আজফার হোসেন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটি-তে লিবারেল স্টাডিজ এবং ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজ-এ...

সাক্ষাৎকার: দেরিদা নিজেকে ম্যাটেরিয়েলিস্ট দাবি করেন কিন্তু তিনি ভূতুড়েপনায় আচ্ছন্ন : আজফার হোসেন

12:00 PM Editor 0 Comments

আজফার হোসেন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটি-তে লিবারেল স্টাডিজ এবং ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজ-এ অধ্যাপনা করছেন। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড্ স্টাডিজ্’-এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসাবে বর্তমানে কাজ করছেন এবং সেখানে তিনি ইংরেজি, বিশ্বসাহিত্য এবং ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজ-এর অধ্যাপকও। এ বছর তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস-বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এ ইংরেজি সাহিত্য পড়াচ্ছেন।
আজফার হোসেন ইংরেজি সাহিত্য, কালচারাল স্টাডিজ এবং এথনিক্ স্টাডিজ পড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি, বৌলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটি-তে। পড়াশুনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে, যেখান থেকে তিনি শীর্ষস্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ‘ডিসটিংসন্’সহ ইংরেজি ও বিশ্বসাহিত্যে ডক্টরেট করেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় তিনি লিখে থাকেন। ভাষা, সাহিত্য, সাহিত্যতত্ত্ব, সংস্কৃতি, দর্শন, ইতিহাস, রাজনৈতিক অর্থনীতি, এবং রাজনীতি-সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি কয়েকশ’ প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখেছেন, যেগুলো বিভিন্ন সময়ে দেশে ও বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি ভাষা থেকে তার ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। বাংলায় ও ইংরেজিতে তার কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে, যেমন প্রকাশিত হয়েছে তার বেশ কিছু ব্যঙ্গরচনা এবং ট্র্যাভেলগ। বাংলাদেশে থাকাকালীন তিনি প্রচুর রাজনৈতিক কলাম লিখেছেন এবং একাধিক পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন, যেমন তিনি নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সময় পত্রিকাটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন এবং ইংরেজি সাপ্তাহিক সানডে এক্সপ্রেস-এর প্রদায়ক সম্পাদক ছিলেন। এক সময় তিনি বাংলাদেশ লেখক শিবিরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবেও কাজ করেছেন। নিউইয়র্ক-এর হার্টকোর্ট ব্রেইস থেকে প্রকাশিত সংকলন রিডিং অ্যাবাউট দ্য ওয়াল্ড (১৯৯৯)-এর দুই খণ্ড সম্পাদনা করেছেন পল ব্রায়ানস্-এর সঙ্গে। এছাড়া তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন একাধিক বই। আর বর্তমানে প্রেসে আছে তার বেশ কয়েকটি বাংলা বই : ১. সাম্রাজ্যবাদ ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি; ২. পঠনঃ শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের রাজনীতি; ৩. কেরামতনামা; এবং ৪. চিহ্ন ভাসে অবশেষে। তার সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন জাহেদ সরওয়ার।

জাহেদ সরওয়ার : আমরা আজ এই অবস্থায় কেন?

আজফার হোসেন : আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের যে মূলনীতিগুলো ঘোষিত হয়েছিল, যে নীতিগুলো আমি মনে করি বিপ্লবী নীতি, যেমন- সাম্য বা সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা- সেই সব নীতিকে যদি আমরা বাস্তবায়িত করতে চাই, সমাজের সব স্তরে যদি এই তিনটি নীতির প্রতিফলন চাই- শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে ও রাজনীতিতে যদি তাদের বাস্তবায়ন দেখতে চাই, তাহলে আমাদের যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, আমাদের যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাকে বদলানো ছাড়া গতি নাই। এই নীতিগুলো বাস্তবায়নের জন্যই মানুষ যুদ্ধ করেছিলেন। মানুষ বলতে আমি অধিকাংশ জনগণকে বুঝাচ্ছি। মানুষ এখানে কোনো ফাঁকা বুলি নয়।

জাহেদ সরওয়ার : মানুষ কারা তবে?

আজফার হোসেন : আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধ কিন্তু জনযুদ্ধ ছিল। এই জনযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশকে যাঁরা স্বাধীন করেছিলেন, যাঁরা লড়াইয়ের ময়দানে থেকে তাঁদের সবকিছু হারিয়েছেন, মানুষ তারাই। মানুষ হচ্ছেন কৃষক ও শ্রমিক। যাঁদের উপর নির্ভর করে দেশের অর্থনীতি। আমাদের যে মুক্তিযুদ্ধ তা ছিল কৃষকের মুক্তিযুদ্ধ, শ্রমিকের মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাঁরা আজ কোন জায়গায়?

জাহেদ সরওয়ার : তাদের কেন এই অবস্থা?

আজফার হোসেন : আজকে আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, উপনিবেশবাদের সঙ্গে যুক্ত যে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি গড়ে উঠেছে এসবের কারণে। আর এই সংস্কৃতিতে আপনাকে আর আমাকে ধরে নিয়ে যে কোন সময় মেরে ফেলা সহজ। তবে এখানে বিস্মিত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু এটা দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক।

জাহেদ সরওয়ার : না মেরে ফেলা প্রসঙ্গে আমি একটু বলতে চাই আজফার ভাই, সমগ্র পৃথিবীটাইতো এখন সাম্রাজ্যবাদ বা পুঁজিবাদের কলোনি। হতে পারে সেটা রাজনৈতিক, হতে পারে অর্থনৈতিক কলোনি। যেমন এখানে একাত্তরের পর থেকে চরমপন্থি নিধনের নামে এক ধরনের বিশেষ হত্যা জারি আছে।

আজফার হোসেন : কথা সত্য। তবে এখন এখানে এগুলো অনেকেই অস্বীকার করে বলে যে, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এগুলো পুরানো বর্গ। কিন্তু তাদের কাছে একটা প্রশ্ন- নতুন বর্গ তাহলে কি? নতুন সংজ্ঞা কি? তারা সেসব ব্যাপারে নিরব। খালি পুরানা বর্গগুলোই নাকি অচল। তারা আসলে এসব বলে বিরাজমান যে বাস্তবতা তাকে ধামাচাপা দিতে চায়। এবং বিদ্যমান অবস্থাকে তারা জারি রাখার জন্যই আসলে এসবকে পুরানা বর্গ বলে চেপে যায়।

জাহেদ সরওয়ার : এই যে চেপে যাওয়া, সাম্রাজ্যবাদ বা ক্রমপ্রসারমান পুঁজিবাদকে পুরানো বর্গ বলে অস্বীকার করা ও তার বিকিরিত গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বিষফোঁড়াকে নীরবে সমর্থন দিয়ে যাওয়া এটাও তো তাদের একটা প্রজেক্ট। সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পদ্ধতির ভিতর দিয়ে খুব সূক্ষ্মভাবে তারা এমন কারিকুলাম প্রতিষ্ঠা করে চলেছে যে, প্রতিরোধ প্রতিবাদ এইসবও আজ বেশ পুরানো বলে মনে হচ্ছে। মানে নীরবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতির দিকেই মনে হয় আমরা এগুচ্ছি।

