সৃষ্টিশীলতা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাপ-দাদার সম্পত্তি নয়। উপরের নেতি-উস্কে-দেয়া কথাটা লাতিন আমেরিকার লড়াকু লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো তাঁর   মি...

সৃষ্টিশীলতা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাপ-দাদার সম্পত্তি নয় -- আজফার হোসেন

11:24 PM Editor 0 Comments

সৃষ্টিশীলতা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাপ-দাদার সম্পত্তি নয়।

উপরের নেতি-উস্কে-দেয়া কথাটা লাতিন আমেরিকার লড়াকু লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো তাঁর  মিরারস্  নামের বইয়ে বিভিন্নভাবেই বুঝিয়ে দেন। বইটা নিয়ে অবশ্য এর আগে ফেইসবুকে কিছু কথা বলেছিলাম। তবে খানিকটা ভিন্ন প্রসঙ্গে এবং পরিসরে আবারও বইটা নিয়ে কথা বলার তাগিদ বোধ করছি। কেননা আমার চারপাশে দেখছি সৃষ্টিশীলতা নিয়ে ফালাফালি-করা 'আমি-কি-হনু-রে'-দের দল, যারা সৃষ্টিশীলতাকে প্রচলিত অর্থের স্বৈরশাসনের বাইরে নিয়ে যেতে একেবারেই নারাজ।

সমস্ত প্রচলিত অর্থ যে আবার অন্তর্নিহিতভাবে ভাল বা খারাপ তা অবশ্য বলেন না গালিয়ানো। কিন্তু কোন্ প্রচলিত অর্থ কিভাবে মানুষের অনুশীলনকে খাটো করে এবং তার ভেতর দিয়েই সমাজে বিভিন্ন ধরনের 'হায়ারার্কি' উৎপাদন করে, সেদিকেই বরঞ্চ গালিয়ানো নজর দেন তাঁর মিরারস্ নামের বইটাতে।

এবং প্রায় সরাসরি সামনে আনেন এই ধারণাটাকেওঃ বস্তাপচা সমাজ সব বস্তাপচা 'হায়ারার্কি'-ই জিইয়ে রাখে এবং এমনকি তাদের বৈধতা দেয় এমনভাবে যে, মনে হয় যেন তারা নির্ভেজাল, এমনকি চিরন্তন সত্য।

ফিরি সৃষ্টিশীলতা প্রসঙ্গে। সৃষ্টিশীল কারা আসলে?

প্রচলিত অর্থে কবি-আঁকিয়ে-সঙ্গীতকার-স্থপতি এবং এই জাতীয় বিশেষ করিৎকর্মাদের সৃষ্টিশীল হিসাবে বিবেচনা করার রেওয়াজ তো আছেই। তাঁরা অবশ্যই সৃষ্টিশীল হতে পারেন। খানিকটা ক্লিশের মতো শোনালেও এও সত্য যে, সবাই কবি নন, কেউ কেউ কবি। তবে, গালিয়ানোর মতে, মানুষের ইতিহাস এও প্রমাণ করেছে যে, কেবল কবিরাই সৃষ্টিশীল নন, কেবল আঁকিয়েরাই সৃষ্টিশীল নন, বা কেবল সঙ্গীতকাররাই সৃষ্টিশীল নন। তাঁরা সৃষ্টিশীল তো বটেই এবং মানুষের ইতিহাসে তাঁদের বিভিন্ন মহৎ অবদানকে অস্বীকার করার অর্থ মানুষকেই অস্বীকার করা। কিন্তু গালিয়ানো এও বোঝান যে, তাঁদের কর্মকাণ্ডের বাইরেও সৃষ্টিশীলতা থাকে। তার সাক্ষী ইতিহাস নিজেই।

অর্থাৎ মানুষের অনুশীলনের ইতিহাসই স্পষ্ট করে বলে দেয় যে, সৃষ্টিশীল হতে পারেন একজন গাণিতিক যেমন, একজন কৃষকও তেমনি; সৃষ্টিশীল হতে পারেন একজন দার্শনিক যেমনি, একজন মেকানিকও তেমনি; সৃষ্টিশীল হতে পারেন একজন শিক্ষক যেমনি, একজন সাংবাদিক বা একজন প্রুফরিডারও তেমনি। যেমন সৃষ্টিশীল হতে পারেন একজন মা, বা যিনি, ধরা যাক, একটা ভীষণ গরিব সংসারের হাল ধরেন। বা একজন মাঝি যিনি নদীর বুকে ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করেন। সৃষ্টিশীল হতে পারেন একজন রাজনীতিবিদও, যেমন সৃষ্টিশীল হতে পারেন একজন খেলোয়াড়, একজন অভিনেতা, একজন অর্থনীতিবিদ, একজন ব্যবস্থাপক, একজন সৈনিক।

সৃষ্টিশীল হতে পারেন 'এমনকি' একজন কেরানিও, যাঁকে অবশ্য বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কেউ কেউ এলিট কায়দায় সরাসরি—কিংবা উপমা বা রূপক হিসাবে ব্যবহার করে—গালি দিতে বেশ মজা পায়।

বন্ধনীতে এখানে সৃষ্টিশীলতা প্রসঙ্গেই একটা প্রচলিত 'বাইনারি' বা বিভাজনের কথা উল্লেখ করতে হয়। যেমন অনেকেই মানুষের লেখালেখি নামের কাজকে 'সৃষ্টিশীল' আর 'মননশীল' হিসাবে চিহ্নিত করে থাকেন এবং তাদের মাঝখানে সীমান্ত তৈরি করার পর সেখানে এমনকি টহল দিতে থাকে। কিন্তু একজন 'মননশীল' লেখক কি 'সৃষ্টিশীল' হতে পারেন না? বা একজন 'সৃষ্টিশীল' লেখক কি হতে পারেন না মননশীল? পারেন। তার প্রমাণ গালিয়ানোর মিরারস্  নামের বইটা নিজেই।

তবে গালিয়ানো এও বোঝান যে, সবাই সবসময় যে সৃষ্টিশীল হন তাও কিন্তু নয়। তবে মানুষের যাপিত জীবনের অনুশীলনের সমগ্রেই সৃষ্টিশীলতা বিভিন্ন কায়দায় প্রাসঙ্গিক থাকে বা কাজ করে। 

সেদিন একটা আড্ডায় আমার দুজন পরিচিত লোকের কথা-বিনিময় লক্ষ্য করলাম। তারা বন্ধুও। একজন কবি, অপরজন একটা মিউজিক জার্নালের সম্পাদক ও লেখক। তো, কবি ওই সম্পাদককে লক্ষ্য করে বলে উঠলেনঃ "জীবনে কি কখনো তুই একটা ক্রিয়েটিভ লাইন লেইখ্যা দেখাইতে পারছস?" উত্তরে সম্পাদকও একটা আস্ত প্রশ্নই ছুঁড়ে দিলেনঃ "জীবনে কি কখনো তুই সঙ্গীত আর গণিতের সম্পর্ক নিয়া একটা মাথা-ঘুরানো লাইন লেইখ্যা দেখাইতে পারছস?"

আসলে 'আমি-কি-হনু-রে'-দের দল সৃষ্টিশীলতা নিয়ে বড়াই করে' ওই সৃষ্টিশীলতার নামেই যান্ত্রিকভাবেই সৃষ্টিশীলতা-বিরোধী 'হায়ারার্কি' উৎপাদন করতে থাকে একের পর এক, এই বুঝিয়ে যে, তারা ছাড়া যেন অন্য কেউ অন্য পরিসরে সৃষ্টিশীল হতে পারেন না। এটাও একধরণের ফ্যাসিস্ট মানসিকতা।


0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

বিশ্বায়ন, মালটিকালচার, মুক্তবাণিজ্য গ্লোবালাইজেশন ও এক মেক্সিকান কার্টুনিস্ট আজফার হোসেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক নামের পত্রিকাটা উপহার দ...

গ্লোবালাইজেশন ও এক মেক্সিকান কার্টুনিস্ট - আজফার হোসেন

11:43 AM Editor 0 Comments

বিশ্বায়ন, মালটিকালচার, মুক্তবাণিজ্য
গ্লোবালাইজেশন ও এক মেক্সিকান কার্টুনিস্ট
আজফার হোসেন

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক নামের পত্রিকাটা উপহার দিচ্ছে ছবির পর ছবি।ছবির সঙ্গে থাকছে কথাও।

এমনি কতোগুলো কথাঃ এক পাঞ্জাবি-পরা মার্কিন ট্যুরিস্ট নয়াদিল্লির এক পানশালায় সময় কাটাচ্ছেন; ক্ষুধার্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে তিনি পাচ্ছেন লেবাননের খাবার। খাবার যখন খাচ্ছেন, একই সঙ্গে শুনছেন ফিলিপাইনি ব্যান্ডের সঙ্গীত। যখন আবার সঙ্গীত শুনছেন, একই সঙ্গে দেখছেন কীভাবে ওই পানশালায় আইরিশ পানীয়ের বোতলগুলো থরেথরে সাজানো আছে। যখন তিনি এই আইরিশ পানীয়তে ঠোঁট ভেজাচ্ছেন, তার চোখ গিয়ে পড়ছে জিন্স-পরা এক ভারতীয় তরুণীর ওপর।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ওই মুহূর্তটাকে বিশ্বায়নের 'মালটিকালচারাল' মুহূর্ত হিসাবে বিবেচনা করে ইতোমধ্যে তাকে চিত্রকল্পময় উৎসবে রূপান্তরিত করেছে।

কিন্তু ওই কার্টুনিস্ট (যার নাম পরে বলব) বলছেন, "ছবি শুধু দেখায় না, তা লুকিয়ে ফেলার কাজটাও সারে"। তাহলে কী লুকায় সে?

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর আঁকা ওই 'মালটিকালচারাল' মুহূর্তটা উৎপাদন করতে গিয়ে অজস্র মানুষের যে ঘাম ও রক্ত ঝরেছে, তাদের চিহ্নই লুকিয়ে রাখে তাদের ছবিগুলো। কিন্তু ওই কার্টুনিস্ট যা বোঝাতে চাইছেন, তাকে আমি এভাবে বলে নিতে পারিঃ

রক্তের দাগ আসলেই মোছা যায় না; দাগ মোছারও দাগ থেকে যায়।

ফিরি আবারো গ্লোবালাইজেশনে। পশ্চিমা সাহিত্যের একজন অধ্যাপক টেক্সটের চাটনি বানাচ্ছেন। কালো নারীবাদী ঔপন্যাসিক টনি মরিসনের কাছ থেকে তিনি ঝাল নিচ্ছেন, ফল নিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে, মাছ নিচ্ছেন গুয়াতেমালার লেখক ও অ্যাকটিভিষ্ট রিগোবের্তা মেঞ্চুর কাছ থেকে, আর ট্রটস্কির কাছ থেকে নিচ্ছেন ভিনেগার। অধ্যাপক সাহেব এগুলো মিলিয়ে-মিশিয়ে গুলিয়ে খাওয়াবেন তার ছাত্রছাত্রীদেরই, যারা আবার পড়াশুনাকে শুধু “ফান” হিসাবেই নিতে চায়।

আহ, গ্লোবালিজেশন! আপনার অশেষ মর্জি!

এই গ্লোবালিজেশন নিয়ে ওই কার্টুনিস্ট নিজেই একটি রচনা লিখেছেন। সেখানে একটি জায়গায় তিনি বলছেন, "মুক্তবাণিজ্যের বিশ্বায়ন এখন অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটাচ্ছে। চীন এখনো সমাজতন্ত্রের তকমা এঁটে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে জোগান দিচ্ছে ক্রীতদাসীয় শ্রম; ভারতের একটি ফার্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কর্পোরেশনের ফর্ম পূরণ করে দিচ্ছে, যে কর্পোরেশন আবার পেরুতে ভদকা বানিয়ে তা বিক্রি করছে পোল্যান্ড থেকে আসা ওইসব মানুষের কাছে, যারা ইংল্যান্ডের টাকায় মাদ্রিদে অট্টালিকা তোলার কাজে হাতে নিয়েছে"।

এতক্ষণ আমি যে কার্টুনিস্টের কথা বলছিলাম, তাঁর নাম এল ফিসগোঁ।
মেক্সিকান। কিন্তু তার আসল নাম রাফায়েল বারাইয়াস দুরান। তিনি তাঁর কাজে ব্যঙ্গ আর প্রতিবাদকে একসঙ্গে চালু রাখেন; প্রথা ও প্রতিষ্ঠানকে তিনি তার কাজে বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ করেন, চ্যালেঞ্জ করেন।


জাতীয় শাসক শ্রেণীর সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যবাদী যোগসাজশকে তিনি রেখায় রেখায় বা আঁকিবুঁকিতেই উন্মোচন করেন অবলীলায়। জাতীয় শাসক শ্রেণীর ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভাড়া-খাটা বুদ্ধিজীবীদের অন্তঃসারশূন্যতাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে’ তাদের তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করেছেন তিনি তার একাধিক কার্টুনে।

নান্দনিকতার ঘোরে মজে-থাকা লেখক ও শিল্পীদের ঔপনিবেশিক মনোগঠন ও জনবিচ্ছিন্নতাকে আঘাতের পর আঘাত হেনেছেন এল ফিসগোঁ তার কাজে।

তিনি মনে করেন, সৌন্দর্যের দোহাই পেড়ে তাদের নান্দনিকতা আবার সৌন্দর্যহীনতার সমস্ত কারণকে প্রছন্ন রাখে; এ "নান্দনিকতা" এভাবে আসলেই সৌন্দর্যবিরোধী। কেননা এই নান্দনিকতা সৌন্দর্যের সাক্ষাৎ শত্রু হিসাবে পুঁজিকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।

তাই তাদের সুন্দর চিত্রকল্প বা ছবি অতটা সুন্দর নয়, যতটা দেখায়।

এল ফিসগোঁ এও মনে করেন, যিনি শিল্পী, তিনি প্রেমিক; আর যিনি প্রেমিক, তিনি বিদ্রোহীও।


0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

রঙ-মেখে সঙ-সাজা সাদা সংস্কৃতি-তাত্ত্বিকদের একটা দল—এদের মধ্যে আবার উত্তরঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকদের কেউ কেউ আছেন—গ্রামসি কপচাতে যে বেশ ভালবাসেন, ...

বিপ্লবী গ্রামসি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত নোট -- আজফার হোসেন

10:56 AM Editor 0 Comments

রঙ-মেখে সঙ-সাজা সাদা সংস্কৃতি-তাত্ত্বিকদের একটা দল—এদের মধ্যে আবার উত্তরঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকদের কেউ কেউ আছেন—গ্রামসি কপচাতে যে বেশ ভালবাসেন, তার সাক্ষী নিদেন পক্ষে দুই দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাস।

কথায় কথায় এরা গ্রামসির বরাতে 'হেজিমনি' 'হেজিমনি' বলে মুখে ফেনা তুলতে থাকেন। এদের ভাবটা এমন যে, গ্রামসির দৌড় যেন তার 'হেজিমনি' তত্ত্ব পর্যন্ত!

