ধারণা। আন্তনিও গ্রামসি এখানে মতাদর্শিক আধিপত্যের কথা এনেছেন। এটাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘হেজিমনি’ আর ইতালিয় ভাষায় বলা হচ্ছে ‘এগিমনিয়া’। হেজিমনি বা মতাদর্শিক আধিপত্যবাদ হচ্ছে, মানুষ স্ট্রাকচার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এমনভাবে যে, এই নিয়ন্ত্রণ আবার নিরঙ্কুশ না। মানুষ ইন্টারনালাইজ করে। মানুষ ভাবছে এটাই তো ভালো, আমার জন্য এটাই তো ভাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমি কালো শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছিলাম। কালো শ্রমিকদের ‘লারনা’ বলে একটা সংগঠন ছিল। আমি ওটার সাথে যুক্ত ছিলাম। তাদের পত্রিকা পিপল্স ট্রিবিউন-এ লিখতাম। কালো শ্রমিকদের সাথে কাজ করার সময় এক নির্যাতিত কালো শ্রমিক বলেছিলেন, একদিন আমিও মাল্টিমিলিওনিয়ার হবো। এই স্বপ্ন সে দেখছে। কিন্তু কখনোই সে মাল্টিমিলিওনির হবে না। সে ব্যবস্থা পুঁজিবাদ করে রেখেছে। সুতরাং এটা হচ্ছে সাংস্কৃতিকভাবে, মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করবার একটা অদ্ভুত রকম ব্যবস্থা। এই যে নিয়ন্ত্রণ এটা তো আছেই। এইভাবে পুঁজিবাদ নিজে রিপ্রডিউস করে। আবার এর অর্থ এই না ওই শ্রমিকের কোনো এজেন্সি নাই। এর অর্থ এই না যে, এই শ্রমিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারেন না। এর অর্থ এই না যে শ্রমিকরা আন্দোলন করতে পারেন না। এই যে কিছুদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমেছিলেন। এই জন্য তারা যে টোটাল ব্রেইনওয়াশড, সেটা বলা যাবে না। কথা হচ্ছে, যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠছে না, কথা হচ্ছে এটা ধারাবাহিক না। কেন না, সেটা নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে। তবে আমার মনে হয়, এই প্রতিরোধ শক্তিশালী হয়ে না উঠার কারণ হচ্ছে পুঁজিবাদবিরোধী প্র্যাকটিসের ক্ষেত্রে নতুন কোনো ট্যাকটিক, নতুন কোনো তত্ত্ব সংযোজন করতে পারছি না। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, পুঁজিবাদও এইসব আন্দোলনকে স্যাবোটাজ করে। এই সব চড়াই উৎরাই তো আছেই। বিপ্লব তো আর দিনে দিনে হয় না, রাতারাতি হয় না। এমনকি একটা পর্যায়ে এসেই সফল হয় না।
জাহেদ সরওয়ার : এর প্রমাণ তো সোভিয়েত ইউনিয়ন। যেখানে বিপ্লবের বয়স সত্তর বছর। তবে এইটা একটা ব্যাপার যে সত্তর বছর মানুষ সমাজতান্ত্রিক পরিবেশের মধ্যে থাকতে পেরেছে তার মানে এইটা একেবারে অসম্ভব না। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কে যা বলা হয় সোভিয়েত বা সমাজতান্ত্রিক অন্তঃকলহের কারণেই সমাজতন্ত্র টিকে নাই। এইটা আমি সম্পূর্ণ ঠিক মনে করি না। কারণ একটা সোভিয়েত ইউনিয়ন আর বাকি পৃথিবী মানে জবরজং পুঁজিবাদী পৃথিবী। যাদের কাঁচামালের সংগ্রহ বিস্তীর্ণ পৃথিবীর কলোনি থেকে। যেই পুঁজিবাদী পৃথিবীর একমাত্র শত্রু ছিল সোভিয়েত। এখন সোভিয়েত নিজের মানুষদের মুখে খাবার, তাদের জন্য বিদ্যুৎ বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে, না পুঁজিবাদ নামের বিশাল শত্রুটাকে মোকাবিলা করবে। মাইকেল সেয়ার্স ও অ্যালবার্ট কাহ্নের ‘গ্রেট কনস্পেরেসি অ্যাগেইনস্ট রাশিয়া’ বইটাও একটা উদাহরণ হতে পারে এক্ষেত্রে। যে কত রকম ষড়যন্ত্রের জাল পাতা ছিল পুঁজিবাদের পক্ষ থেকে।