আজফার হোসেন : হ্যাঁ, আজকে যদি পশ্চিমের দিকেও আমরা তাকাই প্রায় সেটাই দেখি। পশ্চিম আমাদের ওপর আজও তাদের বিভিন্ন কায়দায় নানা কিসিমের আধিপত্য জারি রেখেছে। এবং যেখানে তাদের আধিপত্য নাই সেখানেও তা বিস্তার করে যাচ্ছে। এগুলো আমরা জানি। এই বিষয়গুলো যদি নতুন তত্ত্ব দিয়েও বলতে হয়, তাহলেও তো এগুলোর ভেতর পুঁজিবাদ বা সাম্রাজ্যবাদের কথা আসবেই। আমাদের এখানে ‘পেরিফেরাল ফরমেশন’ থেকে একদল আছে যারা মনে করে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ সম্পর্কে কথা বলা মানে অনেক পুরানো কথাবার্তা বলা। এটা একটা বিরাট সমস্যা। মানে চিন্তা করার আগে চিন্তাকে থামিয়ে দেয়ার মতো।

জাহেদ সরওয়ার : তাহলে আমরা এটাকে এভাবে নিতে পারি না- যারা এসব বলে তারা আসলে জেনেই বলছে? তারা পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদেরই পক্ষের। তারা ঐ প্রজেক্টেরই অংশ। এখানে একটা ইমেজ দাঁড় করানো যায় কিনা চেষ্টা করে দেখি, যদি আপনি অনুমতি দেন। অকস্মাৎ যদি আপনি হলিউডের হরর মুভি দেখেন। আমি একবার দেখেছিলাম। হররকে যদি আমরা পুঁজিবাদ হিসেবে কল্পনা করি, যেখানে সে কিচেনে রান্না করা অবস্থায় বাড়ির গৃহিণীকে আক্রমণ করে। তার ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে রক্তপান করে সরে যায়। কিন্তু গৃহিণী যখন সুস্থ হয়ে ওঠে, বাচ্চারা মা মা করছে ঠিকই, কিন্তু গৃহিণী তো আর আগের মা নাই। বাচ্চারা জানেও না যে, কিছুক্ষণ পরেই তাদের ঘাড়ের রক্ত খাবে মায়ের ছদ্মবেশি এই হরররূপী পুঁজিবাদ। এই হরর-রূপসী এত মা ও শিশুদের রক্ত খেয়েছে যে তারা আজ কোনটা তাদের মা আর কোনটা তাদের খুনী সেটা পরখ করতে পারছে না? এবং তারা যে একসময় সুস্থভাবে চিন্তা করতো তাকেই তারা বলছে সেসব পুরানো। কারণ হরর-রক্ত ইতিমধ্যে তাদের ভেতর প্রবাহিত? তারা আজ বলেছে সাম্রাজ্যবাদ পুরানা বর্গ, আধিপত্যবাদ আজ পুরানা বর্গ। মার্কসবাদ আজ পুরানা বর্গ।

আজফার হোসেন : আপনি খুব চমৎকার একটা প্রসঙ্গ তুলে আনলেন জাহেদ। স্বয়ং কার্ল মার্কসও কিন্তু পুঁজিবাদকে ঘাড়ত্যাড়া ভূতের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এই যে তারা বলছে, মার্কসবাদ একটি পুরানা বর্গ। কিন্তু মার্কসবাদের যে একটা ঐতিহ্য আছে তা বৈশ্বিক। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরে পুরা লাতিন আমেরিকা জুড়ে তার যে রূপ তাকে অস্বীকার করি কি করে? মার্ক্সীয় তত্ত্ব ও রাজনীতির একটা ঐতিহ্য আছে, ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসটা আবার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেনি। সেটা প্রবাহমান। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। ইতালীয় মার্কসবাদী আন্তনিও গ্রামসির একটা কথা এখানে বলা যায় : যারা জোর করে নতুন হতে চায় তারাই বরং যান্ত্রিক। যে তাকে জোর করে নতুন হতে হবে, অরিজিনাল হতে হবে। কিন্তু জোর করে নতুন হওয়া যায় না।

জাহেদ সরওয়ার : হ্যাঁ, হয়তো চমস্কিরা এটাকেই বলেছিলেন সম্মতি উৎপাদন। এটাও এক ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়া বটে। জোর করে সম্মতি উৎপাদন করা আর সেটা বজায় রাখা। এবং সেখান থেকে আরো সম্মতি উৎপাদন করা। মতামতও এখান থেকে উৎপাদিত হতে পারে। যেমন সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ বা মার্কসবাদ পুরানা বর্গ- এসব বলাও এক ধরনের উৎপাদিত মতামত। যা ঐতিহাসিক বিকাশের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যায় না।

আজফার হোসেন : আরেকটা কথা এখানে বলা যায় যে, মতামতের উৎপাদনের সঙ্গে আধিপত্যবাদ সম্পর্কযুক্ত। আরো বলা দরকার যে, মার্কসবাদের আরো অনেক ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। ইউরোপে হচ্ছে, লাতিন আমেরিকায় হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বে হচ্ছে। নতুন নতুন সব কাজ। কিন্তু এগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশে তথাকথিত বামপন্থীদের কোনো রিলেশন নেই, কানেকশন নেই। আরেকটা কথা এখানে বলা হয় যে, মার্কস নিজেও পশ্চিমা ভাবধারার। কিন্তু আমরা ক’জন জানি মার্কস নিজেই আলজেরিয়াতে গিয়েছেন, সেখানে থেকেছেন। সেখানকার যে মুসলমান সমাজ তাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। ভারতীয় সমাজ ও অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বকে তিনি বিভিন্নভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন। এই মার্কসকে তো আমরা চিনতে শিখিনি। আমরা ঐ মার্কসকেও চিনতে শিখিনি যে মার্কস এনলাইটেনমেন্ট প্রজেক্টের যে রৈখিকতা, ‘রিজন’, তার যে আধিপত্য সেই আধিপত্যেরও বিরোধিতা করেছেন। আমরা সেই মার্কসকেও চিনতে শিখিনি যিনি প্রগতির রৈখিক ধারাকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন। এই রকম বহু বিষয়ের মার্কস আছে। সেই মার্কসকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র খণ্ডিত মার্কস, শুধুমাত্র স্টিরিয়োটিপিক্যাল মার্কস সম্পর্কে যে ধারণা তা নিয়ে কথা বলে বেশি দূর যাওয়া যায় না। তো, এরা মার্কসবাদের ঐতিহ্যকেই অস্বীকার করে। যারা বিপ্লববিরোধী তারা তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়। এমন কি বিপ্লব কথাটা এক সময় ভাত পায় নাই, সেটা হচ্ছে উত্তরাধুনিকতাবাদীদের আধিপত্যের সময়। বিশেষ করে নব্বইয়ের দিকে। বিপ্লব শব্দটি হারাম ছিল, মার্কসবাদ হারাম, কমিউনিজম হারাম ছিল।