আর তাছাড়া এরা গ্রামসির 'মার্কসবাদী' পরিচয়টাকে সুকৌশলে এড়িয়ে যান। গ্রামসি যে লেনিনবাদীও ছিলেন, তা তো আরও বেশি এড়িয়ে যান। গ্রামসি যে দুর্ধর্ষ কম্যুনিস্ট ছিলেন, ইতালির কম্যুনিস্ট পার্টির একজন প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, শীর্ষস্থানীয় বিপ্লবী নেতা ছিলেন এবং এমনকি ওই কম্যুনিস্ট পার্টিরই জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন, এইসব ঐতিহাসিক সত্য বেমালুম চেপে যান ওই সংস্কৃতি-ফুটানো, ফুটানি-মারা, গ্রামসি-কপচানো তাত্ত্বিকরা।

অবশ্য গ্রামসির বিমার্কসীয়করণের রেওয়াজ এর মধ্যে 'উত্তরকাঠামোবাদ'-প্রভাবিত 'উত্তরমার্কসবাদী' তত্ত্বের কিছু এলাকা জুড়েও লক্ষ্য করা গেছে। এই বিমার্কসীয়করণের সঙ্গে গ্রামসিকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টা সরাসরি যুক্ত। সেখানেই শেষ নয়। গ্রামসিকে এমনকি 'উত্তরাধুনিকতাবাদী' এবং 'উত্তরঔপনিবেশিক' তাত্ত্বিক হিসাবে হাজির করার উৎসাহে আর উল্লাসে গ্রামসির বিপ্লবী কম্যুনিস্ট রাজনীতিকেও ধোয়াশা করা হয়েছে বারবার।

তবে হাল আমলে পশ্চিমা মুলুকেই গ্রামসির এই বিমার্কসীয়করণের এবং এমনকি বিরাজনীতিকীকরণের দৃষ্টান্তমূলক এবং মোক্ষম জবাব দিয়ে চলেছেন একদল তরুণ মার্কসবাদী তাত্ত্বিক-অ্যাক্টিভিস্ট। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন পিটার টমাস (না বলে পারছি না যে, তিনি আমার কমরেডও)। তার সাম্প্রতিক সাড়া-জাগানো বইয়ের নাম দ্য গ্রামসিয়ান মোমেন্ট। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার পাশাপাশি তিনি তার বইটিতে বৈপ্লবিক মার্কসবাদী ঐতিহ্যেই গ্রামসিকে নতুনভাবে উপস্থিত করেছেন এবং গ্রামসিকে নিয়ে পশ্চিমা মুলুকের সংস্কৃতি-তাত্ত্বিকদের—এবং উত্তরআধুকিকতাবাদী-উত্তরঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকদের—প্রতিক্রিয়াশীল এবং সংস্কৃতিবাদী ধুনফুনেরও জবাব দিয়েছে্ন। এই বইটা নিয়ে অবশ্য এর আগে আমি ফেসবুকে নোট দিয়েছি একাধিকবারই।

তো, ফিরে আসি গ্রামসির 'হেজিমনি' তত্ত্ব প্রসঙ্গে। আগেই ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, গ্রামসি মানেই কেবল এই তত্ত্ব নয়, যদিও গ্রামসির কাজে এই তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়েই থাকে। কিন্তু ওইসব তাত্ত্বিক এই 'হেজিমনি' তত্ত্বকে কেবল যে বারবার ব্যবহার করতে থাকেন তাই নয়; বরঞ্চ এই তত্ত্বটাকে তারা কেবল উপরিকাঠামোগত এবং সংস্কৃতিবাদী অর্থে যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করতে থাকেন এমনভাবে যেন মনে হয়, রাজনৈতিক অর্থনীতির সাথে 'হেজিমনি'র কোনো যোগাযোগ নাই, যেন সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনৈতিক অর্থনীতির কোনো যোগাযোগ নাই, যেন সংস্কৃতি একেবারে উৎপাদন-সম্পর্কের দিগন্তের বাইরেই অবস্থান করে!

সত্য, গ্রামসি মোটেই অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদী ছিলেন না; বরঞ্চ মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতি আর অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদকে সমার্থক ভেবে যারা এই দুইটি বিষয়কে এক করে গুলিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত, তাদের বিরুদ্ধেই গ্রামসি জোরেশোরে অবস্থান নিয়েছিলেন।

কিন্তু আবার তিনি যে সংস্কৃতিবাদিতার (বা সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণবাদের) খপ্পরে পড়েছিলেন, তাও নয়। বরঞ্চ তিনি সংস্কৃতিবাদিতার বিরুদ্ধেও জোরেশোরে অবস্থান নিয়েছিলেন।

এমনকি তিনি 'হেজিমনি'কে কেবল গণসম্মতি আদায়ের মাধ্যমে মতাদর্শিক আধিপত্য বা নেতৃত্ব হিসাবে বিবেচনা করেই থেমে থাকেন নাই; বরঞ্চ তাঁর প্রিজন নোটবুকস-এ এও বলেছিলেন, "যদিও 'হেজিমনি' নৈতিক-রাজনৈতিক, তাকে অবশ্যই অর্থনৈতিকও হতে হবে; তার ভিত্তিভূমি হবে সেই চূড়ান্ত ভূমিকা যা নেতৃস্থানীয় গ্রুপ পালন করে থাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত কেন্দ্রেই" (_সিলেকশানস ফ্রম প্রিজন নোটবুকস_ ১৬১)।

অর্থনীতির—বলা ভালো, রাজনৈতিক অর্থনীতির—এই গ্রামসিকেও চিনে রাখা দরকার। 


0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

গত বছর 'ইউরোপকেন্দ্রিকতা' নিয়ে আমার একটা আলোচনার শেষে একই সঙ্গে পি এইচ ডি'র একজন বাংলাদেশী ছাত্র, একজন ভারতীয় 'বহুত্ববাদী...

ইউরোপকেন্দ্রিকতা নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত নোট - আজফার হোসেন

9:51 AM Editor 0 Comments

গত বছর 'ইউরোপকেন্দ্রিকতা' নিয়ে আমার একটা আলোচনার শেষে একই সঙ্গে পি এইচ ডি'র একজন বাংলাদেশী ছাত্র, একজন ভারতীয় 'বহুত্ববাদী' অধ্যাপক আর দারুণ-ভাবে-ভ্রূ-স্বর্গমুখী-করা এক ইংরেজ গবেষক ধারণা করে বসেছিলেন যে, আমি পশ্চিম-বিদ্বেষী!

তখন স্পষ্ট করেই বলতে হয়েছে--এবং আবারও বলি--যে, ইউরোপকেন্দ্রিকতার সমালোচনা বা বিরোধিতা আর পশ্চিম-বিদ্বেষ এক জিনিস নয়। ইউরোপকেন্দ্রিকতার বিরোধিতা মানেই ইউরোপবিরোধিতা নয়।

এও স্পষ্ট করে বলা দরকার, জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে, চিন্তার জগতে, সাহিত্য-সঙ্গীত-শিল্পকলার জগতে ইউরোপের বিস্তর ও বিস্ময়কর অবদানকে অস্বীকার বা বর্জন করার অর্থ হচ্ছে মানুষের ঐতিহাসিক ও সৃজনশীল অভিযাত্রা আর অর্জনকেই অস্বীকার বা বর্জন করা। 'আমি-কি-হনুরে!'-মার্কা গৌরববোধ আর আত্মকেলি থেকে 'অপর'কে অস্বীকার আর অবহেলা করার জাতীয়তাবাদী অনুশীলনও ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কথা থেকে যায়।

তাহলে কয়েকটা বিষয়কে সংক্ষেপে ও 'ক্যাটাগরিকালি' সামনে আনা যাক।

প্রথমত, বিস্ময়কর অবদানের নামে যখন এই ইউরোপ তার শ্রেষ্ঠত্বকে প্রশ্নহীনভাবে উদযাপন করতে থাকে, তখনই প্রশ্ন থাকে, থাকে প্রতিরোধও।
দ্বিতীয়ত, এই ইউরোপের অবদানের পেছনে 'পূব'-এর অবদানের যে লম্বা ইতিহাস আছে, তাকে যখন অস্বীকার করা হয় বা এমনকি সেই ইতিহাসকে যখন মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয় বা নিদেনপক্ষে এই ইতিহাস নিয়ে যখন কেবল লাগাতার নৈশব্দ বিরাজ করে, তখনই প্রশ্ন থাকে, আপত্তি থাকে, থাকে প্রতিরোধও।

তৃতীয়ত, ইউরোপের এই অবদানের নামে যখন আধিপত্যবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিভিন্ন ধরনের দমনমূলক, শাসনমূলক ও শোষণমূলক 'হায়ারার্কি' তৈরি করতে থাকে একের পর এক, তখনই প্রশ্ন থাকে, থাকে প্রতিরোধও।

আর ঐতিহাসিকভাবেই তো এই ইউরোপকেন্দ্রিকতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকেছে উপনিবেশবাদ ও বর্ণবাদ। আর এইসবের বিরোধিতাকে ভুয়া পশ্চিম-বিদ্বেষের দোহাই পেড়ে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার ধুনফুন আসলেই ওই ইউরোপকেন্দ্রিকতারই অংশ হয়ে থাকে। থেকেছেও।

তবে আরেকটু বলিঃ পশ্চিম বা ইউরোপ থেকে যা-ই আসে, তা-ই খারাপ বা বর্জনীয় তা তো নয়। আর 'পূর্ব' থেকে যা-ই পাই, তা-ই ভালো বা গ্রহণযোগ্য তাও আবার না। যা আসলে প্রয়োজন তা হচ্ছে আধিপত্যবাদবিরোধী সমালোচনামূলক বোঝাপড়া, যার আরেক নাম সংগ্রাম। এই সংগ্রাম চিন্তার রক্তপাতের সংগ্রাম, মুক্তিকামী সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, যা আবার হয়ে উঠতে পারে সরাসরি রাজনৈতিকও।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেলেই বা থাকলেই মার্কিন সরকারের বা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপতৎপরতাকে সমালোচনা করা যাবে না বা রুখে দেওয়া যাবেনা (একই ল...

নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের জন্য স্থান কোনো বাধা নয়।

5:30 PM Editor 0 Comments

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেলেই বা থাকলেই মার্কিন সরকারের বা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপতৎপরতাকে সমালোচনা করা যাবে না বা রুখে দেওয়া যাবেনা (একই লজিকে বাংলাদেশে থাকলে বাংলাদেশ সরকারের বা বাংলাদেশের সবচাইতে ক্ষমতাসীনদের কোনো সমালোচনা করা যাবে না; আবার পাল্টা-কথাটাও বলে কেউ কেউঃ কেবল বাংলাদেশে থাকলেই বাংলাদেশ সরকারের বা ক্ষমতাশালীদের সমালোচনা করা যাবে), এসব সুবিধাবাদী ধারণা স্থানের ছুঁতো দিয়ে কিংবা স্থানের দোহাই পেড়ে চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের বিভিন্ন সম্ভাবনাকেই নস্যাৎ করতে চায়। স্থান নিয়ে এইসব ধুনফুন ক্ষমতাসীনের বা নিপীড়কের পক্ষেই যায়।

এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে দু'একটা কথা বলি। কী এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র? "আদিবাসীদের ভুমি চুরি করে' এবং তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন ধরণের শ্রম ও সম্পদকে শোষণ করে' গড়ে-ওঠা এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় বিশ্বের সকল নাগরিকেরই কোনো না কোনোভাবে হক আছে," কথাটা মেলা আগেই যথার্থই বলেছিলেন "ব্ল্যাক পাওয়ার" আন্দোলনের বিপ্লবী স্টোকলি কারমাইকেল। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই।

যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসটা জানেন (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা দুর্দান্ত ইতিহাসের বই লিখেছিলেন হাওয়ার্ড জিন), তারা এও জানেন যে, এই দেশ কোনো নির্দিষ্ট মার্কিন সরকারের বাপ-দাদার সম্পত্তি নয় এবং এখানে এলেই সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সরকারের কাছে আত্মা ও মাথা বিক্রি করে দিতে হবে তার তো কোনো কথা নেই। যারা করতে চায় তাদের কথা আলাদা।

তবে বলা দরকার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছে আদিবাসীদের উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামের বিশাল ঐতিহ্য। এ দেশেই রয়েছে কালা আদমিদের এবং অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম। অবশ্যই রয়েছে লাখো লাখো শ্রমিকের পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রাম। এবং এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই রয়েছে ছোট ছোট "তৃতীয় বিশ্ব" (উদাহরণ হিসাবে বলা যাবে রেজারভেসন-ঘেটো-বারিও'এর কথা)।

তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিরাজমান বিভিন্ন ধরণের নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে-কোনো জাতির যে-কেউই সোচ্চার হতে পারেন; ভেতরে যারা থাকেন তারা যেমনি, বাইরে থাকেন যারা তারাও তেমনি, এবং তাদেরকে স্থানের দোহাই দিয়ে থামিয়ে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে ওই নিপীড়নকেই প্রশ্রয় দেয়া। নিপীড়ক নিপাত যাক।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

These two things--the river and the train--continue to fascinate me. Their sounds--and their silences--seem deeply woven into the texture ...

Atrai and the Communist Manifesto : A Note by Azfar Hussain

11:55 PM Editor 0 Comments

These two things--the river and the train--continue to fascinate me.

Their sounds--and their silences--seem deeply woven into the texture of my daily experience. I keep hearing the river stream by--and the train whizz by--in my head and even in my dreams. I'll never forget that full moon over the river Atrai--the river of my childhood--where the fresh eternity of silver played with the tiny infinitudes of those ripples--cadenced, lighted, mud-colored. Nor will I ever forget the sight of a train wet in the afternoon rain in Atrai.

How can I forget you, Atrai, my river and my place? Atrai is simultaneously the name of a river and the name of a rural place in Bangladesh. I had spent part of my childhood in a landless peasant community near Atrai, which then was a politically charged site, even a sensational site, of Maoist activism--a site that was declared an "independent zone" during the National Liberation War of Bangladesh. To tell you the truth, when I was around 13, one grey afternoon, it was actually one of those Maoists in Atrai--my uncle's friend--who handed me a soiled copy of _The Communist Manifesto_ in a Bengali translation and urged me to read it.

And, as far as I can remember, he did not immediately give me those little red books circulating with a vengeance at the time. So, at 13, I puzzled over and struggled with many things in the Manifesto, but ended up clinging onto two words at least--bourgeoisie and proletariat--making probably a feeble sense of them, while having a vague idea of what the class struggle might mean. Even as a kid, however vague my ideas remained at that time, I immediately identified with the proletariat, thinking that we must combat the bourgeoisie for a better world.

Yet the river and the train as well as the full moon over them didn't cease to fascinate me then. But, true, I also saw the river--Atrai--drenched with blood and replete with corpses while I saw the full moon heavily bleed in the prison-cell of the sky. And I heard the train groan by, packed as it was with nothing but disposable numbers--the brutal anonymity the powerful excel in multiplying. I also saw how the rain became a raging gust, an ample burst of dark petals in the night, a destroyer of peasants' mud-huts in Atrai, near Atrai, around Atrai, and elsewhere. And I recall with absolute clarity how my grandfather's thatched roof fell apart! The rain did not seem beautiful then.