আজফার হোসেন : আসলে কোনো বিপ্লবই চূড়ান্ত অর্থে সফল না। আবার কোনো বিপ্লবই চূড়ান্ত অর্থে ব্যর্থও না। অর্থাৎ আমাদের বিপ্লবের কাজটাই অসমাপ্ত। তবে বিপ্লবের যে ভুল সেটা থেকে শিক্ষা নেয়া যায়। আগামির বিপ্লবে যেন সেই ভুল আর না হয়। ‘রেভুলেশনারি ডায়ালেকটিকস্’ বলে একটা কথা আছে। একজন মার্কসবাদী কখনই বিরাজমান বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন না। আবার পুরাতন বাস্তবতাকে দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে ধরার চেষ্টা করেন না। এটা মার্কসবাদের বিরোধী। যে তাত্ত্বিক বা প্র্যাকটিশনার বা অ্যাকটিভিস্ট ডায়ালেকটিকালি এনগেইজড, সে কিন্তু কখনোই ইতিহাসের চাকা পেছনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন না। তিনি কখনোই বলবেন না, আমরা ঠিক সোভিয়েত কায়দায় বা চিনের কায়দায় সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করবো বাংলাদেশে। এটা তো একটা প্রতিক্রিয়াশীল ব্যাপার। অর্থাৎ আমার যে সময় তার সাথে সম্পর্কিত থেকে সময়ের যে চাহিদা, সমস্যা যা আছে সেটাকে চিহ্নিত করতে পারার ভেতর দিয়ে আমি বিপ্লবী রাজনীতিতে প্রবেশ করার পক্ষে। এটাই হচ্ছে রেভুলেশনারি ডায়কলেকটিকস্। এখানে এভাবে ব্যবহৃত হতে পারে মার্কসবাদ।
জাহেদ সরওয়ার : এইখানে আজফার ভাই আমি একটু দ্বিমত করতে চাই সেটা হচ্ছে, বিপ্লব বা পরিবর্তনের জন্য কি আগে থেকে মার্কসবাদের চর্চা বা থিউরির ভেতর দিয়ে আগানো জরুরি? যদি ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা বিপ্লবের কথা ধরি বা হুগো চাভেজের ভেনিজুয়েলার কথা বলি। কাস্ত্রো তো মার্কসবাদী হয়েছেন চে গুয়েভারার সংস্পর্শে এসে। ফিদেল বরং নিজেকে বলতেন তিনি বলিভারপন্থি। অর্থাৎ সিমন বলিভার ছিলেন ফিদেলের হিরো। আবার চাভেজের হিরো ছিলেন দুজন- বলিভার ও ফিদেল। তিনি নিজেকে ফিদেলিস্তা বলতেন। মার্কসিয় চিন্তাগুলো তো মার্কসবাদ ছাড়া করা যাবে না তেমন না।
আজফার হোসেন : আসলে কে মার্কসবাদী আর কে মার্কসবাদী না, এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর মিলে না। একক উত্তর মিলে না। এই জন্য যে মার্কসবাদের যে রাজনৈতিক ঐতিহ্য তা হচ্ছে ডায়ালেকটিকসকে প্রয়োগ বা চর্চা করার ঐতিহ্য। মার্কসবাদের ক্ষেত্রে এই ডায়ালেকটিকসটাকে যদি আমরা গুরুত্ব দিই, তাহলে আমরা তো মার্কসের যে তত্ত্ব সে তত্ত্বটা পড়ে, তার প্র্যাকটিসের ভিতর দিয়ে, সেই তত্ত্ব প্রয়োগ করে নিজেকে একজন মার্কসবাদী হিসাবে বিবেচনা করতে পারে। এখন মার্কসবাদের চেহারা কি সব জায়গায় এক রকম? পুঁজিবাদের চেহারাও কিন্তু সব জায়গায় এক রকম না? পুঁজিবাদেরও অসম বিকাশের তত্ত্ব আছে। পুঁজিবাদ তার আগ্রাসি বিস্তার নিয়ে উপস্থিত হলেও সে কিন্তু অসমভাবে বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশের যে পুঁজিবাদের চেহারা তার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদের যে চেহারা তার মধ্যে পার্থক্য আছে। সুতরাং মার্কসবাদের যে বিকাশ বা অসমতা