জাহেদ সরওয়ার : কবিতার মধ্যে মার্কসবাদী প্রতিরোধী বা বিপ্লবী শব্দাদি ব্যবহৃত হলে তাকে কবিতা নয় বলে তকমা মারা হয়েছে। এসবকে অচল পুরাতন বলা হয়েছে।

আজফার হোসেন : হ্যাঁ, কবিতা তো অনেক কারণেই না হয়ে উঠতে পারে। আমি মনে করি, মার্কসবাদ সম্পর্কে বস্তাপচা ধারণাগুলোর পিছনে আছে ইতিহাসবিচ্ছিন্নতা, মার্কসের কাজ নিয়ে অজ্ঞতা, আবার কায়েমি স্বার্থও আছে। মার্কসবাদ প্রয়োগে যে যান্ত্রিকতা তারও তো একটা ইতিহাস আছে। এগুলোর পর্যালোচনা হতে পারে। আরেকটা কথা বলা যায়, মার্কসবাদের জন্য মানুষ না, মানুষের জন্য মার্কসবাদ। এ রকম একটা কথা বলেছিলেন ক্যারিবিয়ান কবি এমে সেজেয়ার। তিনি বলেছিলেন যে, আমাদের যে স্ট্রাগল আমাদের যেই সংগ্রাম তার জন্যই মার্কসবাদ কিন্তু মার্কসবাদের জন্য আমাদের সংগ্রাম না।

জাহেদ সরওয়ার : না একটা আবেগের জায়গা থেকে যদি মার্কসবাদকে নাও দেখি। ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ব্যাখ্যা বা বিচার করার জন্য মার্কসবাদের চেয়ে কার্যকরী টুলসতো আর নাই। যারা মার্কসবাদের বিরুদ্ধে সচেতন মতামত উৎপাদন করে চলেছে তারাও তো সমাজকে ব্যাখ্যা ও বিচার করার ক্ষেত্রে মার্কসের স্মরণ নেয়।

আজফার হোসেন : হ্যাঁ, আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২০০৮ সালে পুঁজিবাদের যে সঙ্কট আবারো দেখা দিল, তখন লিবারাল থিওরিস্টরা যুক্তরাষ্ট্রে ও তার বাইরে এটাকে বলল ফাইনানসিয়াল ক্রাইসিস। অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা। কিন্তু এই সঙ্কট তো পুঁজিবাদের অন্তর্গত বিষয়। পুঁজিবাদের ইতিহাস যেমন তার আগ্রাসি বিস্তারের ইতিহাস, তেমনি পুঁজিবাদের ইতিহাস হচ্ছে তার সঙ্কটেরও ইতিহাস। এবং এই সঙ্কট অতিক্রমনেরও ইতিহাস। এটা ওয়ালস্ট্রিটের লোকরাও, এমনকি ডানপন্থিরাও স্বীকার করেছেন। তবে খানিকটা ব্যাখ্যা করা পর্যন্ত তারা মার্কসে থাকে, কিন্তু সমাধান যখন বিপ্লব তখন তারা থামে।

জাহেদ সরওয়ার : আমার মনে হয় সমস্যাটাও এর কাছাকাছি, একদিকে মার্কসবাদ দিয়ে সমস্যাগুলোকে ব্যাখ্যা ও চিহ্নিত করা যাচ্ছে, আর মার্কসীয় সমাধানের কথা ভাবতে গেলে সেটা বিপ্লবের দিকে যাচ্ছে। ইয়াস্তান গাডারের ‘সোফির জগত’ নামের ফিলসফিকাল ফিকশনে মার্কসিয় দর্শনের পরিচয় পর্বের শিরোনাম ছিল এরকম ‘ইউরোপকে তাড়া করছে একটি দৈত্য’।

আজফার হোসেন : এই মেটাফরটা খুবই ইন্টারেস্টিং। দৈত্যের মেটাফরটা মার্কস নিজেই ব্যবহার করেছেন। হরর মুভির কথা যেটা বললেন, তা বলতে গেলে পুঁজিবাদ যে একটা বিশেষ ধরনের হরর মুভি সেটা কেমন হতে পারে মার্কস সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন। পাশ্চাত্যের বির্নিমাণবাদী দাশর্নিক, ডি-কনস্ট্রাকসনিস্ট বলা হয় যাকে, যদিও শব্দটা এক্সাক্টলি বির্নিমাণ না, জাক দেরিদার একটা বই আছে, যার নাম স্পেকটার্স অব মার্কস। এই বইয়ে তিনি বলছেন, পুঁজি হচ্ছে স্পেকট্রাল, ভূতুড়ে। মার্কস নিজেই এই ভূত দ্বারা অবসেস্ড ছিলেন। সত্য, মার্কসে ভূতের মেটাফর ঘুরে ফিরে আসে। জাক দেরিদার তাঁর বইয়ের এক পর্যায়ে বলছেন, আমাদের হাতের আঙ্গুল গুণে ভূতের হিসাব রাখা দরকার। মার্কস এই ভূতের মেটাফরটা বহুবার ব্যবহার করেছেন। এই গুণাগুণতির ভেতর দিয়ে দেরিদা দেখাচ্ছেন মার্কস একটা ভূতুরে পলিটিক্স ও পোয়োটিক্সের উদ্বোধন ঘটাচ্ছেন। কিন্তু এখানে মজার ব্যাপার আছে। দেরিদার সীমাবদ্ধতা এই জায়গায়, মার্কসকে ভূতুড়েপনার মধ্যে আটকে রেখে তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নেয়ার যে জায়গাটা সে জায়গাটাকেও ভূতুড়ে করে তুলেছেন। অর্থাৎ ভূতুড়েপনাকে তিনি একপেশে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বৈপ্লবিক পথটাকে তিনি বন্ধ করতে চাচ্ছেন। মার্কস এত মেটাফর ব্যবহার করতে পারেন, এর থেকে একটা ভূতুড়ে কাব্যতত্ত্ব বেরিয়ে আসতে পারে। দেরিদা নিজেকে ম্যাটেরিয়েলিস্ট দাবি করেন। কিন্তু তিনি ভূতুড়েপনায় আচ্ছন্ন থেকে যান। এটাকে আমি বলি ‘টেক্সুয়াল ফেটিশিজম’। আপনি তত্ত্ব তৈরি করবেন, করবেন না কেন? কিন্তু তা তো বাস্তবতা ও মানুষের চলমান সংগ্রামের ইতিহাস তার ভিতর দিয়েই করবেন, জীবনঘনিষ্টভাবে যার প্রায়োগিক দিকটাও দেখতে হবে। আমি এখানে একটা মাওবাদি অবস্থান নিচ্ছি। জাক দেরিদার ‘বিনির্মাণবাদী’ রাজনীতির একটা বড় সমস্যা হচ্ছে তার টেক্সুয়াল ফেটিসিশম, যা আবার বিভিন্ন ধরনের ফেটিশিজম-এর লজিক উৎপাদন করতে থাকে। আর এই টেক্সুয়াল ফেটিশিজম বাস্তবে বিরাজমান উৎপাদন-সম্পর্ক ও ক্ষমতা-সম্পর্ককে কেবল ধোঁয়াশা করেই রাখে না; তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধী পদক্ষেপকেও ‘ডিজএইবল্’ করে।