And guess what? At around 14, I began to see the river and the train and the rain and the moon themselves in the pages of the Manifesto, realizing--my many vague and deeply struggling ideas notwithstanding--that even the moon must be liberated from the bourgeoisie, from the oppressor!

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

আপনে বাংলাদেশেই আছেন। বিদেশ থেকে ফিরে বাংলাদেশেই থাকেন। বাংলাদেশের শ্রমিক নিয়ে কথা বলতে চান। বাংলাদেশের কৃষক নিয়েও কথা বলতে চান। বাংলাদেশে...

ভাষা নিয়ে কিছু কথা - আজফার হোসেন

11:59 PM Editor 0 Comments

আপনে বাংলাদেশেই আছেন। বিদেশ থেকে ফিরে বাংলাদেশেই থাকেন। বাংলাদেশের শ্রমিক নিয়ে কথা বলতে চান। বাংলাদেশের কৃষক নিয়েও কথা বলতে চান। বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের নিয়েও কথা বলতে চান। বলেনও। অবশ্যই বলতে হবে। সবাই মিলেই বলতে হবে। কেন নয়? কিন্তু একটা বাক্যও আপনি তাদের পক্ষে তাদের ভাষায় লিখতে পারেন না। বাংলা ভাষা শেখার বিষয়ে আপনার কোনো আগ্রহও নাই। বাংলা ভাষা ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোনো ভাষা শেখাতেও আপনার কোনো আগ্রহ নাই। তাহলে ইংরেজি-ই আপনার একমাত্র মূলধন! আমি মোটেই ভাষাভিত্তিক 'শোভিনিজিম'-এর পক্ষে নই। আমি মোটেই ইংরেজি ভাষা শেখার বিপক্ষে নই। আমি নিজেই ইংরেজিতেও লিখে থাকি। কিন্তু বাংলাদেশে থেকেই আপনি কোন্ ভাষায় লিখছেন বা বলছেন আর কোন্ ভাষা বর্জন করে চলেছেন, তা মোটেই রাজনৈতিক বা আদর্শিকভাবে নিরীহ বিষয় নয়।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

বৃষ্টি হচ্ছে মূলঃ বিসেন্তে আলেকজান্দ্রে [হিস্পানি কবি] অনুবাদঃ আজফার হোসেন এই সন্ধ্যায় বৃষ্টি হচ্ছে, আর তোমার যে ছবিটা তুলেছিলাম তাও...

বৃষ্টি হচ্ছে - অনুবাদঃ আজফার হোসেন

2:24 AM Editor 0 Comments

বৃষ্টি হচ্ছে
মূলঃ বিসেন্তে আলেকজান্দ্রে [হিস্পানি কবি]
অনুবাদঃ আজফার হোসেন

এই সন্ধ্যায় বৃষ্টি হচ্ছে, আর তোমার যে ছবিটা
তুলেছিলাম তাও ঝরছে আজ বৃষ্টি হয়ে।
দিনটা হুট করে খুলে যায় আমার স্মৃতিতে।
ভেতরে হেঁটে আসো। অথচ আমি কোনো আওয়াজ পাই না।
স্মৃতি আমাকে তোমার ছবি ছাড়া দেয় না তো কিছুই।
সেখানে কেবল তোমার চুম্বন ঝরছে, অথবা ঝরছে বৃষ্টি।
তোমার কণ্ঠস্বর বৃষ্টি হয়ে ঝরছে
তোমার বিষণ্ণ চুম্বন বৃষ্টি হয়ে ঝরছে
গভীর চুম্বন, বৃষ্টিতে ভেজা চুম্বন। ভেজা ভেজা ঠোঁট।
স্মৃতিতে ভিজে ভিজে ফুঁপিয়ে কাঁদছে চুম্বন
কোনো এক ছাইরং মোলায়েম আকাশ থেকে।
তোমার প্রেম থেকে ঝরে বৃষ্টি, আমার স্মৃতিকে
ভিজিয়ে দিয়েই বৃষ্টি পড়তেই থাকে। অনেক নিচে
চুম্বন পড়ে। ধূসর বৃষ্টি
ঝরেই চলেছে।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

One might want to compare at least part of the Japanese tale Hojoki- -usually translated as "The Ten Foot Square Hut"--by the 13th...

A Quick Note on the Japanese Tale Hojoki by Azfar Hussain

9:09 PM Editor 0 Comments

One might want to compare at least part of the Japanese tale Hojoki--usually translated as "The Ten Foot Square Hut"--by the 13th-century Japanese writer and poet Kamo no Chōmei to part of the pre-Socratic Greek philosopher Heraclitus's work that offers us, for instance, his famous "pranta rhei" (everything flows) formulation: Ποταμοῖς τοῖς αὐτοῖς ἐμβαίνομέν τε καὶ οὐκ ἐμβαίνομεν, εἶμέν τε καὶ οὐκ εἶμεν (We both step and do not step in the same rivers. We are and are not.) Put simply, the Japanese tale Hojoki mobilizes--in images and ideas--the Heraclitean axiom of "flux" and the Buddhist doctrine of impermanence. But what is more interesting for me is that this Heraclitean-inflected Japanese work was considerably influenced by the Indian sage Vimalakīrti from the Vimalakīrti Sūtra, although I'm wondering if much comparative work has been done on that kind of connection and influence.

Oh, and why should we compare? Because we live in the world.

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

নদীটার নাম মুসি। কিন্তু আরেক নদী আছে। কী যেন নাম তার? বুকের ভেতর কেঁদে-কেঁদে নদীটা কোন্ এক নাম-না-জানা সমুদ্রে হারিয়ে যায়। পূর্ণিমার আকাশে...

মুসি নদী, ফ্র্যাকটাল জ্যামিতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ -- আজফার হোসেন

8:56 PM Editor 0 Comments


নদীটার নাম মুসি।


কিন্তু আরেক নদী আছে। কী যেন নাম তার? বুকের ভেতর কেঁদে-কেঁদে নদীটা কোন্ এক নাম-না-জানা সমুদ্রে হারিয়ে যায়। পূর্ণিমার আকাশে দগদগে ক্ষতের মতো চাঁদটা অবশেষে ঢেউয়ের ভেতরে ভেঙে-ভেঙে চুরমার হতে থাকে। মুসি নদীটা কেন জানি সেই অচেনা নদী আর সেই আকৃতিহীন চাঁদটার কথা মনে করিয়ে দেয়। কান্নার কথাও মনে আসে। নদীর কান্না শুনেছি কতো রাত! 


মরা আত্রাইয়ের পারে একবার একটা কাটা মুণ্ডু দেখেছিলাম, যখন আমার ছেলেবেলা ছিল। আত্রাই! আত্রাই! তুমি কি মরে যাচ্ছ? কতো রাত ভেতরের নৈঃশব্দ্যকে খানখান ক'রে ভেঙে দিয়ে এই প্রশ্নটাকে আর্তনাদের মতো ধ্বনিত হতে শুনেছি। আত্রাই কেঁদে-কেঁদে ফেরে; ভেতরে সেই কান্না আবার জমাট বরফ হয়ে যায় একসময়; অতঃপর উত্তাপের অপেক্ষায় থাকে। 


আজকাল খুব বেশি মনে হয়, যে মানুষের কান্না শোনে নাই, সে কখনও নদীর ধারে যায় নাই। যে নদীকে চেনে নাই, সে ডুকরে-ডুকরে ওঠা সময়ের কান্না শোনে নাই। বনলতা, বড় সাধ হয়, তোমাকে নিয়ে যাই সেই নদীটার ধারে, যে নদীটার নাম আজও জানা হয় নাই।


হ্যাঁ, নদীটার নাম মুসি। নামটা প্রথম শুনেছিলাম যোসেফের মুখে। যোসেফই বললেন, একসময় নদীটা হায়দ্রাবাদ নগরীর পাঁজর ঘেঁষে বয়ে যেতো; আর আজ সে বয়ে যাচ্ছে নগরীর বুক চিরে। অর্থাৎ নদীর ওপারের এলাকাতে নগরী বেড়েই চলেছে। পুঁজির ফটকাবাজিতে বৃদ্ধি, বিস্তার আর বৈপরীত্যই তো নগর'সভ্যতা'র অন্যতম মন্ত্রঃ সারা পৃথিবী জুড়ে নগরগুলো বাড়তে থাকে, কেবল বাড়তেই থাকে। আর গ্রাম ভাঙনের শব্দ নাম-না-জানা সেই নদীটার মতোই কাঁদতে থাকে, কাঁদতেই থাকে। সময়ও শুনে যায়, কেবল শুনে যায় সেই কান্না।


বাড়তে-বাড়তে হায়দ্রাবাদের সহোদর এভাবেই জন্ম নেয়। এর নাম সেকান্দারাবাদ। হাত ধরাধরি করে থাকে তারা। এদের শহরতলী আবার ষোলো মাইল পর্যন্ত এলিয়ে আছে। প্রায় তিরিশ লাখ এদের জনসংখ্যা। দাক্ষিণাত্যের এক মালভূমির ওপর চোখ-ধাঁধানো নেশা-ধরানো চারশো বছরের একজোড়া নাচতে-থাকা নগরীর নাম হায়দ্রাবাদ-সেকান্দারাবাদ। 

 লোরকার কবিতার সেই চিত্রকল্পটা মনে আসে। সমুদ্রের অতল থেকে নুন-মাখা শরীর নিয়ে জেগে উঠেছে এক নারী; সমুদ্র থেকে অনেক ওপরে চলে যাচ্ছে সে; পাস্কালীয় শূন্য স্পেসে মুদ্রা কেটে-কেটে নাচতে-নাচতে সে হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

কিন্ত, হায়দ্রাবাদ-সেকান্দারাবাদ মোটেই আতঙ্কিত নয়; তারা আনন্দিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭৬০ ফুট ওপরে তাদের শরীর সেকি অটুট! নাচের মুদ্রায় তারা সেকি স্বতঃস্ফূর্ত! অন্ধ্র প্রদেশের বুকের ওপর আলো-নিসর্গ-নদী-মাটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়ে নেচে চলেছে, ভারতের [তখন] পঞ্চম বৃহত্তম নগরী, অন্ধ্র প্রদেশের রাজধানী। তখন বলা হোত, পৃথিবীর সুন্দরতম নগরীগুলোর একটি হায়দ্রাবাদ।


সেদিন আমরা যাচ্ছিলাম হায়দ্রাবাদের গোলকোন্ডা কেল্লায়। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে; বাস ছুটে চলেছে নগরীর রাস্তায়; বাসের ভেতরে আমরা ছিলাম প্রায় বিশ জন; আমাদের কোলাহল, কথোপকথন, নৈঃশব্দ্য, চিন্তাও ছিল। রঞ্জনার হাসি শুনতে পেলাম; বাসের মাঝখানে জানালা-ঘেঁষা একটা আসন তখন আমার দখলে, বাইরে তাকিয়েই দেখা যায় ড্রাগষ্টোর, সাইনবোর্ড, কলেজ, গাড়ি, ধোঁয়া, হুসেন সাগর, মানুষ--সবই ছুটে চলেছে, সবই ক্ষণস্থায়ী, টুকরো-টুকরো, সবই থাকে, আবার থাকেও না। ভালো লাগলো, আবার অসহায় বোধ করলাম। 


মনে হলো, ওই জানালা হঠাৎ ভেঙে গেলো; মনে হলো, বাসের বডিটা খুলে পড়লো, ছুটে-চলা বাসের ভেতর থেকে আমি পড়ে গেলাম, শুরু হলো আরেক ছুটে চলাঃ ২৪ আগস্ট উদ্ভাসিত হলো, নোংরা পুড়ে-যাওয়া অথচ সুন্দর-শীতল ঢাকার মুখ সামনে এলো; বুকের ভেতর দাউ-দাউ আগুন জ্বলে উঠলো; ২৪ আগস্ট-এ যে কাছে এসেছিলো সময়ের আর প্রেমের কবিতা হাতে নিয়ে আর শুনিয়ে-শুনিয়ে, সে এখন কি ফিরে গেছে সেই ভয়াল নাম-না-জানা শহরে?... ইঁদুর কেটে ফেলেছে সমস্ত গ্রন্থি, আমার পুরাতন টেবিলের একটা বুড়া- থুত্থুরে পায়া চলে গেছে ঘুনের দখলে...সংবিধান উইপোকার দখলে, নাকি সংবিধান এখন বিধানের সঙ?...পতাকা এখন ইঁদুরের দাঁতে; পার্লামেন্টে মাকড়সার জাল বাড়ছে। 


মাকড়সা মানেই 'ফ্র্যাকটাল' জ্যামিতি... একবার, মনে পড়ে, ওই জ্যামিতির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম... শালার 'ফ্র্যাকটাল'! ত্রিভুজের দু'টো বাহু উড়িয়ে দিয়ে তাকে আস্তো একটা রম্বসে পরিণত ক'রে তিনটে বৃত্তকে এদিক-সেদিক ঠেসে-ঠুসে হাতের ভেতরে একটা বিশেষ শেপ অনুভব করার নান্দনিক-শারীরিক আনন্দের অন্বেষণে তোমার কাছে গিয়েছিলাম হে 'ফ্র্যাকটাল' জ্যামিতি! এও বুঝেছিলাম, জ্যামিতি দু'টো জিনিস বোঝে ভালো--এক, দেহতত্ত্ব ও দুই, রাজনীতি। হ্যাঁ, রাজনীতি আর দেহতত্ত্ব ছাড়া জ্যামিতি জমে না মোটেই।


"কী চুপচাপ যে? আমার পাশ থেকেই প্রশ্নটা এলো, আনন্দ শর্মার কাছ থেকে। বাসের খুলে-যাওয়া জানালাটা ধপ্ করে লেগে গেলো, বাসের বডিটাও ঝট করে আকৃতি ফিরে পেলো; পড়ে-যাওয়া 'আমি' তখন বাসের ভেতরে জানালার পাশের সিটে বসে আনন্দ শর্মার প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কী বলবো? হঠাৎ মনে হলো বলিঃ আমার জিহ্বাটা কে যেন কেটে ফেলেছে গত রাতে। তারপর মনে হলো, এমনি একটা
উত্তরকে নিছক পাগলামি ঠাউড়াবেন ইংরেজি সাহিত্যের নেপালী শিক্ষক আনন্দ শর্মা। তাই বললামঃ না, বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম।


[আমার এক পুরানো দিনের ভ্রমণকাহিনী থেকে। চলবে।]


0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

আজ--২৪ এপ্রিল--খাপরা ওয়ার্ড শহীদ দিবস। ১৯৫০ সালে এই দিনে নির্মম ভাবে সাত জন কম্যুনিস্ট বিপ্লবীকে রাজশাহী জেলের খাপরা ওয়ার্ড-এ গুলি করে হত্যা...