সেটাও তো ক্ষেত্র বিশেষে আলাদা হতে বাধ্য। ফিদেলের মার্কসবাদ, হুগো চাভেজের মার্কসবাদ, বা ভাসানির মার্কসবাদ তো এক না। তা হলে কি ভাসানি মার্কসবাদী না? মার্কসবাদ তো আর রিলিজিয়াসলি প্রতিটি বর্ণ প্রতিটি শব্দকে বিশ্বাস করতে হবে ব্যাপারটা তেমন না। ডায়ালেকটিকস্কে যদি আমরা সামনে রাখি, তাহলে পরিবর্তিত সময় অর্থাৎ বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে তার সমস্যা সমাধান কল্পেই তার প্রয়োগ হবে। এবং একই সঙ্গে ইতিহাসও জানতে হবে। তবে ইতিহাস জানা মানে অতীতে আটকে থাকা না, বরং ইতিহাস থেকে রসদ সংগ্রহ করতে হবে। অতীতের যে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো এভাবে সামনে আনা যেতে পারে। ডায়ালেকটিকাল অ্যাপ্রোচ আমার মনে হয় খুবই কাজের। ডায়ালেকটিকস্ মানে দুইটা জিনিসের যে দ্বন্দ্ব তার চেয়েও বেশি। এই ডায়ালেকটিকাল অ্যাপ্রোচকে যদি সামনে রাখি আমি তাহলে বলবো যে ফিদেল কাস্ত্রো তার মতো করে বুঝেছেন মার্কসবাদ। চাভেজও তার মতো করে মার্কসবাদী। ফিদেল যে মার্কসবাদের সহযোগিতা নেননি তা নয়। চে গুয়েভারা তাকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়েছেন। যেমন কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো ফিদেলকে পড়িয়েছেন চে গুয়েভারা। মার্কসের ক্যাপিটাল-এর বেশ কিছুটা কিন্তু চে গুয়েভারা পড়েছিলেন। এবং সেটা নিয়ে তার কমেন্টসও আছে। মার্কসের ওপর চে গুয়েভারার একটা বইও আছে। চে গুয়েভারার কারণেই ফিদেল মার্কসবাদের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। এবং মার্কসবাদের যেটা তার প্রয়োগযোগ্য মনে হয়েছে সেটা তিনি প্রয়োগ করেছেন।
জাহেদ সরওয়ার : হুগো চাভেজও মনে হয় মার্কসের ক্যাপিটাল পড়া শুরু করেছিলেন। জানি না সেটা শেষ করতে পেরেছিলেন কিনা। তিনি একবার ক্যাপিটাল বইটা নিয়ে জাতিসংঘের অধিবেশনে কথা বলেছিলেন। বইটা দেখিয়ে দেখিয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন। ঠিক কি বলেছিলেন আমার মনে নাই। আরেকবার তো নিয়ে গেলেন চমস্কির হেজিমনি অর সারভাইবাল বইটা।
আজফার হোসেন : না, এরা কেউই যান্ত্রিকভাবে মার্কসবাদী না। তবে এও বলবো, এঁরা সবাই কোনো না কোনোভাবে আবার মার্কসের কাছে ঋণী।
জাহেদ সরওয়ার : আমার মাঝে মাঝে মনে হয় সাব-কন্টিনেন্টের মার্কসবাদীরা মার্কসবাদকে যান্ত্রিকভাবে গ্রহণ করেছেন। তাই তারা তার ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে পারেন নাই বা পারছেন না। আপনি সাব-কন্টিনেন্টের মার্কসিস্টদের সাথে কথা বললে দেখবেন তারা প্রচুর তত্ত্ব আওড়ায়। মুখস্থ তত্ত্ব যার কোনো প্রায়োগিক সীমারেখা নাই। ডেস্টেনি নাই।
আজফার হোসেন : হ্যাঁ, এক্বেবারে। যান্ত্রিকভাবে মার্কসবাদকে উপলব্ধি করতে গিয়ে তারা যতটা না বাস্তবতার খাতিরে মার্কসবাদী তার চেয়ে বেশি হচ্ছে মার্কসবাদের কিছু নির্দিষ্ট, মুখস্থ করা ধারণার স্বার্থে মার্কসবাদী।
জাহেদ সরওয়ার : কিন্তু বস্তুত ব্যাপারটা এরকম হওয়া উচিত মনে হয় আমরা মার্কসবাদের জন্য না, মার্কসবাদ আমাদের জন্য।
আজফার হোসেন : হ্যাঁ, কথাটা আমি আগে বলেছিলাম। আবারও বলছি। আমি আপনার সাথে এ বিষয়ে একমত।

শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও কমরেড বদরুদ্দীন উমর! || আজফার হোসেন

শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও কমরেড বদরুদ্দীন উমর! আজ ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী এবং মার্কসবাদী তাত্ত্বিক-অ্যাকটিভি...

শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও কমরেড বদরুদ্দীন উমর!
আজ ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী এবং মার্কসবাদী তাত্ত্বিক-অ্যাকটিভিস্ট-ইতিহাসবেত্তা বদরুদ্দীন উমর ৮৬ বছরে পা দিলেন!

বিপ্লবী উমরের জীবন মানেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে--সমস্ত ধরণের নিপীড়নের বিরুদ্ধেই--এক আপসহীন মহাকাব্যিক অভিযাত্রা! আমার এই তুচ্ছ জীবনে মেলা অপ্রাপ্তি আছে বটে, তবে এই তুচ্ছ জীবনের একটা বড় পাওনা হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উত্তাল রাজনৈতিক পর্বে বেশ কিছু সময় ধরে লড়াকু বদরুদ্দীন উমরের কাছাকাছি থেকে তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা।

আজ কিছুক্ষন আগে যখন টেলিফোনে তাঁর সেই পুরানো, পরিচিত, কিন্তু প্রাসঙ্গিক কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠলো, যা শুনলাম এই দূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই (তিনি অভিযোগ করছিলেন কেন আমি তাঁর সঙ্গে বেশি বেশি দেখা করি নাই গতবার ঢাকায় থাকার সময়), তখন নিমেষেই উমরের রক্ত-দিয়ে-লেখা কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্তের কথা মনে এসেছিল, যা নিয়ে শিঘ্রি বিস্তারিত লেখার পরিকল্পনা আছে। তবে আজ এতোটুক বলে রাখিঃ পৃথিবীব্যাপী সততা, সাহস আর জ্ঞানের দুর্দান্ত দৃষ্টান্তমূলক সম্মিলন ঘটেছে যে-সব চিন্তাবিদ আর অ্যাকটিভিস্টের মধ্যে, তাঁদের মাঝে অবশ্যই আমাদের উমর অন্যতম।

সত্য, বিভিন্ন এলাকায় উমর তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন, যেমন আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে তাঁর কাজ নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী, কিন্তু আমাদের এই পচে-যাওয়া আপসকামী 'শিক্ষিত' মধ্যবিত্ত সমাজ এই আপসহীন ও সাহসী চিন্তাবিদ বদরুদ্দীন উমরের কাজের মূল্যায়ন করতে যে সক্ষম হয় নাই এবং হবেও না, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নাই।

গত বছর বদরুদ্দীন উমরকে নিয়ে একটা ছোট নোট লিখেছিলাম। আজ তাঁর ৮৬তম জন্মদিনে সেই নোটটা বন্ধুদের সঙ্গে আবারও শেয়ার না করে পারছি না। নিচে নোটটা পেশ করলামঃ