জাহেদ সরওয়ার : এই জন্যই মনে হয় চারিদিকে আমাদের এতো অজস্র অলস বুদ্ধিজীবী। যারা স্বপ্নে আর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে মনে করেন যে তাদের বিপ্লবী দায়িত্ব সমাপ্ত।

আজফার হোসেন : এরা স্বপ্নেও যে বিপ্লব করে তাও না। এরা নিৎসে পড়ে, দেরিদা পড়ে। এদেরকে যেন আগে ভাগেই দেখতে পেয়েছিলেন এমে সেজেয়ার তাঁর বই ডিসকোর্স অন কলোনিয়ালিজম-এ। সেখানে চমৎকার একটা লাইন আছে। যেটা আমি ব্যবহার না করে পারছি না। ‘এইসব খাটাস, নিৎসের উরু থেকে জন্ম নেয়া বাকস্বর্বস্ব বুদ্ধিজীবী।’ তাদের কাজ হচ্ছে শুধু বকবক করা। এদের কথা আবার আন্তনিও গ্রামসিও এমে সেজেয়ারের অনেক আগেই বলেছিলেন, নিৎসীয় বকবককারী। এবং নজরুল ইসলামেরও একটা সুন্দর কথা আছে : ‘পলিটিকাল তুবড়িবাজি।’
এতে হয় কি, নিজেকে তারা খুব সুখী ভাবে। তারা ভাবে তুবড়িবাজি করে একটা জায়গায় গেলাম। এটা পুঁজিবাদি লজিকের সঙ্গে যায়, তার আলোকে একে দেখা যেতে পারে।

জাহেদ সরওয়ার : পুঁজিবাদের যে স্ট্রাকচার সেটা পাশবিক। আমি এখানে পশুদের নিচু করতে চাচ্ছি না। বলছি পশুদের মতো গোয়ার। আপনি দেখবেন পুঁজিবাদের পাণ্ডাদের আচরণ বৃষের মতো। এই বৃষকে আমরা সক্রাতাস প্লাতনের সংলাপের ভেতর যেমন দেখি, ম্যাকিয়াভেলিতেও দেখি। তাদের ক্ষেপিয়ে তুলতে দেখি নিৎসেকে।

আজফার হোসেন : আরেকটা কথা এখানে বলা দরকার। পুঁজিবাদের যে চেহারা তারও তো রূপান্তরের ইতিহাস আছে : বাণিজ্য পুঁজি, শিল্প পুঁজি, ফাইন্যান্স পুঁজি, আজকের বহুজাতিক ‘টেলি-টেকনো-মিডিয়াটিক’ পুঁজি ইত্যাদি। আর আমরা বলে থাকি, পুঁজিবাদ এখন অনেক বেশি আগ্রাসি, অনেক বেশি ক্রুর। এছাড়াও আরো দুটি বৈশিষ্ট্য আছে- একটা হলো, পশুর যে মেটাফরটা আপনি এনেছেন, পশু তারপরও ভাল। এমন কি মানুষের যে বিকাশ, মানুষের যে সৃজনশীলতা, পুঁজিবাদ তার বিকাশ চায়, তবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ সেটার বিনিময় মূল্য থাকে। যে সৃজনশীলতা মুনাফাকে সম্ভব করে, যে সৃজনশীলতার বাজার মূল্য আছে, তাকে পুঁজিবাদ সৃজনশীলতা বলে, বাদবাকি অসৃজনশীল! আমি যে দুটো বৈশিষ্ট্যের কথা বলছিলাম, তাদের একটা হচ্ছে ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ আরেকটি হচ্ছে ‘ফিক্সিটি’। দুটোই আবার তার নিজস্ব ফর্মেটে।

জাহেদ সরওয়ার : ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ এই প্রবাদটি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ হয়ে আজ প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত। মাঝে মাঝে ভাবি কি সর্বনাশ! এ মানুষকে কোথায় ঠেলে দিচ্ছে? ঠেলে দিচ্ছে না বরং আজকে বলা যায়, অন্য সব জীবন মানুষ তার নিজের স্বার্থে কোরবানি দিয়েছে। যখন খুশি যেকোনো কিছুকে সে ভোগ করার অধিকারী মনে করছে নিজেকে। অথচ প্রতিটি প্রাণিরই তো বাঁচবার অধিকার আছে দুনিয়ায়। একমাত্র বুদ্ধকে দেখলাম বলতে ‘জীবহত্যা মহাপাপ’ বলতে।