The Khapra Ward Day: The Moment and the Movement by Azfar Hussain

9:19 AM Editor 0 Comments

আজ--২৪ এপ্রিল--খাপরা ওয়ার্ড শহীদ দিবস। ১৯৫০ সালে এই দিনে নির্মম ভাবে সাত জন কম্যুনিস্ট বিপ্লবীকে রাজশাহী জেলের খাপরা ওয়ার্ড-এ গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এঁরা লড়ছিলেন বাংলাদেশের খেটে-খাওয়া মানুষের মুক্তির পক্ষে। এঁদের নিয়ে গত বছর আমার একটা লেখা বেরিয়েছইল ইংরেজি পত্রিকা _ডেইলি স্টার_-এ। সময় পেলে পড়ে দেখতে পারেন। লেখাটা নিচে দিলামঃ

No history is mute. No matter how much they own it, break it, and lie about it, human history refuses to shut its mouth. Despite deafness and ignorance, the time that was continues to tick inside the time that is. —Eduardo Galeano
Who are those? If they are communists they should be shot dead. —A police officer, Rajshahi Central Jail, 1950

1

April 24, 1950. It was a sunlit Monday morning. There were 39—according to some, 42—political prisoners in the famous Khapra Ward of Rajshahi Central Jail in the then East Pakistan (now Bangladesh). Following the jailor's order, a group of prison-guards opened fire on those unarmed prisoners. They were then in the middle of a hunger strike, protesting inhuman prison practices that ranged from brutal torture to serving sub-standard food—practices enforced by the Muslim League government of Pakistan. Seven communist leaders—Dilwar Hussain and Hanif Sheikh of Kushtia, Anwar Hussain of Khulna, Sudhin Dhar of Rangpur, Bijan Sen of Rajshahi, Sukhen Bhattacharya of Mymensingh, and Kamporam Singh of Dinajpur—were brutally killed in the firing. Other communist prisoners—except a few—were severely injured.

As the Marxist writer-activist Ranesh Dasgupta tells us, among those killed on April 24, 1950, Kamporam Singh was one of the major leaders of the Tebhaga Movement in Dinajpur, while Dilwar Hussain and Hanif Sheikh were the leading organisers of railway and textile mill workers' unions and movements in Kushtia and Pabna. Bijan Sen and Sudhin Dhar were the fierce revolutionaries of Bengal's “Agni Joog,” as it used to be called. Both of them had some substantial experience of serving in prison earlier. Following their imprisonment, they exemplarily devoted themselves to building workers' organisations and movements. Anwar Hossain and Sukhen Bhattacharya were dedicated student activists, while Sudhin Dhar, after 1947, was in charge of an organisation of railway workers in Rangpur. Indeed, as Ranesh Dasgupta further tells us, all of them—while committed to the idea of communism—were variously linked to the communist party itself. I think their togetherness in the Khapra Ward seemed to be representing a kind of communist alliance among peasants, workers, and students, however temporary it might seem.

Thus, among the left in particular, April 24 is known as the Khapra Ward Martyrs' Day. But that day is more than a fleeting historical or dramatic moment. In other words, that 'moment,' I submit, cannot be seen in isolation from the entire history of our national liberation movement itself. In fact, one can trace the history of our liberation movement even earlier than 1952—at least as far back as 1947-1950. For, to be historically faithful, it was precisely at that post-'independence' conjuncture in Pakistan that the initial waves of resistance to its ruling classes came from peasants, from workers, and—however outrageous it may sound to some mainstream partisan historians today—from communists themselves, their internal differences and tactical pitfalls notwithstanding.

Indeed, our standard or official or middle-class historical narratives of the Liberation Movement of Bangladesh—which was by no means a one-off event—both reveal and conceal. Surely they keep revealing the roles of certain leaders and individuals again and again, important and even heroic as they are. But those historical accounts in many instances also remain suggestively silent about the roles of the genuinely oppressed—women, peasants, and workers, among others, for instance. Indeed, without their protracted struggles, their insurrections, their uprisings, and their sacrifices at various levels and various times, Bangladesh would not have come into being as a distinct nation-state in 1971. Indeed, the true protagonists of our Liberation Movement of 1971 were common, 'ordinary' people themselves, the majority of whom were peasants and workers.

But, then, there are even other years and other names that also remain virtually or relatively absent in our standard historical narratives. In fact, history-writing itself continues to remain a battlefield of conflicting and competing interests—even a site of the class struggle—while absences, silences, and gaps in the writing of our history are by no means politically and ideologically neutral or innocent.

2

So, then, do we know who Lutfar Rahman was? Or Mozam Mollah and Fani Guha, for that matter? These names, among many others, take us back to a particularly turbulent period in the history of people's resistance in the then East Pakistan, a period not often heeded, let alone scrutinised. Lutfar Rahman was a communist activist from Jessore. He was arrested in 1939. He was accused of the 'crime' that he used to read and disseminate communist literature. After the creation of Pakistan as a nation-state, Lutfar was arrested again, in 1949. He actively participated in hunger-strikes—then almost generally reckoned an 'effective' tactic of resistance by communists—against the oppressive prison-system of Pakistan and by extension, against the Pakistani ruling class. While in prison in 1950, Lutfar Rahman was infected with tuberculosis. Witnessing—and being subject to—the kind of brutal persecution that went on inside prison without any signs of abatement and was particularly perpetrated on his fellow communists, Lutfar went literally insane at one point. Although he was released on July 13, 1950, physically and mentally tortured and devastated as he was, he died at the prison gate itself. Obviously, it was not a natural death but a murder.


And then there was Fani Guha. He was Secretary of the Dhaka District Communist Party. He was arrested in 1949. Because of his persistent participation in hunger-strikes inside jail—there were as many as four hunger-strikes, spanning a total of 181 days during the period between 1949 and 1950, in which communists and left activists participated to varying degrees—his arteries got brutally pierced and thus he died soon after he had been transferred to the Mymensingh jail. Mozam Mollah—who was a fierce militant of the Tebhaga movement in the Narail area of Bangladesh—also died in prison in 1949 because of inhuman police brutality perpetrated on him, while Bishnu Bairagi was beaten to death in the Khulna jail in 1950. Also, women prisoners—communist as they were—were variously tortured. My own former teacher Nadera Begum, who herself was a communist prisoner in the Dhaka Central jail, and who was tortured by the police there (she was released in 1950 and later became a professor in the Dhaka University English department), told us quite a few of those horror stories of torture in prison.

One can surely cite many other examples, while I cannot traverse the entire range of even relevant events here owing to space constraints. But I think the main point comes out clearly: the entire prison system of the then East Pakistan, the coercive apparatus of the post-independence Pakistani ruling class, decisively targeted Bengali communists, left activists, and peasant leaders, who were then perceived to be the most dangerous enemies of Pakistan. Many of them were even called or considered “deshodrohee” (treacherous to the country), for instance. Motiur Rahman's 2015 book called Khapra Ward Hottakando 1950 [Khapra Ward Killings 1950]—well-researched as it is—calls attention to an official press note that explicitly described or declared the communist revolutionaries in 1950 as “deshodrohee,” or as anti-Pakistan elements to be eliminated.

3

Indeed, what the communist prisoners did in 1949-1950 cannot be simply reduced to a case of adventurism and thus glibly or quickly dismissed as a total failure, although there were certain elements of adventurism of which one might be critical. As Salud Algabre, the feminist leader of the Sakdal rebellion in the Philippines, once memorably put it, “No uprising fails [in the final instance]. Each one is a step forward.” And what the communist inmates did inside various prisons in the then East Pakistan—particularly in Rajshahi Central Jail, where police brutalities and physical torture assumed unparalleled proportions—can be seen as an organised movement in its own right. Owing to space constraints again, I intend to make only a few general points about this movement here.

In the first place, the movement of the communist prisoners—by organising hunger strikes in almost headlong succession—repeatedly resisted inhuman prison conditions, which themselves were seen as examples of organised state violence. For the communists, prison itself turned out to be an explosive site of class struggle. Some works—particularly Badruddin Umar's Purbo Banglar Bhasha Andolon o Totkalin Rajneeti [The Language Movement of East Bengal and Politics at the Time] and Abdus Shaheed's Kara Smriti [Prison Memoirs]—memorably depict the notorious prison conditions prevailing at the time in the country. In this instance, the organised communist resistance—the first one of its kind—to the coercive apparatus of Pakistan amounted to resisting the very state of Pakistan which was found to be oppressive by and large.

But the larger significance of the Khapra Ward movement, I think, resides in the fact that the communist prisoners derived their energy and inspiration from at least 4 remarkable peasant movements—the Tebhaga Movement (1946-47), the Tonko Abolition Movement (1946-50), the Nanakar Abolition Movement (1920-50), and the Nachol Movement (1949-1950)—movements that of course decisively and exemplarily underlined the land as the site of the class struggle for the toiling masses. But some of the demands advanced by those peasant movements remained variously unmet even after the independence of Pakistan in 1947.

Thus it was strategically clear to the communists at the time—and they were among the first ones to have immediately realised—that the independence of Pakistan was a fake one, and that the state of Pakistan was an undemocratic, feudal, militaristic, colonialist, and pro-imperialist at the same time. And they wanted to dismantle this state in favour of the emancipation of peasants and workers. It is true that the organisations of the communist party were getting increasingly strong and gathering remarkable momentum in East Bengal between, say, 1937 and 1947. But later on, many, if not all, communists in East Bengal turned to the path of the armed struggle—inspired particularly by B.T. Ranadeev of the Communist Party of India, for instance—without, however, adequately considering their mass-bases and the strengths of their opponents, among other issues. The prices the communist movement had to pay subsequently were enormous, to say the least.

The above topic itself calls for an extended engagement into which I cannot go now. But—regardless of their tactical pitfalls and the degree of their detachment from the people themselves—the Khapra Ward communist prisoners, among other prisoners of course, at least clearly provided the message that the Pakistani ruling class would not go unchallenged by any means. It was a beginning of sorts. It marked the beginning of anti-Pakistan resistance. It's not for nothing that the Khapra Ward prisoners subsequently served as an inspiration to the left, and that they were remembered fondly and respectfully by a lot of freedom-fighters during the Liberation War of Bangladesh, people's war as it was.

The Khapra Ward communist prisoners—in their own ways—also fought in advance, so to speak, for the three announced principles—I call them “revolutionary” principles—that later guided our national liberation movement in 1971, for instance: equality, justice, and dignity. As long as these three fundamental principles remain relevant—and indeed they remain relevant, given that the majority of the people in our country, including women, peasants, workers, and minorities, have not yet achieved their economic, political, and cultural freedom in our country—the Khapra Ward communist prisoners remain with us in the history of our struggles against all forms and forces of oppression and exploitation.

The writer is Vice-President of US-based Global Center for Advanced Studies and Associate Professor of Liberal Studies/Interdisciplinary Studies at Grand Valley State University in Michigan, while he is currently Scholar-in-Residence at the University of Liberal Arts-Bangladesh (ULAB).He writes in both Bangla and English.

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Azfar Hussain quotes from the French philosopher and his comrade Alain Badiou's magnificent piece called "Poetry and Communism,...

Alain Badiou's magnificent piece called Poetry and Communism.

2:22 AM Editor 0 Comments

Azfar Hussain quotes from the French philosopher and his comrade Alain Badiou's magnificent piece called "Poetry and Communism," and he says a few things about it.


0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

"Globalectics and Interdisciplinarity:" A Lecture by Azfar Hussain

Globalectics and Interdisciplinarity: A Lecture by Azfar Hussain

11:47 AM Editor 0 Comments

"Globalectics and Interdisciplinarity:" A Lecture by Azfar Hussain


0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

এই ‘ফরমুলেশন’-টা মাও জে দং-এরঃ যাকে ‘জ্ঞান’ বলা হয়, এমনকি যাকে ‘সঠিক জ্ঞান’ হিসাবে বিবেচনা করা চলে, সেই জ্ঞান আকাশ থেকে হুট করে নাজিল হয় ন...

মাও জে দং, জ্ঞান ও অনুশীলন - আজফার হোসেন

5:36 AM Editor 0 Comments



এই ‘ফরমুলেশন’-টা মাও জে দং-এরঃ যাকে ‘জ্ঞান’ বলা হয়, এমনকি যাকে ‘সঠিক জ্ঞান’ হিসাবে বিবেচনা করা চলে, সেই জ্ঞান আকাশ থেকে হুট করে নাজিল হয় না, কিংবা তা আবার ভূমি ফুঁড়ে হাজিরও হয় না, কিংবা আবার সেই জ্ঞান আগেভাগেই সময়-ও-স্পেসেও নিহিত বা স্থির থাকে না; বরঞ্চ সেই জ্ঞান আসে বিভিন্ন ধরনের অনুশীলন থেকেই এমনভাবে যে, চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে জ্ঞানকে অনুশীলন থেকে বিছিন্ন করা যায় না।

এই ‘ফরমুলেশন’-টা ন’কে এবং ‘অনুশীলন’কে সাধারণ অর্থে নিলে চলবে না। অর্থাৎ ‘জ্ঞান’ মানে কেবল ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা নয়, যে ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতাকে অবশ্য হিউম-প্রভাবিত (এখানে লক এবং বার্কেলিও বাদ যাবেন না) পশ্চিমা দর্শনের ‘এম্পিরিসিজম’-নামের ধারাটি গুরুত্ব দিয়েছে। আবার এই ‘অনুশীলন’ মানে ‘বিশুদ্ধ’ চিন্তাচর্চা নয়, কেবল চিন্তাকে নিয়েও চিন্তা করা নয়, যার বিভিন্ন ‘অনুশীলন’ এর মধ্যেই আমরা পশ্চিমা মুলুকে লক্ষ্য করেছি, সেই হাইডেগার থেকে শুরু করে আজকের আল্যান বাদিউ পর্যন্ত, যদি আমরা কেবল বিশ ও একুশ শতকের কথাই ধরি।

এখানে গাণিতিক জ্ঞানের প্রসঙ্গও চলে আসে। দেকার্ত-স্পিনোজা-লাইবনিজ-প্রভাবিত দার্শনিক ধারার একটা বিশেষ অংশ—যাকে ‘র‍্যাশনালিজম’ নামে ডাকা হয়—সেই অংশের আবার আরেক বিশেষ অংশ ওই গাণিতিক জ্ঞানকে চূড়ান্ত, একপেশে গুরুত্ব দিয়েছে এমনভাবে যে, গণিতকে যেন ‘সব-পেয়েছির-দেশ’ মনে হয়; অর্থাৎ, ওই ধারা মোতাবেক (স্পিনোজার কথা অবশ্য আলাদা এবং সেটি আরেক প্রসঙ্গ), কেবল গণিত-ই পারে সবকিছুর—প্রকৃতি, মন, জীবন এবং জগত-মহাজগতের—অন্তর্গত কাঠামোর সঠিক জ্ঞান দিতে।

মাও মোটেই গণিত-বিরোধী ছিলেন না। চীনে গণিত নিয়ে খোদ মার্কসের ঢাউস পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হলে দারুণ আগ্রহ সহকারে মাও গণিত-চর্চার ওপর জোর দিয়েছিলেন তাঁর মতো করেই এবং এই বুঝিয়েও যে, বিশেষ বিশেষ জ্ঞান বিশেষ ধরণের গণিত-চর্চা থেকে আসতে পারে ঠিক-ই, তবে অনুশীলন হিসাবে গণিত সমস্ত সঠিক জ্ঞানের একমাত্র চাবিকাঠি নয়।