দেশ থেকে দূরে থাকলে হয়তো এমনই হয় : যাদের সঙ্গে একসময় কাজ করেছি, তাদের কথা মনে হয়। বারবারই। আর বন্ধুদের সঙ্গে ওই কথাগুলো শেয়ার করার ইচ্ছাও হয়। তো, অল্প বয়সেই বাংলাদেশের যে দুজন বাম চিন্তক ও অ্যাক্টিভিস্টের একেবারে কাছাকাছি থেকে কাজ করেছি, তাঁদের একজন হলেন বদরুদ্দীন উমর, অন্যজন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

বদরুদ্দীন উমরের হাতে-গড়া (অন্যদের ভূমিকাও ছিল অবশ্য, বিশেষ করে আমার শিক্ষক ও কমরেড আহমদ ছফার) বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বেশ কয়েক বছর কাজ করার কারণেই উমর ভাইয়ের একেবারে কাছাকাছি আসার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আর ওই পদে আমার একজন যোগ্যতর পূর্বসূরি ছিলেন আমার দীর্ঘ সময়ের কমরেড, বন্ধু ও শ্রদ্ধেয় ভাই আনু মুহাম্মদ। সে সময়ে আমাদের সংগঠনের হয়তো সবচেয়ে সক্রিয় মানুষটা ছিলেন ওই সংগঠনেরই সহসভাপতি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। না বলে পারছি না যে, সেই সময়টা ছিল বাংলাদেশ লেখক শিবিরের ইতিহাসে এক উত্তাল, দারুণ তাৎপর্যময় অধ্যায়।

বেশ কিছু কথা মনে পড়ছে আজ। অক্সফোর্ডে পড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া, বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের পক্ষে সার্বক্ষণিক রাজনীতি করা এই বদরুদ্দীন উমর বাসে চলাফেরা করতেন। একদিন আমি আমাদের পুরানা পল্টনের লেখক শিবিরের অফিস থেকে বাসে করে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছি তাঁর মিরপুরের বাসায়। তখন কথায় কথায় জানতে পারলাম, তিনি বাংলাদেশের সমস্ত ‘শীর্ষস্থানীয়’ এবং ‘লোভনীয়’ পুরস্কার—আদমজী পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ (এবং পরে এমনকি একুশে পদক) অন্যান্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন একের পর এক। তখন বাক্যের গনগনে চুল্লিতে তাঁর শব্দসব ফুটছিল টগবগ করে। তাঁর সততা আর সাহসের সামনে আমার মাথা নত হয়ে এসেছিল। মনে হলো, এই পাশে বসা মানুষটার পাশে না বসে তার পায়ের কাছে বসে থাকি। হাত দিয়ে তাঁর পা ছুঁয়ে দিই! তাঁর ওই সততা আর সাহসের কারণেই বদরুদ্দীন উমর সত্য কথাটা যেভাবে নির্দ্বিধায়, নির্ভয়ে এবং পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করতে পারেন, তা কেউই তাঁর মতো করে পারেন না বলে আমি মনে করি। খালি খালি আমার প্রিয় মানুষ আহমদ ছফা এই কথা সাহস নিয়ে বলেন নাই, ‘আমি বদরুদ্দীন উমরের যুগে বাস করি বলে গর্বিত।’

আবারও জানাই কমরেড উমরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা--লড়াকু শুভেচ্ছা।

Unwritten History: Faiz Ahmed Faiz and Gabriel García Márquez || Azfar Hussain

This blood which has disappeared without leaving a trace isn't part of written history: who will guide me to it? --Faiz Ahmed Fai...


This blood which has disappeared
without leaving a trace isn't part
of written history: who will guide me to it?
--Faiz Ahmed Faiz

The above lines by Faiz make me think of Gabriel Garcia Marquez's _One Hundred Years of Solitude_--of that moment of unwritten history when the actual event of killing three thousand workers was brutally and institutionally denied and erased! Garcia Marquez speaks of that moment thus:

"There must have been three thousand of them," he murmured.

"What?"

"The dead," he clarified, "it must have been all of the people who were at the station."

The woman measured him with a pitying look. "There haven't been any dead here," she said.

And Garcia Marquez adds:

[...] and by a decision of the court it was established and set down in solemn decrees that the workers did not exist.