আজফার হোসেন : না, এই প্রশ্ন মার্কসও তুলেছেন। আমরা যদি মার্কসের ইকনমিক অ্যান্ড ফিলসফিকাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট পড়ি তাতে দেখবো, মার্কস বলছেন মানুষ হওয়াটা এখনো পর্যন্ত একটা আনফিনিশড প্রজেক্ট। মানুষ যে আমরা হয়ে উঠিনি সে জন্যই তো বিপ্লব, সে জন্যই তো সংগ্রাম। মানুষ হয়ে উঠেছি এটা আগেভাগে ধরে নিলে তো আর কিছুতেই অভিযোগ থাকবে না। মানুষ হয়ে-ওঠাটা একটা অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রকল্প। এখনো আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পারছি না, কিন্তু হয়ে উঠতে হবে। এ প্রসঙ্গে মানবতাবাদের কথা আসে। মানবতাবাদের অনেক রকম ভার্সন আছে, প্রকার আছে। পশ্চিমা মুলুক মানবতার কথা বলে, তবে সেখানে বলতেই হবে রেনেসাঁসের কথা। ইংরেজি রেনেসাঁস, তার আগে ছিল ইতালিয় রেনেসাঁস। ইতালিয় রেনেসাঁসের প্রভাব ইংরেজি রেনেসাঁসের ওপর আছে। ইংরেজি রেনেসাঁসের গর্ভে আসলে ব্যক্তির জন্ম হয়েছে। আর সেই ব্যক্তি হচ্ছে মানুষ। আর সে মানুষ হচ্ছে শাদা মানুষ। আমরাও উপনিবেশায়িত হয়ে একটা কথা ব্যবহার করি যে, ‘ম্যান ইজ দ্যা মেঝর অব এভরিথিং’। মানুষ হচ্ছে সবকিছুর পরিমাপক। মানে, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই। এই মানুষ রেনেসাঁসের মানুষ। এই মানুষ শাদা মানুষ। এই শাদা মানুষ সমস্ত কিছু মাপবে শাদা মানুষের মানদণ্ডে যে মানুষ ব্যক্তিকে সামনে আনে, যে মানুষ উপনিবেশকে সামনে আনে। অর্থাৎ রেনেসাঁসের যে প্রকল্প তা বর্ণবাদী উপনিবেশবাদ কায়েমের পক্ষে গেছে। এই কথাটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। না হলে তলিয়ে যাবার একটা সম্ভাবনা থাকবে। রেনেসাঁসকে আমরা এখনো দারুণভাবে উদযাপন করি। এই প্রকল্প ধরে নিয়েছে যে, মানুষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যে মানুষ হতে পারিনি, তার জন্যই তো এই সংগ্রাম, এই বিপ্লবের স্বপ্ন। এই মানবতাবাদ সম্পর্কে আরেকটু বলা দরকার। পরবর্তী সময়ে ইউরোপে এর দীর্ঘ বিস্তার ঘটেছে এনলাইটেনমেন্ট হিসাবে। এই এনলাইটেনমেন্টের প্রডাক্ট হচ্ছে কার্ল মার্কস। তবে কার্ল মার্কসকে শুধুই এনলাইটেনমেন্টের প্রডাক্ট বলাটা যথেষ্ট না। এই প্রজেক্টের অনেক কিছুকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। ধরা যাক, এনলাইটেনমেন্ট প্রজেক্টের ‘রিজন’-এর ব্যাপারটা। এই হেগেলীয় রিজনকে মার্কস শুধুমাত্র যে যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করেছেন তা না। তাকে তিনি চ্যালেঞ্জও করেছেন। হেগেলের আগে কান্ট। তাঁকে আমরা বলি রিজনের দার্শনিক। তিনি ক্রিটিক অব পিওর রিজন লিখেছেন; লিখেছেন তিনি ক্রিটিক অব প্র্যাকটিকাল রিজন আর ক্রিটিক অব জাজমেন্ট; কান্ট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলতে পারে। এখানে কান্ট রিজনের পাওয়ারটা শনাক্ত করেছেন, রিজনের সীমাবদ্ধতাও শনাক্ত করেছেন। সেটা মার্কস নিজেও স্বীকার করেছেন। মার্কসকে আবার কান্টীয় মার্কসও বলেন কেউ কেউ। মার্কস যে এনলাইটেনমেন্ট প্রজেক্টের খপ্পরে পড়ে শুধু রিজনটাকে নিয়েছিলেন সেটা না। যাই হোক, ওই রিজনকে ব্যবহার করা হচ্ছে পুঁজিবাদের বিস্তারের স্বার্থেও, ওই রিজনকে ব্যবহার করা হচ্ছে উপনিবেশবাদ পোক্ত করার স্বার্থেও। আর মার্কস পুঁজিবাদবিরোধী ও উপনিবেশবাদবিরোধী অবস্থান থেকে এই রিজনকেও প্রশ্ন করেছেন। দেখিয়েছেন যে, এটা সত্যিকারের রিজন না। রিজনেরও যে বিকাশ সেটাও অসমাপ্ত- তার মানে মানুষের বিকাশও অসমাপ্ত। এই যে এনলাইটেনমেন্টের যে সীমাবদ্ধতা ও তার মানুষের ধারণাকে মার্কস প্রশ্ন করেছেন। আর পশ্চিমের যে মানবতাবাদ সেটার প্রভাব পড়েছে আমাদের এখানেও। আমি যদি ব্রিটিশ উপনিবেশী শাসনামলের অবিভক্ত ভারতের কথা বলি, তাহলে দেখি রাজা রামমোহন রায় থেকে এই মানবতাবাদের যাত্রা শুরু হয়। এই মানবতাবাদকে আমরা আসলে উদারনৈতিক মানবতাবাদ বলতে পারি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথও এই মানবতবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কিন্তু আবার নতুন মানবতাবাদ বা এমনকি বিপ্লবী মানবতাবাদের কথা বলা যেতে পারে। সেটা হচ্ছে মার্ক্সীয় মানবতাবাদ। ফিলসফিকাল ম্যানুস্ক্রিপ্টের যে মার্কস তিনি মানবতাবাদী মার্কস। ফরাসি মার্কসবাদী তাত্ত্বিক লুই আলথুজার বলছেন, আর্লি মার্ক্স হচ্ছেন মানবতাবাদী মার্কস। এই জায়গায় রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ আসতে পারে। যদিও সেটা আরেক আলোচনা। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলেছিলেন, ম্যানেজারের সাথে কুলির যে ঐক্য সেটা সত্য ঐক্য নয়। পশ্চিমা মানবতাবাদ বা উদারনৈতিক মানবতবাদ বা এনলাইটেনমেন্টের মানবতাবাদ বা তার আগের রেনেসাঁসের মানবতাবাদ- মানুষ মানুষ বলে ডাক দেয় ঠিকই- কিন্তু তুমিও মানুষ আমিও মানুষ বলে ডাক দিয়ে সমাজে যে অসম ক্ষমতা-সম্পর্কটা আছে, শ্রেণি সম্পর্কটা আছে, জেন্ডার সম্পর্কটা আছে, সেগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করে। মানুষের জয়গান গেয়ে মানুষের সমাজে অসম শ্রেণি সম্পর্কগুলো মুছে ফেলতে চায় তারা। এই মানবতাবাদ বৈপ্লবিক রাজনীতির পরিপন্থি। তাই মার্কস বলছেন যে সত্যিকার মানুষের ইতিহাস শুরুই হয়নি। মানুষ হয়ে উঠার যে প্রকল্প তা দুর্দান্তভাবে অসমাপ্ত। মানুষ তার পূর্ণ স্বাধীনতা পায়নি। এমনকি তিনি বলছেন মানুষের পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের যে মুক্তি সেটাও পায়নি মানুষ। এখানে নজরুলের কথাও আসতে পারে। তিনি বলছেন, ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে নহে কিছু বড় নহে কিছু মহিয়ান।’ তবে তিনি শুধু এখানে থেমে থাকছেন না, তিনি এও বলছেন যে, মানুষে মানুষে কোনো বৈষম্য চলবে না। এটা হচ্ছে বৈপ্লবিক মানবতাবাদ। এই ধারায় যে বিপ্লবী মানবতাবাদ তা চে গুয়েভারার মধ্যে ছিল। ফ্রানৎস্ ফানো’র মধ্যে ছিল। আফ্রিকার আমিলকার কাব্রালের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ নজরুল, চে গুয়েভারা, ফ্রানৎস্ ফানো আর আমিলকার কাব্রালের কথা আমি একসঙ্গে ও বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম এখানে।

জাহেদ সরওয়ার : তালাল আসাদের কথা বলবো না?