তাহলে কী এই ‘অনুশীলন?’ মাওয়ের চিন্তার সূত্র ধরে বলা যায় যে, এই অনুশীলন মানুষের ইতিহাসের ভেতরেই ঘটে আর সেখানে ঘটে বলেই এই অনুশীলন বিরাজমান উৎপাদন-সম্পর্ক থেকে বিছিন্ন নয়। কিন্তু সেখানেই শেষ না। এই অনুশীলন আমাদের জ্ঞান দেয় এই অর্থে যে, প্রকৃতি, জগৎ, জীবন ইত্যাদিতে ‘বীয়িং’-এর ‘ইন্টারভেনশান’কে এবং তাদের সঙ্গে ‘বীয়িং’-এর ‘ইন্টারঅ্যাকশান’কেই এই অনুশীলন সক্রিয় করে তুলে এই বুঝিয়ে যে, সঠিক জ্ঞান মানে বিশুদ্ধ, আসমানি জ্ঞান নয়; বরঞ্চ জ্ঞান আহরণে অনুশীলন নিজেই ‘ডায়ালেকটিক্যালি’ মধ্যস্ততা করে থাকে। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় অনুশীলন এবং জ্ঞান উভয়েই—মার্কসের কথা ব্যবহার করে বলা যায়--“বস্তুজগতের ভারে ভারাক্রান্ত থাকে” এবং বস্তুজগতও অনুশীলনের মধ্যস্ততায় অর্জিত জ্ঞানের ভারে ভারাক্রান্ত থাকে।

অর্থাৎ যদি এই কথাটা বলা সম্ভব হয় যে, “যাহা নাহি দেহভাণ্ডে/তাহা নাহি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে,” তাহলে এও বলা সম্ভব যে, “যাহা নাহি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে/তাহা নাহি দেহভাণ্ডে”। অন্য কথায়, ‘বস্ত’ আর ‘ভাব’-এর মধ্যে হুট করে বিভাজন-রেখা এঁকে ফেলা যায় না (বিপ্লবী ‘ডায়ালেকটিকস’-কে ঐতিহাসিক মুহূর্তের তাপে শান দেওয়ার স্বার্থেই হেগেলের তথাকথিত ‘ভাববাদ’-এবং মার্কসের তথাকথিত ‘বস্তুবাদ’-এর পুনর্পাঠ যে জরুরি হয়ে পড়ে, সেই কথা আগেও বলেছি এবং এখনও বলি); বরঞ্চ বলতে হয় বস্তুর ‘ভাবময়তা’র এবং ভাবের বস্তকতার ‘ডায়ালেকটিকস’-এর কথা।

যেহেতু অনুশীলন ও জ্ঞান উভয়েই ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট এবং যেহেতু তারা বিরাজমান উৎপাদন-সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, সেহেতু আমাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ কার অনুশীলন? কিসের অনুশীলন? কোত্থেকে আসে সেই অনুশীলন? কি কাজ করে সেই অনুশীলন? একইভাবে কার জ্ঞান? কিসের জ্ঞান? কোত্থেকে আসে সেই জ্ঞান? কি কাজ করে সেই জ্ঞান?

জানি, মাও জে দং-এর কথা পাড়লেই অনেকেই—এবং এমনকি মার্কসবাদীদের একটা দলও—তেড়ে মারতে আসে আর ‘খুনি’ ‘খুনি’ বলে চেঁচাতে থাকে। আর পশ্চিমা মুলুকে কিছু বামপন্থীর মধ্যে দেখি মাওয়ের অদ্ভুত ‘রোমানটিসাইজেশান’ এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিছক সরলীকরণ। অবশ্যই মাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তবে ঢালাও মাও-বিরোধিতায় যে দুর্দান্ত গোঁড়ামিও আছে, তাও লক্ষ্য না করে পারি না।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

The Latin American revolutionary poet Roque Dalton's "Ars Poetica" is a poem of three lines--"Poetry/ Forgive me for havi...

Ars Poetica: A Short Note by Azfar Hussain

11:36 PM Editor 0 Comments

The Latin American revolutionary poet Roque Dalton's "Ars Poetica" is a poem of three lines--"Poetry/ Forgive me for having helped you understand/ You're not made of words alone." As Claire Gebeyli, a Lebanese writer, puts it: "Of what use is the pen if it forgets to press down on people's chests? If the words it pours forth are mere particles sewn and resewn on the body of language?" On a somewhat different register, the Black feminist poet Audre Lorde underlines the task of a poet as being one "to name the nameless so it can be thought." Dalton, Gebeyli, and Lorde--their differences notwithstanding--converge at least around the idea that poetry is more than "word-making," more than even a clever play of words.

Is poetry, then, a kind of world-making? The worlding of the word and the wording of the world? Isn't the poet an Orphic singer who brings things into being for the first time? Isn't poetry also the letting go of language itself? And another, somewhat different question: What can thinking learn from poetry? These questions are not merely Heideggerian questions, as some of those Heideggerians would love to have us believe. Such questions, among many others, were already prompted by Lalon Fakir's own lyrical theories of the body and language, although in different contexts. This morning I was looking at the following "song-text" by Lalon, one that doesn't itself specifically ask the questions I ask above but one that surely prompted those questions for me:

দেহের খবর বলি শোন রে মন।
দেহের উত্তর দিকে আছে বেশি দক্ষিণেতে আছে কম।।
দেহের খবর না জানিলে
আপ্ততত্ত্ব কিসে মেলে
লাল জরদ ছিয়া ছফেদ
বাহান্ন বাজার এই চারিকোণ।।
আগে খুঁজে ধর তারে
নাসিকাতে চলে ফেরে
নাভিপদ্মের মূল দুয়ারে
বসে আছে সর্বক্ষণ।।
আঠারো মোকামে মানুষ
যে না জানে সেহি তো বেহুঁশ
লালন বলে থাকরে হুঁশ
আদ্য মোকামে তার আসন।।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

শেক্সপিয়রের সঙ্গে আমার সেই কৈশোর থেকে এখনকার জীবন বিভিন্নভাবেই জড়িয়ে আছে। শরৎচন্দ্রের দেবদাস-এর মতোই শেক্সপিয়রের রোমিও ও জুলিয়েট পড়েছি, বল...

লাইলি-মজনু, শেক্সপিয়র, বাহরাম খান ও বাদিউ -- আজফার হোসেন

10:54 PM Editor 0 Comments

শেক্সপিয়রের সঙ্গে আমার সেই কৈশোর থেকে এখনকার জীবন বিভিন্নভাবেই জড়িয়ে আছে।

শরৎচন্দ্রের দেবদাস-এর মতোই শেক্সপিয়রের রোমিও ও জুলিয়েট পড়েছি, বলতে গেলে, হাজার বার। একটা সময় মনে হোত, আমার বুক হয়তো ভেঙে খানখান হয়ে যাবে। অন্যান্য কারণেও যে বুক ভাঙে নাই, তাও না।
তবে এও না বলে পারছি না, লায়লি-মজনু'র প্রেমের কাহিনীকে কোনোভাবেই টপকাতে পারে নাই শেক্সপিয়রের রোমিও ও জুলিয়েট। এও সত্য যে, শেক্সপিয়রের ওই নাটকের অনেক, অনেক আগেই লায়লি-মজনু'র ঘটনার জন্ম। শেক্সপিয়রের রোমিও ও জুলিয়েট-এর প্রথম উৎস ইতালীয়। আর সেই ইতালীয় উৎসের উৎস হচ্ছে বার/তের শতকের ফার্সি কবি নিজামি'র লায়লি-মজনু'র কাহিনী। আবার সেই নিজামির ফার্সি কাহিনীর উৎস হচ্ছে সাত শতকের আরবি কবি কায়েস ইবনে মুলাওয়াহ। আর এই কবিকেই 'মজনু' নাম দেওয়া হয়েছিল লাইলির প্রেমে দিওয়ানা হওয়ার কারণেই।
আরেকটা কথাঃ আমাদের মধ্যযুগের বাংলা কবি দৌলত উজির বাহরাম খান ওই লায়লি-মজনুকে নিয়ে প্রথম কবিতা রচনা করেছিলেন। আর সেই কবিতাটাও রচনা করা হয়েছে শেক্সপিয়রের রোমিও ও জুলিয়েট-এর আগেই।

তো, আবারও সেদিন প্রেম নিয়ে আমার প্রিয় কমরেড এবং সহকর্মী আল্যান বাদিউ'র দুর্দান্ত বই ইন প্রেইজ অফ লাভ পড়লাম। দেখলাম, তিনি সেখানে লাইলি-মজনু'র নাম না নিয়েই তাদের কথাই আসলে বলছেন। বলছে্ন (যদি অন্য 'ইডিয়ম'-এ তা খানিকটা অনুবাদ করি)ঃ একেবারে "টোটালি" দিওয়ানা হওয়া ছাড়া--অর্থাৎ মজনু ও লায়লি হওয়া ছাড়া--প্রেমিক-প্রেমিকা হওয়া যায় না। আর প্রেমিক-প্রেমিকা হওয়া এমন এক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় যাকে আসলেই সনাতন যুক্তি, জ্ঞান-বুদ্ধি আর ভাষা দিয়ে ধরা যায় না।

আর মজনু বা লাইলী হওয়া তো এতো সহজ কম্ম নয়।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

লাতিন আমেরিকার লড়াকু লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানোর একটা দুর্দান্ত বইয়ের কাছে বারবার ফিরে আসি। বইটার নাম Mirrors। গালিয়ানো দুনিয়াব্যাপী মজলুম জ...

গালিয়ানো, ইতিহাসবয়ান ও সৃষ্টিশীলতা

11:15 AM Editor 0 Comments

লাতিন আমেরিকার লড়াকু লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানোর একটা দুর্দান্ত বইয়ের কাছে বারবার ফিরে আসি। বইটার নাম Mirrors।

গালিয়ানো দুনিয়াব্যাপী মজলুম জনতার বা "জগতের লাঞ্ছিত-ভাগ্যাহত"দের (কথাটা ফ্রানজ ফানো'র পূর্বসূরী হিসাবে কাজী নজরুলকেই চিহ্নিত করে রাখে), এবং "তুচ্ছ" জিনিসের ইতিহাস লিখেছেন বইটাতে, তবে সনাতন ঐতিহাসিকদের মতো লেখেন নাই মোটেই।

খণ্ড খণ্ড ন্যারেটিভ্-এ গল্প-প্রবাদ-রুপকথা-মিথ-পরিসংখ্যান-ঐতিহাসিক ঘটনা এবং কবিতার পংক্তিকে একসঙ্গে জড়ো করে তাদের গালিয়ানো বুনে গেছেন এমনভাবে যে, ইতিহাসকে দারুণভাবে চিন্তা করা যায়, দেখা যায়, শোনা যায়, স্পর্শ করা যায়। এবং জর্মন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ওয়ালটার বেনজামিনের মতো এভাবেও বলা যায় যে, ইতিহাস কেবল ধারাবাহিক বর্ণনার বিষয় নয়, বরং ইতিহাস-লিখনে ঝলকে ঝলকে ওঠে রৈখিকতা-ভাঙ্গা দীপ্তিময় মুহূর্তের ইমেজ--দ্বন্দ্ব ও টেনশানকে ধারণ করেই।

গালিয়ানো পড়তে গিয়ে আরেক লেখকের একটা বিশেষ কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো--একেবারে ভিন্ন সময়ের ও ভিন্ন ভাষার এক লেখককে, আমাদের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেই, যিনি হাল আমলের সাবঅলটার্ন ইতিহাসতাত্ত্বিকদের আগেই এক অর্থে "জগতের লাঞ্ছিত-ভাগ্যাহত"দের ইতিহাস লেখার ডাক দিয়েছিলেন এই বলে, "আরও সূক্ষ্ম, আরও তুচ্ছ জিনিসের ইতিহাস চাই। আজকের তুচ্ছতা হাজার বছর পরের মহাসম্পদ। মানুষ মানুষের বুকের কথা শুনতে চায়"।

এই ডাকটারই যেন উত্তর দিয়েছেন গালিয়ানো তার ওই বইটাতে। একটা বিশেষ মেসেজও বেরিয়ে আসে এই বইটা থেকেঃ সৃষ্টিশীলতা কোনো গোষ্ঠির বাপদাদার সম্পত্তি নয়; কেবল কবি-আঁকিয়ে-সঙ্গীতকাররাই যে সৃষ্টিশীল হবেন তা তো নয়, তারা সৃষ্টিশীলতার উদাহরণ হতে পারেন তো বটেই, কিন্তু সৃষ্টিশীল হতে পারেন একজন কৃষক, একজন কারণিক, একজন লড়াকু মানুষ, একজন শিক্ষক, একজন শ্রমিক ইত্যাদি।

আসলে গালিয়ানো এটাই বোঝান যে, মানুষের অনুশীলনের সমগ্রেই সৃষ্টিশীলতা বিভিন্নভাবেই কাজ করতে পারে। আর এই সৃষ্টিশীলতা ছাড়া মুক্তির সংগ্রাম এগুতে পারে না।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

রুশ ভাষা-দার্শনিক ভি. এন. ভলোসিনভ্ তার মার্কসিজম এ্যান্ড দ্য ফিলসফি অব ল্যাঙ্গুয়েজ -এ ভাষা নিয়ে আলোচনার একেবারে গোড়াতেই মতাদর্শের ওপর জোর দি...

ভাষা ও মতাদর্শ

9:56 AM Editor 0 Comments

রুশ ভাষা-দার্শনিক ভি. এন. ভলোসিনভ্ তার মার্কসিজম এ্যান্ড দ্য ফিলসফি অব ল্যাঙ্গুয়েজ-এ ভাষা নিয়ে আলোচনার একেবারে গোড়াতেই মতাদর্শের ওপর জোর দিয়েছেন। তার একটা কথা এইরকম : যে সব চিহ্নের সমগ্রকে ভাষা বলা যাবে, সেই সব চিহ্নের হাজিরা ছাড়া মতাদর্শের উৎপাদন সম্ভব নয়।

মার্কসের পথ ধরে ভলোসিনভ ভাষার সঙ্গে চেতনার চলমান দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে আগ্রহী হয়েছেন এবং এই পর্যবেক্ষণটাকে বিশেষভাবে সামনে এনেছেনঃ "ব্যক্তির চেতনা নিজেই সামাজিক-মতাদর্শিক ঘটনা।" আর ভাষা হচ্ছে ব্যবহারিক চেতনা।

তাহলে বিষয়টা দাঁড়াচ্ছে এমন যে, ভাষা নিজেই 'মতাদর্শে' জারিত। আসলে মতাদর্শিকভাবে নিরীহ বা নিরপেক্ষ কোনো ভাষিক-উৎপাদন পদ্ধতি নাই, যদিও মতাদর্শ সব সময় সরাসরি দেখা নাও দিতে পারে।

বিজ্ঞানের ভাষাও মতাদর্শিক হতে পারে। সেই মতাদর্শ হতে পারে নৈর্ব্যক্তিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতা (বা নৈর্ব্যক্তিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতার ভান)। এমনকি "বিজ্ঞানের আপাত-নিরপেক্ষ ভাষা পুঁজিবাদী মুক্তবাজার এবং পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শকে সমর্থন জোগাতে পারে", যে-কথাটা জোর দিয়েই বলেছেন ব্রিটিশ মার্কসবাদী ভূগোলবিদ ডেভিড হারভি তার বই জাস্টিস, নেচার এন্ড দ্যা জিয়োগ্রাফি অব ডিফারেন্স-এ।

এখানে গণিতের ভাষা নিয়েও দু-একটা কথা বলে নেয়া যায়। সেই ১৯৯৭ সালে আর্থার বি. পাউয়েল এবং ম্যারিলিন ফ্র্যাংকেস্টাইন-এর যৌথ সম্পাদনায় বেরিয়েছিল এথনো-ম্যাথেম্যাটিকস একটি প্রবন্ধ-সংকলন। এখানে প্রবন্ধের পর প্রবন্ধ এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই গণিতের ভাষার ও পদ্ধতির নিরপেক্ষতাকে মিথ হিসেবে প্রমাণ করে তাকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং গাণিতিক ভাষার মতাদর্শিক টানাপোড়েনকেও বিভিন্ন প্রসঙ্গে উন্মোচনও করেছে বটে।

প্রবন্ধগুলো বিশেষভাবে জোর দিয়েছে পশ্চিমা মুলুকের গাণিতিক ভাষার ইউরোপকেন্দ্রিকতার ওপর। এবারে ওই গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ থেকে গণিতবিদ দ্য' অ্যাম্ব্রোসিও-এর একটি উক্তি : "আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আধুনিক বিজ্ঞানের, বিশেষত গণিত ও প্রযুক্তির, সঙ্গে গভীর সম্পর্কে ও সহযোগিতায় উপনিবেশবাদ বিভিন্নভাবেই পোক্ত হয়েছে।"

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

I almost forgot that Terry Eagleton had a semi-autobiographical piece on the major Marxist thinker Raymond Williams, whose work was first...