আজফার হোসেন : তালাল আসাদ তো অন্য জায়গায় অন্য প্রসঙ্গে এনেছেন। তালাল আসাদকে আমি এই ধারার কোনো বিপ্লবী তাত্ত্বিক মনে করি না। তালাল আসাদ আমাদের সময়ের বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তের কিছু দিককে অসাধারণ ক্ষমতার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তালাল আসাদের সাথে মার্কসবাদের সম্পর্ক তো টানাপোড়েনের সম্পর্ক।

জাহেদ সরওয়ার : আচ্ছা, আজফার ভাই, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে মানুষ তার নিজেকে উৎরে যেতে না পারার কারণ হচ্ছে তার প্রাণিজ স্ট্রাকচার। যেহেতু মানুষ এক ধরনের প্রাণি। তার অরিজিনেরই কোথাও কোনো সমস্যা আছে। হয়তো সেটা সমস্যা না। যেমন ধরেন, দুনিয়ার সমস্ত সমস্যার পিছনেই আছে ক্যাপিটালিজম। এই ক্যাপিটালিজম কিন্তু বিকাশের ধারাবাহিকতায় এসেছে। তাহলে এটা আসবে কোত্থেকে যদি মানুষের স্বভাবের মধ্যেই সেটা না থাকে। মুনাফা লুটবার ইচ্ছে বা অন্যকে বঞ্চিত করবার ইচ্ছে। পুঁজির বল্গাহীন বিকাশের কারণে সমস্যা ও বৈষম্য ছড়াতে থাকে। এইটা একটা নেটওয়ার্কের কারণে ইলেকট্রনিকাল ক্ষতিকর কোনো রশ্মির মতো। যার চাপ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত সবার উপর এসে পড়ে। যত তারা মুনাফা লুটবার আয়তন আর পণ্য বাড়াচ্ছে ততই সমস্যাও বাড়ছে। তো এই যে বৈষম্য, এই যে চাপ, এই যে অসন্তোষ তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে এগুলো কমার কোনো লক্ষণ নাই। তো আজকে যদি পারমাণবিক যুদ্ধে দুনিয়াটা নরকে যায় বা ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে এটা বলা যাবে না যে মানুষের বয়স পৃথিবীতে খুব কম ছিল। কাছাকাছি কিছু সমস্যা নিয়ে তারা কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে বাস করছে। তাহলে এই সমাজের জারিকৃত বৈষম্য এইটার সাথেও গণমানুষ পরিচিত কিন্তু তারা বুঝেও বুঝে না যে তারা সাফারার। তাদের মধ্যে বৈষম্য জারি রাখতে ক্ষমতাবানদের যে জারিজুরি তা এখনো তারা ভেদ করতে পারলো না, বা সে ইচ্ছেও তাদের আছে কিনা সন্দেহ কিন্তু সাফারিংসটা আছে তো। এই জারিকৃত প্রায় সব কাজই কিন্তু আম-পাবলিকের ভাল করার দোহাই দিয়ে। ধরেন রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যবাদের সকল প্রকল্পই কিন্তু বলা হচ্ছে মানবজাতির মঙ্গলের জন্য। কিন্তু আসলে তো তা না তারাতো করছে তাদের মুনাফার জন্য। ধরেন, আমাদের দেশে আজকে প্রায় সব খাবারে বিষমাখানো। বাজারে এমন কোনো খাবার পাবেন না যাতে মানুষের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য বা ভেজাল মেশানো না। তো যে মানুষটি চিনির সাথে সার মেশাচ্ছে। খারাপ চালের সাইজ পরিবর্তন করে অধিক দামে বিক্রি করছে। রঙ মেখে অতি সবুজ করে সবজি বিক্রি করছে। ফরমালিন দিয়ে মাছ, বিভিন্ন ধরনের ফল বিক্রি করছে। এইটা যে মানুষের ক্ষতি করছে তা আপাত চোখে না দেখা গেলেও দেশে যে পরিমাণ হাসপাতাল বেড়েছে। কিডনি ফাউন্ডেশনে গেলে, ডায়াবেটিক হাসপাতালে গেলে, হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে গেলে চোখে পড়বে যে কি পরিমাণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ। কিন্তু যে মেশাচ্ছে সেও মানুষ, তার কাছে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ না, মুনাফা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশে তো এটাকে খাদ্য বিষক্রিয়ায় নীরব গণহত্যা বলা যায়। তো এই যে মানুষগুলো দিনের পর দিন এগুলো জেনে-বুঝে-শুনে যেন কিছুই হয় নাই এমন ভান করে থাকছে। এইখানে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটিরও কথা আসবে। কিন্তু সেটাতো মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদেরই প্রতিষ্ঠান। সেটা সব সময় ভেজাল দিলেও, বিষ দিলেও, সাধারণ মানুষ মরলেও তার জিডিপি আগানো থাকলেই সে খুশী। ফলে এই যে সাধারণ মানুষগুলোর প্যাসিভনেস। নীরবে মার খাওয়ার প্রবণতা এইটা আমার মনে হয় তার জিনগত সমস্যা।