A Note on Terry Eagleton and Raymond Williams

12:16 PM Editor 0 Comments

I almost forgot that Terry Eagleton had a semi-autobiographical piece on the major Marxist thinker Raymond Williams, whose work was first introduced to me in my early twenties in Dhaka by my teacher Serajul Islam Choudhury. One may not concur with many things Eagleton says in his work, but I find the piece he wrote on Williams not only moving but also revealing at more levels than one. The piece is called "Resources for a Journey of Hope: Raymond Williams."

Of course, Williams was an odd ball out at Cambridge, as Eagleton tells us, for Williams came from "a rural working-class community in Wales to [teach at] a college which seemed to judge people by how often they dined at High Table." Eagleton continues: "He looked and spoke more like a countryman than a don, and had a warmth and simplicity of manner which contrasted sharply with the suave, off-hand style of the upper-middle-class establishment." Hearing his extraordinary lectures at Cambridge was a "personal liberation" for Eagleton, who was a direct student of Williams.
Guess what? At Cambridge, as Eagleton further tells us, Williams used to wear relatively routinely the flat cap and the farmer's boots he loved so much, while of course there were "the predictable friendly-malicious comments" about his "odd" boots and cap, the kind of talk Williams himself "saw as sickness." Mark what Williams had to say about Cambridge at one point (in a fine obituary of F.R.Leavis): "[Cambridge] was one of the rudest places on earth...shot through with cold, nasty and bloody-minded talk."

But Williams remained Williams. Never wavered. As Eagleton puts it: "I think everyone who met Williams was struck by what I can only call his deep inward ease of being, the sense of man somehow centred and rooted and secure in himself at a level far beyond simple egoism." He never forgot that his father was a railway signalman. And, for Williams, tragedy didn't have to do with the death of kings and princes but with the death of the "ordinary" people like his own father.

Of course, because of the rigor, richness, and unsettling character of his work--work that at one point decisively radicalized and transformed what's called "Cultural Studies"--Williams was not really ignored yet not fully accepted by his colleagues at Cambridge. He was an insider yet an outsider. "That he he was at once ordinary and exceptional was one of the many paradoxes about him," maintains Eagleton.

Finally, Eagleton on Williams thus: "Though Williams was personally the most generous and humble of men, with a warmth so radiant as to be almost tangible, it was perhaps [this] 'historicity which helped more than anything to divide him from his colleagues. They were individual dons, working on this or that; his work was an historic project, of an intensely personal yet strangely impersonal kind. He had a quite extraordinary sense of the overall consistency of that work, and of the life in which he was rooted. He lived his life deliberately, vigilantly, as a committed act or coherent task. Others may write a book or two or even twenty, but Williams was engaged on a different sort of enterprise altogether." That enterprise was deeply informed by his unwavering commitment to common, ordinary people and to our hope for building a better, new world. And it was Williams who could say, as he did: ""To be truly radical is to make hope possible rather than despair convincing."

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

পুরুষতন্ত্রের তোমরা যারা - আজফার হোসেন

পুরুষতন্ত্রের তোমরা যারা - আজফার হোসেনের অনুবাদ

5:34 AM Editor 0 Comments


পুরুষতন্ত্রের তোমরা যারা - আজফার হোসেন

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Yes, I keep returning to the Charyapada, considered to be songs of realization, or even "mystical poems," in the "Vajrayana...

A Note on the Charyapada

4:11 AM Editor 0 Comments

Yes, I keep returning to the Charyapada, considered to be songs of realization, or even "mystical poems," in the "Vajrayana" tradition of Buddhism--songs that were produced in "early" Bengali (and in other languages as well) between, roughly, the eighth and twelfth centuries.

Those self-absorbed aesthetes in our parts of the world--ones who stubbornly harbor the idea that "theory" blemishes, damages, or disfigures "creative" works--might see, if they want to see of course, how the Charyapada themselves enact an easy dialectic between "ars theoria" and "ars poetica."

So is it really possible to theorize pointedly or even elaborately in the space of a single song? The Charyapada would answer in the affirmative again and again. Indeed, one of their persistent theoretical preoccupations is the body (দেহতত্ত্ব)--the body as a site of struggles, material and metaphorical (unlike today's post-structuralist body-fetishism of course).

Here's a couplet from the Charyapada, one which is about how the body as an overdetermined material microsite relates dialectically to aquatic and celestial bodies and to nature at large:

এথ্থু সে সুরসুরি জমুণা এথ্থু সে গঙ্গাসাঅরূ।
এথ্থু পআগ বণারসি এথ্থু সে চন্দ দিবাঅরূ।।
[এই দেহেরই মধ্যে সরস্বতী যমুনা। গঙ্গাসাগরও এই দেহের মধ্যে। এইখানেই প্রয়াগ বারাণসী। চন্দ্রসূর্যও এই দেহের মধ্যে]

And this one concerns the relationships between the body and the truth, between the body and knowledge, even supreme knowledge:

পণ্ডিঅ সঅল সত্য বকখাণই।
দেহহি বুদ্ধ বসন্ত ণ জানই।।
[পণ্ডিতেরা বাইরে থেকেই সত্যের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। দেহের মধ্যেই যে পরম জ্ঞান বিরাজ করছে, তার খবর তো তারা জানেন না।]

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Azfar Hussain Speaks on the Significance of Fidel Castro from "Tri-Continentalist" Perspectives

Azfar Hussain Speaks on the Significance of Fidel Castro

3:06 AM Editor 0 Comments


Azfar Hussain Speaks on the Significance of Fidel Castro from "Tri-Continentalist" Perspectives

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

নজরুলের কাজের কিছু উপেক্ষিত--এবং তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত--দিক নিয়ে মোটা দাগে এবং সংক্ষেপে কয়েকটা কথা আবারও না বলে পারছি না। প্রথমত, ভাবকে ক...

On Nazrul by Azfar Hussain

10:11 AM Editor 0 Comments

নজরুলের কাজের কিছু উপেক্ষিত--এবং তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত--দিক নিয়ে মোটা দাগে এবং সংক্ষেপে কয়েকটা কথা আবারও না বলে পারছি না।

প্রথমত, ভাবকে কোনোভাবেই ভারাক্রান্ত না করে কবিতায় কি করে রাজনৈতিক অর্থনীতির 'ট্রোপ' এবং পদ ও বর্গকে অনায়াসে জারি রাখা যায়, তা নজরুল দেখিয়ে গেছেন। "কুলিমজুর" এবং "কৃষাণের গান" কবিতায় এমনকি মার্কসের মূল্যতত্ত্বকে স্বচ্ছন্দে কবিতার ভাষায় অনুবাদ করেছেন নজরুল। তবে এইগুলো একমাত্র উদাহরণ না।

দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন অর্থে নজরুল 'জাতীয়' হলেও কম্যুনিস্ট বলেই (তত্ত্বের তত্ত্ববাগিশ 'কম্যুনিস্ট' না, সৃষ্টিশীলভাবেই কম্যুনিস্ট) তিনি দারুণভাবে আন্তর্জাতিকতাবাদী। আর তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ--একমাত্র না হলেও--অংশ হচ্ছে তাঁর বিশ্বসাহিত্যভাবনা। নজরুল ওই তথাকথিত 'বিশ্বসাহিত্য'-এর আধিপত্যবাদী 'বিশ্ব'কে আগেভাগেই ঠিকঠাক চিনে নিয়েছিলেন। এদিক থেকেও তিনি 'তিরিশ'-এর ওইসব 'পণ্ডিত'-কবির চেয়েও আলাদা। এমনকি তিনি যে পোলিশ লেখকদেরও মনোযোগ দিয়ে পড়তেন, তার প্রমাণ মেলে তাঁর লেখা "বর্তমান বিশ্ব সাহিত্য" প্রবন্ধে, যে-প্রবন্ধ বর্তমান সময়ের তাগিদেই আমাদের পুনর্পাঠ দাবি করে বলে আমি মনে করি।

তৃতীয়ত, আরবি-ফার্সি সাহিত্যে নজরুলের যে কেবল অসাধারণ দখল ছিল তাই না। তিনি একাধিক আরবি-ফার্সি ছন্দকে বিস্ময়করভাবে এবং অনায়াসে বাংলা কবিতায় ব্যবহার করেছেন। ছন্দগুলো হচ্ছে-- 'মোতাকারিব', 'মোতদারিক', 'হজয, 'রজয', 'মাশাকেল' ইত্যাদি। এভাবে তিনি বাংলা কবিতার ছন্দের ইতিহাসে নজিরছাড়া ঘটনা ঘটিয়ে গেছেন।

এছাড়া নজরুলের কবিতায় এবং গানে 'গজল' ফর্মের সৃষ্টিশীল ব্যবহার নিয়ে তেমন কাজ হয় নাই। এই প্রসঙ্গে এও বলা দরকার, নজরুল যে কেবল আরবি-ফার্সি কবিতার--বিশেষ করে হাফিজ এবং খৈয়াম-এর কবিতার--সেরা অনুবাদ করেছেন তাই না; তিনি এমনকি কুরআন থেকেও অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর 'সুরা ফাতিহা' আর 'সুরা ইখলাস'-এর অনুবাদ একই সঙ্গে এতই বিশ্বস্ত এবং এতই সুন্দর যে, মনে হয় নামাজে দাঁড়িয়ে মূল আরবির বদলে তাঁর তর্জমায় সুরা পাঠ করলে নজরুলের ভাষায় "পরম সুন্দর" আল্লাহ বোধ হয় অখুশি হবেন না। আরেকটা কথাঃ কেউ কেউ হয়ত জানবেন যে, হজরত আলীর একটা বা দুটো সুফি কবিতাও নজরুল অনুবাদ করেছিলেন এক সময়।

চতুর্থত, এটাও ঠিক যে, নজরুল সংস্কৃত সাহিত্যও অধ্যয়ন করেছিলেন কিছুটা, যেমন তিনি গীতা থেকে অবলীলায় শ্লোক বলতে পারতেন। এমনকি নজরুল নিজেকে কেবলই 'মোসলমান' ভাবেন নাই। ভুয়া নাস্তিকতা আর ইসলামের নামে ভুয়া 'ধর্ম'চর্চার বিরুদ্ধেই ছিল তাঁর বিদ্রোহী ও বৈপ্লবিক মানবতাবাদী অবস্থান। যেমন তাঁর অবস্থান ছিল--বলাই বাহুল্য--পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, এক অর্থে বর্ণবাদ এবং পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধেও। মউলানা ভাসানী--নজরুলের সঙ্গে তাঁর একধরনের আত্মার সম্পর্কই ছিল বটে--এই কথাটা বলেছিলেন এক সময়ঃ "পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, রাষ্ট্র এবং শ্রেণির প্রশ্ন উহ্য রাখিয়া যাহারা দেশ ও দুনিয়ার জুলুম ও অবিচারের কথা বলিয়া চোখের পানি ফেলেন আর কাতর হন, তাহাদের আপাতদৃষ্টিতে দরদী মনে হইলেও তাহারা আসলে জুলুম আর অবিচারের পক্ষেই অবস্থান নেন।" নজরুলের কাজের সমগ্র বিবেচনায় রাখলে ভাসানীর ওই কথাটা নজরুলেরও হতে পারে। আর যারা ভাসানীর তোলা ওইসব প্রশ্নকে গায়েব করে নজরুলের কাজের রাজনৈতিক বিবেচনায় বসেন, তারা আসলেই একই সঙ্গে নজরুলের প্রতি এবং শোষিত মানুষের প্রতি অবিচারই করেন।

পঞ্চমত, নজরুলের সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বের--এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার--একদল লড়াকু এবং বিল্পবী কবির মতাদর্শিক, রাজনৈতিক এবং এমনকি নান্দনিক মিল লক্ষ্য না করে উপায় নাই। বিশেষ করে বলতে হবে ক্যারিবীয় কবি এমে সেজায়ার, তুর্কী কবি নাজিম হিকমত, লাতিন আমেরিকার কবি রোকে ডালটন ও ওতো রেনে কাস্তিয়ো, কোরিয়ার কবি কিম চি হা, উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এবং এমনকি ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ-এর কথা। এই ফর্দটা মোটেই সম্পূর্ণ না। আরও আছেন। তবে এঁদের সকলের আগেই এঁদেরকেই যেন নজরুল প্রতিনিধিত্ব করেছেন একজন বিপ্লবী এবং উপনিবেশবাদবিরোধী কবি হিসাবে। তৃতীয় বিশ্বের ওইসব কবির আগেই ইতিহাসের লড়াকু ময়দানে নজরুল উপনিবেশবাদের শৃঙ্খল থেকে একেবারে পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। আমার প্রিয় লেখক, বন্ধু এবং কমরেড--আফ্রিকার অন্যতম ঔপন্যাসিক-নাট্যকার-তাত্ত্বিক--নগুগি ওয়া থিওঙ্গো'র সঙ্গে নজরুল নিয়ে বেশ কথা হয়েছিল। আর নজরুলকে নিয়ে আমার কথা শোনার পর তিনি নির্দ্বিধায় বলে উঠেছিলেন, "কমরেড! নজরুল আমার প্রাণের কবি, এমনকি আমাদের আফ্রিকারও কবি।"

ষষ্ঠত, না বলে পারছি না যে, তুলনামূলক সাহিত্য আমার কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যদিও জানি যে, এখনও ওই এলাকা বেশ ইউরোপকেন্দ্রিক। আর বুদ্ধদেব বসু-সুধীন দত্তদের হাতে তুলনামূলক সাহিত্য ইউরোপকেন্দ্রিক-ই থেকেছে। আর সেই ইউরোপকেন্দ্রিকতা থেকেই নজরুলকে বায়রন, শেলি আর হুইটম্যানের সঙ্গে হরহামেশা তুলনা করার রেওয়াজ থেকে গেছে, যেন ইংরেজি-মার্কিন সাহিত্যের এইসব সাদা মহারথির সঙ্গে নজরুলের তুলনা না করলে নজরুল জাতে উঠেন না! হায়রে, ঔপনিবেশিক হীনম্মন্যতা! এই হীনম্মন্যতাকে নজরুল ঘৃণা করতেন। তবে তুলনামূলক সাহিত্যের বিউপনিবেশিকীকরণের স্বার্থেই নজরুলের সঙ্গে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার কবিদের মিল খোঁজায় উপনিবেশবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক রাজনীতির জন্য একেবারে নগদ লাভ আছে বলে মনে করি।

অবশ্যই নজরুলের কাজের আরও উপেক্ষিত দিক আছে, যেমন আছে তাঁর কাজের অসংখ্য দিক। আমি এইখানে তাঁর কাজের তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত মাত্র কয়েকটি দিকের নিচে মোটা দাগ দিয়েছি, তার বেশি কিছু নয়। তবে এইসব দিক এবং আরও কিছু দিক নিয়ে নজরুলের ওপর একটা পুরা বই লেখার খায়েশ আমার দীর্ঘ দিনের। গতবার ঢাকায় থাকতে কাজ শুরুও করেছিলাম। ধীরে হলেও কাজ এখনও চলছে।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Derek Walcott received the Nobel Prize in Literature in 1992 for his unique contribution to English poetry and drama. 1 Derek Walcott—one ...

Derek Walcott: “Absolutely a Caribbean writer” - Azfar Hussain

5:25 AM Editor 0 Comments

Derek Walcott received the Nobel Prize in Literature in 1992 for his unique contribution to English poetry and drama.

1
Derek Walcott—one of the greatest Caribbean poets and playwrights—died on March 17 in Saint Lucia, his birthplace, aged 87. His death was rightly seen as “a loss to language” by one of his biographers. Indeed, language itself was his home as much as his own island Saint Lucia, which he once memorably described as “the territory of metaphor.”
I met Derek Walcott briefly back in 1995 in Boston. It was the first US city where I lived. In my late twenties, I was then a Fulbright Fellow assigned to what they called a “serious orientation about American education” prior to beginning my graduate studies at a university outside Boston. So I was dividing my time between Boston University (BU) and Harvard. Walcott was then a professor of creative writing at BU, while his good friend Seamus Heaney—the Irish poet—was teaching at Harvard.
I made several failed attempts to meet Walcott. But when I finally got an appointment, I was more than thrilled. I was already blown away by his “throbbing and relentless lines [that] kept arriving in the English language like tidal waves,” to use his friend Joseph Brodsky’s words. Also, by then, I had published in my mother tongue probably the first full-length essay on Walcott in Bangladesh.
But our meeting in Boston was disappointingly brief. I’m not sure if I could call it a conversation. But Walcott rather casually said a few serious things that I still vividly recall. First: “I love the English language.” And, then, something to this effect: The task of the poet is to name the nameless. I think Walcott’s poetic journey has been one of, among other things, naming the nameless in an exuberant, even explosive, energetic, evocative, richly sensuous language grasped in its intimate cadence. And to name the nameless, particularly against the backdrop of massive colonial ruins, is also to register resistance—simultaneously a poetic and political practice for Walcott.
2
Caribbean poetry by now traverses an inordinately vast and diverse terrain. Yet it is easy to identify Walcott as a major, distinctive voice in the Caribbean. Poet, playwright, painter, producer, director, theatre organiser, even set designer, newspaper columnist, cultural critic, and teacher, Walcott had been relentlessly active and productive for nearly five decades. He wrote more than 25 poetry collections and over 80 plays.
Given the staggering range and rigour and richness of Walcott’s work, it is impossible to do justice to the significance of his contributions in a very short piece like this one. All I can do is quickly comment on just a few aspects of his poetic work.
Of both African and European descent, Walcott resolutely identified himself as “absolutely a Caribbean writer,” to use his own words. Indeed, his creative work as a whole is nothing without the Caribbean, its “ordinary” people, its vibrant landscapes, its own languages, and its own music.
True, Walcott had a lifelong fascination with the Western literary canon, consisting of figures from Homer to Dante to Shakespeare and Milton to Defoe to Pound and Eliot to even Robert Lowell. Walcott heavily and even unapologetically borrows from this canon. But then he creatively Caribbeanizes it. This is variously exemplified in his work ranging from, say, his early collection In a Green Night (1962), through his Homeric epic poem Omeros (1990), to his collaborative work Morning, Paramin (2016).
What, in my reckoning, fundamentally characterises Walcott’s entire poetic work is his epic imagination jazzed up by his characteristic dramatic mode and his peculiarly poetic sense of history that remains organically tied to the Caribbean.
Walcott’s narrative scale and amplitude, luxuriant layering of details, constellations of memories and metaphors, and the generosity of vision represented by his characters, among other things, immediately attest to his epic imagination. Of course this is powerfully evident in his Omeros—an epic poem of more than eight thousand lines that demonstrate what Dante’s terza rima can do in Walcott’s hands to reproduce the “music of the sea.” His epic imagination also variously informs and inflects a number of his other poetic works, such as Another Life (1973), The Star-Apple Kingdom (1979), The Fortunate Traveler (1981), and Midsummer (1981). Even in his plays and shorter poems, it is at work one way or another.
Walcott’s epic imagination has a deep political resonance as well. Its power resides in resisting the kinds of closures and constraints colonial and neo-colonial institutions and practices impose on the colonised. Its power also lies in re-telling a “history” of the dispossessed against the grain of colonial narratives.
A few words about Omeros. I think this work is an exemplary answer to the question “Is the epic dead?” Although I am aware that Walcott at one point denied any epic pretensions, I submit that he is almost singularly responsible for resurrecting, rewriting, and refashioning the epic in the late twentieth century, despite MM Bakhtin’s early declaration of the epic’s death. Indeed, Walcott creates a new kind of epic for our times. But here is a question: Can common, “ordinary,” ostensibly unheroic people be the epic heroes or epic characters? Walcott’s Omeros itself is a powerful answer in the affirmative.
Exemplary of his massive web of affiliations not only to the Western literary canon but also to literary works from the Caribbean, Africa, Latin America, and even Asia (his “tri-continental” connections are yet to be adequately explored in contemporary Walcott criticism, I think), Omeros—consisting of seven books with a total of sixty-four chapters having three sections each—decisively foregrounds Caribbean fishermen and peasants and poor women.
The epic’s peasant characters like Philoctete and Ma Kilman readily come to mind, as do his fishermen characters—Achille and Hector. Although there is no singularly central character in his epic, I think the island of Saint Lucia itself may be reckoned as a central character that comes to be represented by none other than the housemaid Helen. Walcott both narrates and dramatises the daily dialectics of their living—their ways of seeing, their ways of believing, their ways of being and even becoming—while deftly domesticating their dialects and even mobilising their wit, humour and verbal playfulness.
Walcott’s own poetic sense of history is also resonant on various registers in his epic, as it is in many of his earlier works. He makes the point that the real protagonists of history are not just a few “noble” individuals and leaders, but common, ordinary people themselves. For him history is not only a matter of the past but also a matter of the present—history is not in a state of being but in a process of becoming. Further, he explicitly spells out how the notion of “linear progress” in history is nothing but a “dirty joke.” Mark then the following lines from even his earlier work (“The Schooner Flight”):
I was at the wheel, Vince sitting next to me
gaffing. Crisp, bracing day. A high-running sea.
“Progress is something to ask Caribs about.
They kill them by millions, some in war,
some by forced labor dying in the mines
looking for silver, after that niggers; more
progress. Until I see definite signs
that mankind change, Vince, I ain’t want to hear.
Progress is history’s dirty joke.
Ask that sad green island getting nearer.”
But Walcott’s epic focuses not only on the history of Caribbean peasants and fishermen and poor women, but also on Native Americans in the US and the marginalised in Ireland and even Europe. I think Walcott’s scope here bespeaks his brand of internationalism which is more than today’s trendy cosmopolitanism. It is not for nothing that Omeros was already characterised as an “epic of the dispossessed”—an epic of those people whose lives are struggles and love made visible. I like this particular Walcott the most—the Walcott of the epic of the dispossessed. I also like to think that his Omeros is by far his most monumental achievement, with which Walcott has phenomenally extended the tradition of his great Caribbean predecessors—Saint-John Perse and Aimé Césaire.
I cannot help pointing out in passing that while I relish the kind of earthy peasant humour we find in Omeros, I also enjoyed the way Walcott had once made fun of VS Naipaul, calling him “VS Nightfall,” while offering such lines as: “I have been bitten. I must avoid infection. /Or else I’ll be as dead as Naipaul’s fiction.” It is also true that over the years I have been critical of some of Walcott’s glib utterances surrounding the questions of anti-racist and gender politics in the US. But I will save my critique of Walcott’s politics for another occasion. For now, however, I cannot but place Walcott in the company of my own favourite poets such as WB Yeats, Pablo Neruda, and Aimé Césaire—a constellation of poets Walcott himself deeply admired.

Azfar Hussain is a prominent Bangladeshi poet, translator and intellectual who writes in both Bangla and English. He is vice president of the Global Center for Advanced Studies (GCAS) and GCAS Professor of English, World Literature and Interdisciplinary Studies. He is also associate professor of Liberal Studies/Interdisciplinary Studies at Grand Valley State University in Michigan, USA. He has published — in both English and Bengali — hundreds of academic and creative pieces, including translations from several non-western languages. He has written on a wide range of topics in such areas as “third world” Marxisms, critical theory, cultural politics, political economy and theories and practices of interdisciplinarity.

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

স ম্প্রতি পশ্চিমা মুলুকে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমালোচনায় সম্পর্ক স্থাপনের বিচিত্র উৎসব লক্ষ্য করা যায়। ‘সম্পর্কই সত্য’­­─এমন এক মতাদর্শের বিস্ত...

বিশ্বসাহিত্যের রাজনীতি : গ্যেটে ও একটি চিঠির পঠন - আজফার হোসেন

2:05 PM Editor 0 Comments

ম্প্রতি পশ্চিমা মুলুকে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমালোচনায় সম্পর্ক স্থাপনের বিচিত্র উৎসব লক্ষ্য করা যায়। ‘সম্পর্কই সত্য’­­─এমন এক মতাদর্শের বিস্তার ও বৈভব ওইসব সমালোচনায় চট করেই চোখে পড়ে। বছর তিনেক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সাহিত্য সম্মেলনে জর্মন চিন্তক আর্নস্ট ব্লখ এবং স্লোভানিয়ার সংস্কৃতি তাত্ত্বিক স্লাভো জিজেকের দোহাই পেড়ে এক তরুণ সমালোচক আমাদের জানিয়েছিলেন যে, সাহিত্য ও সংস্কৃতি পঠনের কাজ হচ্ছে নতুন নতুন সম্পর্ক স্থাপন করা। ওই সমালোচক অবশ্য নিজের মতো করেই সেই কাজটি করেছিলেন; বেশ উৎসাহ নিয়েই তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন কি করে একজন আর্নস্ট ব্লখ তার কাজে বলশেভিক রাজনীতির সঙ্গে ইহুদি অধ্যাত্মবাদ আর ক্যাবালিস্ট পঠনতত্ত্বের দারুণ সংমিশেল ঘটান কিংবা কি করে একজন স্লাভোজ জিজেক হেঁচকা টানে হেগেল ও হিচকককে বা প্লেটো ও পতঞ্জলিকে একই সমতলে নিয়ে আসেন। একটি জাপানি হাইকু, একটি চৈনিক আইডিয়োগ্রাম, একটি মার্কিন ইমোজিস্ট কবিতা ও একটি ফার্সি রুবাই কীভাবে পঠনের ভেতর দিয়েই তাদের নান্দনিক সম্পর্কগুলো স্থাপন করে তা নিয়ে খানিকটা আলোচনাও করেছিলেন ওই তরুণ সমালোচক। আর তার আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘বিশ্বসাহিত্য ও সম্পর্কের কার্নিভাল।’

কিন্তু সম্পর্ক স্থাপনের কাজটি মোটেই নিরীহ নয়, কেননা সম্পর্ক স্থাপনে যে মধ্যস্থতার প্রয়োজন পড়ে তা বিভিন্নভাবেই পরিপ্রেক্ষিতনির্ভর মতাদর্শিক অভিক্ষেপকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্দেশ করে বটে। অর্থাৎ যে প্রশ্নগুলো এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায় সেগুলো হচ্ছে─ কার সঙ্গে কার সম্পর্ক? কিসের সম্পর্ক, কী ধরণের সম্পর্ক? আর সম্পর্ক স্থাপনে মধ্যস্থতা করছে কে বা কারা অথবা কোন বিষয়? সময় ও পরিসর, ঐতিহাসিকতা ও ভৌগোলিকতাও সম্পর্ক স্থাপনে বা সম্পর্কের ধরন নির্ণয়ে কাজ করে থাকে। অঙ্কশাস্ত্র এবং দর্শন নিয়ে একটা ঠাট্টা প্রচলিত আছে। সেটা হলো─ অঙ্কশাস্ত্র হচ্ছে সেই খেলা যার নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও নিয়ম-কানুন আছে কিন্তু উদ্দেশ্য নেই। অন্যদিকে দর্শন হচ্ছে সেই খেলা যার উদ্দেশ্য আছে কিন্তু নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও নিয়ম-কানুন নেই। অবশ্যই এ ক্ষুদে ঠাট্টা দিয়ে অঙ্কশাস্ত্র ও দর্শনের তাবৎ স্বরূপকে বোঝানো হচ্ছে না মোটেই। তবে ঠাট্টায় ব্যবহৃত রূপকটা খেয়াল করার মতো, সে রূপকটা হচ্ছে খেলা। এবং খেলা বা লীলা আবার সম্পর্ক স্থাপনকেই নির্দেশ করে এমনিভাবে যে, সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে নিরীহ ঠেকে না। অঙ্কশাস্ত্র প্রসঙ্গে ইউরোপীয় আলোকায়ন প্রকল্প বরাবরই প্রচার করেছে যে, সংখ্যার সঙ্গে সংখ্যার যৌক্তিক সম্পর্ক নির্মাণ করে অঙ্কশাস্ত্র, তা নৈর্ব্যক্তিক, মতাদর্শনিরপেক্ষ। হাল আমলে এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে─ একবার নয়, একাধিকবারই। এ প্রসঙ্গে আমার বিশেষ করে মনে পড়ছে একটি সাম্প্রতিক গ্রন্থের কথা, যার শিরোনাম এথনোম্যাথেমেটিকস্‌। বইটি বেশ কয়েকটি অঙ্কবিষয়ক প্রবন্ধের সংকলন। আর সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন আর্থার পাউয়েল ও ম্যারিলিন ফ্যাংকেনস্টাইন। বইটির একাধিক প্রবন্ধে একাধিক বিষয়ের মধ্যে যে দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো─ এক. অঙ্কশাস্ত্রের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে যা তা হচ্ছে সম্পর্ক এবং তার বিন্যাস ও বিস্তার। দুই. এ সম্পর্ক মোটেই মতাদর্শনিরপেক্ষ নয়, কেননা বিশেষ বিশেষ গাণিতিক যুক্তিকে বিশেষ বিশেষ দিকে চালনা করার ক্ষেত্রে আঙ্কিক স্বতঃসিদ্ধগুলো ঐতিহাসিকভাবে উৎপাদিত মতাদর্শিক ঝোঁককে প্রকাশ করে থাকে। বইটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে এটা প্রমাণ করা যে, অঙ্কশাস্ত্র নিজেই কয়েক শ’ বছর ইউরোপকেন্দ্রিক মতাদর্শিক আধিপত্যকে লালন করেছে।