আজফার হোসেন : এর পিঠে একটা কথা হচ্ছে মানুষ আদৌ স্ট্রাকচার কিনা। মানুষ তো কেবল স্ট্রাকচার না। আন্তনিও গ্রামসি একটা কথা বলছেন। মানুষ হচ্ছে একটা প্রসেস, একটা প্রক্রিয়া। কিন্তু কিছু কিছু স্ট্রাকচার আছে যা মানুষকে প্রভাবিত করে। জিনের ব্যাপারটা তো আরেক আলোচনা। আমি জেনেটিক ডিটারমিনিজমের ব্যাপারটা বিশ্বাস করি না। আমি প্রসেস নিয়ে কথা বলবো। মানুষ একটা প্রসেস। সে হয়ে উঠছে। এগজিস্টিং যে সব স্ট্রাকচার আছে, সামাজিক কাঠামো, রাজনৈতিক কাঠামো ইত্যাদি, সে সব তো মানুষকে প্রভাবিত করে বটে, তবে মানুষও তাদের পাল্টা প্রভাবিত করে, তাদেরকে এমনকি বদলাতেও পারে। পুঁজিবাদ হচ্ছে একটা সর্বগ্রাসি কাঠামো। পুঁজিবাদের চেয়ে এত সর্বগ্রাসি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো আমরা আর দেখিনি। কিন্তু পুঁজিবাদ কি শুধু জোর করে টিকে? পুঁজিবাদ তো উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে বসে। তার বিভিন্ন ছলছাতুরি আছে। এই যে আপনি বললেন, সে ভাল করার নাম করে মুনাফা লুটে। আবার তার সঙ্গে থাকে তার সহযোগি অলঙ্কারশাস্ত্র। সঙ্গে থাকে তার পাইক-পেয়াদা-মাস্তান বাহিনি। পুঁজির পুনরুৎপাদনে আরো কিছু বিষয় থাকে। তার নিজের তৈরি করা আইডিয়োলজি আছে। মতাদর্শের ব্যাপার আছে। পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে মতাদর্শ হচ্ছে পুঁজিবাদী পুনরুৎপাদনের সাথে যায় এমন ধ্যান-ধারণা। আন্তনিও গ্রামসি এখানে মতাদর্শিক আধিপত্যের কথা এনেছেন। এটাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘হেজিমনি’ আর ইতালিয় ভাষায় বলা হচ্ছে ‘এগিমনিয়া’। হেজিমনি বা মতাদর্শিক আধিপত্যবাদ হচ্ছে, মানুষ স্ট্রাকচার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এমনভাবে যে, এই নিয়ন্ত্রণ আবার নিরঙ্কুশ না। মানুষ ইন্টারনালাইজ করে। মানুষ ভাবছে এটাই তো ভালো, আমার জন্য এটাই তো ভাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমি কালো শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছিলাম। কালো শ্রমিকদের ‘লারনা’ বলে একটা সংগঠন ছিল। আমি ওটার সাথে যুক্ত ছিলাম। তাদের পত্রিকা পিপল্স ট্রিবিউন-এ লিখতাম। কালো শ্রমিকদের সাথে কাজ করার সময় এক নির্যাতিত কালো শ্রমিক বলেছিলেন, একদিন আমিও মাল্টিমিলিওনিয়ার হবো। এই স্বপ্ন সে দেখছে। কিন্তু কখনোই সে মাল্টিমিলিওনির হবে না। সে ব্যবস্থা পুঁজিবাদ করে রেখেছে। সুতরাং এটা হচ্ছে সাংস্কৃতিকভাবে, মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করবার একটা অদ্ভুত রকম ব্যবস্থা। এই যে নিয়ন্ত্রণ এটা তো আছেই। এইভাবে পুঁজিবাদ নিজে রিপ্রডিউস করে। আবার এর অর্থ এই না ওই শ্রমিকের কোনো এজেন্সি নাই। এর অর্থ এই না যে, এই শ্রমিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারেন না। এর অর্থ এই না যে শ্রমিকরা আন্দোলন করতে পারেন না। এই যে কিছুদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমেছিলেন। এই জন্য তারা যে টোটাল ব্রেইনওয়াশড, সেটা বলা যাবে না। কথা হচ্ছে, যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠছে না, কথা হচ্ছে এটা ধারাবাহিক না। কেন না, সেটা নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে। তবে আমার মনে হয়, এই প্রতিরোধ শক্তিশালী হয়ে না উঠার কারণ হচ্ছে পুঁজিবাদবিরোধী প্র্যাকটিসের ক্ষেত্রে নতুন কোনো ট্যাকটিক, নতুন কোনো তত্ত্ব সংযোজন করতে পারছি না। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, পুঁজিবাদও এইসব আন্দোলনকে স্যাবোটাজ করে। এই সব চড়াই উৎরাই তো আছেই। বিপ্লব তো আর দিনে দিনে হয় না, রাতারাতি হয় না। এমনকি একটা পর্যায়ে এসেই সফল হয় না।

জাহেদ সরওয়ার : এর প্রমাণ তো সোভিয়েত ইউনিয়ন। যেখানে বিপ্লবের বয়স সত্তর বছর। তবে এইটা একটা ব্যাপার যে সত্তর বছর মানুষ সমাজতান্ত্রিক পরিবেশের মধ্যে থাকতে পেরেছে তার মানে এইটা একেবারে অসম্ভব না। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কে যা বলা হয় সোভিয়েত বা সমাজতান্ত্রিক অন্তঃকলহের কারণেই সমাজতন্ত্র টিকে নাই। এইটা আমি সম্পূর্ণ ঠিক মনে করি না। কারণ একটা সোভিয়েত ইউনিয়ন আর বাকি পৃথিবী মানে জবরজং পুঁজিবাদী পৃথিবী। যাদের কাঁচামালের সংগ্রহ বিস্তীর্ণ পৃথিবীর কলোনি থেকে। যেই পুঁজিবাদী পৃথিবীর একমাত্র শত্রু ছিল সোভিয়েত। এখন সোভিয়েত নিজের মানুষদের মুখে খাবার, তাদের জন্য বিদ্যুৎ বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে, না পুঁজিবাদ নামের বিশাল শত্রুটাকে মোকাবিলা করবে। মাইকেল সেয়ার্স ও অ্যালবার্ট কাহ্নের ‘গ্রেট কনস্পেরেসি অ্যাগেইনস্ট রাশিয়া’ বইটাও একটা উদাহরণ হতে পারে এক্ষেত্রে। যে কত রকম ষড়যন্ত্রের জাল পাতা ছিল পুঁজিবাদের পক্ষ থেকে।

আজফার হোসেন : আসলে কোনো বিপ্লবই চূড়ান্ত অর্থে সফল না। আবার কোনো বিপ্লবই চূড়ান্ত অর্থে ব্যর্থও না। অর্থাৎ আমাদের বিপ্লবের কাজটাই অসমাপ্ত। তবে বিপ্লবের যে ভুল সেটা থেকে শিক্ষা নেয়া যায়। আগামির বিপ্লবে যেন সেই ভুল আর না হয়। ‘রেভুলেশনারি ডায়ালেকটিকস্’ বলে একটা কথা আছে। একজন মার্কসবাদী কখনই বিরাজমান বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন না। আবার পুরাতন বাস্তবতাকে দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে ধরার চেষ্টা করেন না। এটা মার্কসবাদের বিরোধী। যে তাত্ত্বিক বা প্র্যাকটিশনার বা অ্যাকটিভিস্ট ডায়ালেকটিকালি এনগেইজড, সে কিন্তু কখনোই ইতিহাসের চাকা পেছনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন না। তিনি কখনোই বলবেন না, আমরা ঠিক সোভিয়েত কায়দায় বা চিনের কায়দায় সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করবো বাংলাদেশে। এটা তো একটা প্রতিক্রিয়াশীল ব্যাপার। অর্থাৎ আমার যে সময় তার সাথে সম্পর্কিত থেকে সময়ের যে চাহিদা, সমস্যা যা আছে সেটাকে চিহ্নিত করতে পারার ভেতর দিয়ে আমি বিপ্লবী রাজনীতিতে প্রবেশ করার পক্ষে। এটাই হচ্ছে রেভুলেশনারি ডায়কলেকটিকস্। এখানে এভাবে ব্যবহৃত হতে পারে মার্কসবাদ।

জাহেদ সরওয়ার : এইখানে আজফার ভাই আমি একটু দ্বিমত করতে চাই সেটা হচ্ছে, বিপ্লব বা পরিবর্তনের জন্য কি আগে থেকে মার্কসবাদের চর্চা বা থিউরির ভেতর দিয়ে আগানো জরুরি? যদি ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা বিপ্লবের কথা ধরি বা হুগো চাভেজের ভেনিজুয়েলার কথা বলি। কাস্ত্রো তো মার্কসবাদী হয়েছেন চে গুয়েভারার সংস্পর্শে এসে। ফিদেল বরং নিজেকে বলতেন তিনি বলিভারপন্থি। অর্থাৎ সিমন বলিভার ছিলেন ফিদেলের হিরো। আবার চাভেজের হিরো ছিলেন দুজন- বলিভার ও ফিদেল। তিনি নিজেকে ফিদেলিস্তা বলতেন। মার্কসিয় চিন্তাগুলো তো মার্কসবাদ ছাড়া করা যাবে না তেমন না।

আজফার হোসেন : আসলে কে মার্কসবাদী আর কে মার্কসবাদী না, এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর মিলে না। একক উত্তর মিলে না। এই জন্য যে মার্কসবাদের যে রাজনৈতিক ঐতিহ্য তা হচ্ছে ডায়ালেকটিকসকে প্রয়োগ বা চর্চা করার ঐতিহ্য। মার্কসবাদের ক্ষেত্রে এই ডায়ালেকটিকসটাকে যদি আমরা গুরুত্ব দিই, তাহলে আমরা তো মার্কসের যে তত্ত্ব সে তত্ত্বটা পড়ে, তার প্র্যাকটিসের ভিতর দিয়ে, সেই তত্ত্ব প্রয়োগ করে নিজেকে একজন মার্কসবাদী হিসাবে বিবেচনা করতে পারে। এখন মার্কসবাদের চেহারা কি সব জায়গায় এক রকম? পুঁজিবাদের চেহারাও কিন্তু সব জায়গায় এক রকম না? পুঁজিবাদেরও অসম বিকাশের তত্ত্ব আছে। পুঁজিবাদ তার আগ্রাসি বিস্তার নিয়ে উপস্থিত হলেও সে কিন্তু অসমভাবে বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশের যে পুঁজিবাদের চেহারা তার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদের যে চেহারা তার মধ্যে পার্থক্য আছে। সুতরাং মার্কসবাদের যে বিকাশ বা অসমতা সেটাও তো ক্ষেত্র বিশেষে আলাদা হতে বাধ্য। ফিদেলের মার্কসবাদ, হুগো চাভেজের মার্কসবাদ, বা ভাসানির মার্কসবাদ তো এক না। তা হলে কি ভাসানি মার্কসবাদী না? মার্কসবাদ তো আর রিলিজিয়াসলি প্রতিটি বর্ণ প্রতিটি শব্দকে বিশ্বাস করতে হবে ব্যাপারটা তেমন না। ডায়ালেকটিকস্কে যদি আমরা সামনে রাখি, তাহলে পরিবর্তিত সময় অর্থাৎ বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে তার সমস্যা সমাধান কল্পেই তার প্রয়োগ হবে। এবং একই সঙ্গে ইতিহাসও জানতে হবে। তবে ইতিহাস জানা মানে অতীতে আটকে থাকা না, বরং ইতিহাস থেকে রসদ সংগ্রহ করতে হবে। অতীতের যে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো এভাবে সামনে আনা যেতে পারে। ডায়ালেকটিকাল অ্যাপ্রোচ আমার মনে হয় খুবই কাজের। ডায়ালেকটিকস্ মানে দুইটা জিনিসের যে দ্বন্দ্ব তার চেয়েও বেশি। এই ডায়ালেকটিকাল অ্যাপ্রোচকে যদি সামনে রাখি আমি তাহলে বলবো যে ফিদেল কাস্ত্রো তার মতো করে বুঝেছেন মার্কসবাদ। চাভেজও তার মতো করে মার্কসবাদী। ফিদেল যে মার্কসবাদের সহযোগিতা নেননি তা নয়। চে গুয়েভারা তাকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়েছেন। যেমন কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো ফিদেলকে পড়িয়েছেন চে গুয়েভারা। মার্কসের ক্যাপিটাল-এর বেশ কিছুটা কিন্তু চে গুয়েভারা পড়েছিলেন। এবং সেটা নিয়ে তার কমেন্টসও আছে। মার্কসের ওপর চে গুয়েভারার একটা বইও আছে। চে গুয়েভারার কারণেই ফিদেল মার্কসবাদের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। এবং মার্কসবাদের যেটা তার প্রয়োগযোগ্য মনে হয়েছে সেটা তিনি প্রয়োগ করেছেন।

জাহেদ সরওয়ার : হুগো চাভেজও মনে হয় মার্কসের ক্যাপিটাল পড়া শুরু করেছিলেন। জানি না সেটা শেষ করতে পেরেছিলেন কিনা। তিনি একবার ক্যাপিটাল বইটা নিয়ে জাতিসংঘের অধিবেশনে কথা বলেছিলেন। বইটা দেখিয়ে দেখিয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন। ঠিক কি বলেছিলেন আমার মনে নাই। আরেকবার তো নিয়ে গেলেন চমস্কির হেজিমনি অর সারভাইবাল বইটা।

আজফার হোসেন : না, এরা কেউই যান্ত্রিকভাবে মার্কসবাদী না। তবে এও বলবো, এঁরা সবাই কোনো না কোনোভাবে আবার মার্কসের কাছে ঋণী।

জাহেদ সরওয়ার : আমার মাঝে মাঝে মনে হয় সাব-কন্টিনেন্টের মার্কসবাদীরা মার্কসবাদকে যান্ত্রিকভাবে গ্রহণ করেছেন। তাই তারা তার ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে পারেন নাই বা পারছেন না। আপনি সাব-কন্টিনেন্টের মার্কসিস্টদের সাথে কথা বললে দেখবেন তারা প্রচুর তত্ত্ব আওড়ায়। মুখস্থ তত্ত্ব যার কোনো প্রায়োগিক সীমারেখা নাই। ডেস্টেনি নাই।

আজফার হোসেন : হ্যাঁ, এক্বেবারে। যান্ত্রিকভাবে মার্কসবাদকে উপলব্ধি করতে গিয়ে তারা যতটা না বাস্তবতার খাতিরে মার্কসবাদী তার চেয়ে বেশি হচ্ছে মার্কসবাদের কিছু নির্দিষ্ট, মুখস্থ করা ধারণার স্বার্থে মার্কসবাদী।

জাহেদ সরওয়ার : কিন্তু বস্তুত ব্যাপারটা এরকম হওয়া উচিত মনে হয় আমরা মার্কসবাদের জন্য না, মার্কসবাদ আমাদের জন্য।

আজফার হোসেন : হ্যাঁ, কথাটা আমি আগে বলেছিলাম। আবারও বলছি। আমি আপনার সাথে এ বিষয়ে একমত।

www.banglatribune.com (in Bengali). Bangla Tribune. Retrieved 22 July 2016.

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.