তাহলে এমনসংখ্যাও কি নিরীহ নয়, সংখ্যার সম্পর্কও নিরীহ নয়, ‘বিশ্ব সাহিত্য তো নয়-ই। কিন্তু কি এই ‘বিশ্বসাহিত্য?’ কোন বিশ্ব? কার বিশ্ব? কোন সাহিত্য ? কার সাহিত্য? এ প্রশ্নগুলোর ইতিহাস আছে, যে ইতিহাসে ইউরোপীয় ধ্যানধারণার ভূমিকা আছে, আছে তাদের মতাদর্শিক আধিপত্যের বিষয়টি, যা বোঝার জন্য আমরা ইউরোপীয় সাহিত্যের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল প্রশংসিত ব্যক্তিত্বের কাছে যেতে পারি। তিনি হলেন অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর জর্মন কবি-নাট্যকার-ঔপন্যাসিক-চিত্রকর-তাত্ত্বিক-বিজ্ঞানী যোহান উলফগ্যাংগ ফন গ্যয়েতে (বা ‘গ্যেটে’; আমি ‘গ্যেটে’ বানানটাই ব্যবহার করব)।

না, গ্যেটের সবচেয়ে পরিচিত কাজ ফাউস্ট নিয়ে এখানে আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয় অথবা গ্যেটের অন্যান্য কবিতার মূল্যায়নও আমার লক্ষ্য নয়। তবে যে কথাটা এখানে চট করে বলে নিতে চাই তা হলো, ‘বিশ্বসাহিত্য’ বর্গটি (জর্মন Weltliteratur) প্রথম যিনি আবিষ্কার করেছিলেন তিনিই হলেন গ্যেটে। আর যার সুবাদে ওই বর্গটি প্রকাশিত হয়েছিল তিনি হলেন গ্যেটের তরুণ শিষ্য যোহান পিটার একেরমান। বলা দরকার, বিভিন্ন সময়ে গুরুর সঙ্গ শিষ্যের সাহিত্য নিয়ে লিখে আলোচনা হতো। এসব আলোচনার চমৎকার বিবরণ আমরা একেরমানের কাছ থেকেই পেয়েছি। একেরমানের বিবরণ মোতাবেক তাদের আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল জার্মানির বাইরের সাহিত্য। গ্যেটে যে বইগুলো ইংরেজি, ফরাসি, ইতালীয় ও লাতিন ভাষায় পড়তেন, সেগুলো তার তরুণ শিষ্যকেও পড়ার জন্য বারবারই উপদেশ দিতেন এবং অনুবাদেও সাহিত্য পড়ার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল গ্যেটের। শুধু জর্মন সাহিত্য পাঠে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা মোটেই যথেষ্ট নয়, জাতীয় সীমান্তের বাইরেও যেতে হবে─ এ বোধটা তার শিষ্যের মধ্যে জাগানোর ক্ষেত্রে বেশ সচেষ্ট ছিলেন গ্যেটে। অবশ্যই বলা যাবে যে, শেক্সপিয়ার নিয়ে গ্যেটের অভিভব ছিল; তিনি একেরমানকে বলতেন শেক্সপিয়ারের ‘অনন্ত বৈভব ও ঐশ্বর্য’─ এর কথা। তিনি বলতেন ফরাসি নাটকের নৈপুণ্যের কথা। ইতালীয় সাহিত্যের পাঠ তাকে আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত করেছে বারবারই। এভাবে গ্যেটে দেশের বাইরে বেরিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু গোল বাধে তখনই যখন তিনি মহাদেশের অর্থাৎ ইউরোপের বাইরে বেরিয়ে পড়েন। বিষয়টি খানিকটা তলিয়ে দেখা যাক।

১৮২৭ সালের ২৯ জানুয়ারি একেরমানের সঙ্গে গ্যেটের কথপোকথনে যে বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছিলো সেগুলোর মধ্যে একদিকে যেমন ছিল সমকালীন ফরাসি কবিতা এবং হোরেসের লাতিন কবিতা, অন্যদিকে তেমনি ছিল হাফিজের ফার্সি কবিতা। ফরাসি থেকে ফার্সিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে গ্যেটের প্রাচ্য নিয়ে আগ্রহ ও ক্ষেত্রবিশেষে অভিভবের লক্ষণ শনাক্ত করেছেন একেরমান নিজেই। কিন্তু ওই বিশেষ কথোপকথনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল তা ছিল একটি ভাষান্তরিত কবিতা─ জর্মন ভাষায় একটি সার্বীয় কবিতা, যার প্রশংসায় গদগদ ছিলেন গ্যেটে।

কিন্তু ইউরোপ থেকে বেরিয়ে পড়ার বোধ কবি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটল তখনই যখন গ্যেটে প্রায় উন্মাদের মতো চীনা সাহিত্য পড়া শুরু করলেন। এ যেন এক মহাদেশ আবিষ্কারের আনন্দ! বিশেষ করে একটি চৈনিক উপন্যাস তার মনোযোগকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। কিন্তু ওই আনন্দ ও মনোযোগেরও সীমানা-ঠিকানা নির্ধারিত হয় গ্যেটের জর্মন জাতীয়তাবাদী চশমার চোখে। গ্যেটের প্রতিক্রিয়া এমন; চীনা সাহিত্য উৎকৃষ্ট ‘আমাদের’ সাহিত্যের মতোই; চীনারা তো ‘আমাদের’ (জর্মনদের) মতোই চিন্তা করে, অনুভব করে। এভাবেই চীনাদের সঙ্গে জর্মনদের সম্পর্ক স্থাপন করতে আগ্রহী হন গ্যেটে। এখানে আরো উল্লেখযোগ্য এই যে, গ্যেটে নিজেই নিজের কাজ হারমান অ্যান্ড ডরোথিয়া ও রিচার্ডসনের ইংরেজি উপন্যাসের সঙ্গে ওই চীনা উপন্যাসের তুলনা করেন এবং এ আবিষ্কারের আনন্দে বগল বাজাতে থাকেন। বলা দরকার, বিশ্বসাহিত্যের আরেক নাম যে ‘তুলনামূলক সাহিত্য’ সেই ইঙ্গিতটাও খানিকটা পাই গ্যেটের কাছ থেকেই এবং রবি ঠাকুরের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘বিশ্বসাহিত্য’─এ গ্যেটে এই ধারণার খানিকটা আবেগস্পন্দিত মহড়া আমরা লক্ষ্য করি বটে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

চীনা উপন্যাস নিয়ে আগ্রহ, আনন্দ ও ক্ষেত্রবিশেষে অভিভবের পরিপ্রেক্ষিতেই এবং ‘তুমি ভালো কেননা তুমি আমার মতোই’ এই বোধ বা মূল্যায়নে আন্দোলিত হয়েই গ্যেটে ওই ১৮২৭ সালে ‘বিশ্বসাহিত্য’ বর্গটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন। একেরমানকে লেখা এক চিঠিতে গ্যেটে বলেন এভাবে; ‘জাতীয় সাহিত্য এখন একটি অর্থহীন বর্গ। বিশ্বসাহিত্যের যুগ আসন্ন এবং এর আগমনকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে সবাইকেই সচেষ্ট হতে হবে।’

অবশ্যই বলতে হবে, জর্মন সাহিত্য নিয়ে গ্যেটে যে সব সময় তৃপ্ত ছিলেন তা নয়। এও বলা দরকার যে, আন্তর্জাতিকতাবোধের ওপর গ্যেটে জোর দিয়েছেন বরাবরই। সাহিত্য উৎপাদনের স্বার্থেই সাহিত্যের পঠনের দিগন্তকে সম্প্রসারিত করার তাগিদ গ্যেটের কাছে থেকেই পাই। তবে গ্যেটে যেখানে থামেন, সেখানে অগ্রসর হন মার্কস ও এঙ্গেলস্‌। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে তারা কেবল বিশ্বসাহিত্যের আগমনের কথাই বলেন না। আরো বলেন, পুঁজির জাতীয় সীমান্তবিরোধী বা বিধ্বংসী লজিক ওই বিশ্বসাহিত্যকে বা বুর্জোয়া বিশ্বসাহিত্যকে অনিবার্য করে তুলেছে। অন্য কথায়, পুঁজির রাজনৈতিক অর্থনীতির বিচার ছাড়া বিশ্বসাহিত্যের স্বরূপ বা রূপ বোঝা সম্ভব নয়। পুঁজি যেমন নিজের সঙ্গে শ্রমকে, স্থানের সঙ্গে স্থানকে সম্পর্কিত করে, ঠিক তেমনি সাহিত্যের সঙ্গে সাহিত্যকেও সম্পর্কিত করার ভেতর দিয়ে পুঁজি বিশ্বসাহিত্যকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। পুঁজি শ্রম শোষণ করে যেমনি, তেমনি সাহিত্যও সাহিত্যকে শোষণ করতে পারে। সব ক্ষেত্রেই আমরা কেবল সম্পর্কের বিস্তারই লক্ষ্য করি না, আমরা আরো দেখি অসম উৎপাদন-সম্পর্কেরও অসম ক্ষমতা-সম্পর্কের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন। এসব বিষয় বেরিয়ে আসি কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর পুনর্পঠনের ভেতর দিয়ে।

কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতি গ্যেটের অভিনিবেশের এলাকা ছিল না, থাকার তেমন কারণও নেই, যদিও বিভিন্ন এলাকায় গ্যেটের অসাধারণ ব্যুৎপত্তি এবং অবাধ পরিব্রাজনার কথা আমরা জানি। যে সময় গ্যেটে লিখছিলেন, সে সময় আধুনিক পুঁজিবাদ বেশ বিকশিত এবং ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ পুঁজিবাদেরই বিস্তারী ও ভূমি দখলকারী লজিক হিসেবে কাজ করে চলেছে, যদিও উপনিবেশবাদকে কেবল পুঁজিবাদের ‘টেরিটোরিয়াল লজিক’ হিসেবে বিবেচনা করলে বহু ধরনের তাত্ত্বিক ঝুঁকি থেকে যায়। সেই আরেক প্রসঙ্গ তবে ইউরোপীয় ইতিহাসের এ মুহূর্তে বুর্জোয়া নন্দনতাত্ত্বিক প্রকল্পও বেশি বিকশিত হয়েছে, যার সঙ্গে রয়েছে ইউরোপের পুরো আলোকায়ন প্রকল্পেরই বিভিন্ন লেনদেন। ইতিহাসের এই বহুল-ভারাক্রান্ত মুহূর্তেই গ্যেটে লিখেছিলেন ওই চিঠিটা, যা থেকে একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি এর মধ্যেই পেশ করেছি। এবার ফেরা যাক চিঠির বাকি অংশে। দেখা যাক গ্যেটের আন্তর্জাতিকবোধের মতাদর্শিক লব্ধিগুলো কীভাবে কাজ করে।

একেরমানকে লেখা ওই চিঠিতে গ্যেটে আরো বলেন, ‘যদিও এভাবে আমরা যা কিছু ভিনদেশী তাকে মূল্য দেব, কোনো বিশেষ বিষয়ের প্রতি অন্ধ হয়ে তাকে মডেল হিসেবে ভুল করা ঠিক হবে না। এই মূল্যটা আমরা চীনাদের বা সার্বীয়দের বা ক্যালডেরনকে দেব না। কিন্তু আমরা যদি একটি প্রতিমান (বা মডেল) চাই, প্রাচীন গ্রিকদের কাছেই আমাদের সব সময় ফিরে যেতে হবে, যাদের কাজ মানবজাতির চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতিনিধিত্ব করে। বাদ বাকি সব আমরা ঐতিহাসিকভাবে বিবেচনা করব আর আত্মসাৎ করব যা কিছু উৎকৃষ্ট তাই, যতদূর পারা যায়।’

তাহলে উপরের উদ্ধৃত অংশে কয়েকটি বিষয় বেশ স্পষ্ট হয়ে থাকে। প্রথমত. গ্যেটে পুনরাবৃত্ত ‘আমরা’ কেবলমাত্র শ্বাসাঘাতের বিষয় নয়, সেই ‘আমরা’ অন্যকেও নির্দেশ করে; সম্পর্কিত হয় সেই ‘আমরা’ আবার ‘বাদ বাকি সব’─ এর সঙ্গে। এ সম্পর্ক স্পষ্টতই সমতার সম্পর্ক নয়, তবে ক্ষতমার সম্পর্ক তো বটেই। দ্বিতীয়ত. এই সম্পর্কে গ্যেটের চীনপ্রেমের দৌড় চীন পর্যন্ত নয় মোটেই। তৃতীয়ত. ওই সম্পর্কে শীর্ষস্থানে প্রশ্নাতীতভাবে অধিষ্ঠিত থাকে গ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি। এখানে কেন্দ্র-প্রান্তের অসম ক্ষমতা-সম্পর্কের তুলনাটা চলে আসে; ‘আমরা’ থাকি কেন্দ্রে, ‘বাদ বাকি সব’ থাকে প্রান্তে; গ্রিক সাহিত্য থাকে কেন্দ্রে, অন্য সাহিত্য প্রান্তে। এভাবে ‘নিজ/অন্য’ বা ‘আমরা/তারা’ সম্পর্কগুলো এখানে এক ধরনের প্রতার্কিক বৈধতা অর্জন করে বটে। এখানে বলে নেওয়া দরকার যে, এই ‘আমরা/তারা’ সম্পর্ক একটি তৈরি করা সম্পর্ক, ঐতিহাসিকভাবে উৎপাদিত সম্পর্ক, যা একই সঙ্গে জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্ক। এই সম্পর্কে গ্রিস ও এমনকি মিসরও অনিবার্যভাবেই পাশ্চাত্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

এভাবে পাশ্চাত্যের ডিসকোর্সে─ বিশেষ করে ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় ডিসকোর্সে─ আমরা গ্রিক সভ্যতাকে পশ্চিমা বা ইউরোপীয় সভ্যতার অংশ হয়ে উঠতে দেখি, যদিও এক সময় মিসর ও গ্রিসকে পুবের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। এখানে কৃষ্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক মোফেলকে অসান্তে ও জ্যামাইকান দার্শনিক চার্লস মিলসের কথা উল্লেখ করতে হয়। তাদের মতে, সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার মতোই মিসর ও গ্রিসকে ছিনিয়ে নিয়েছে পশ্চিম; উপনিবেশবাদী আধিপত্যের স্বার্থেই এবং তথাকথিক ‘অসভ্য’ মানুষকে শাসন ও দমন করার লক্ষ্যেই নতুন মানচিত্র, নতুন বিভাজন, নতুন ডিসকোর্স জন্মলাভ করেছে ওই ইউরোপেই। জোর দিয়েই বলা দরকার যে, এগুলো ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী প্রকল্পের প্রতার্কিক অনুশীলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর এসব অনুশীলন যে হেজিমনি তৈরি করেছিল ইউরোপীয় অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে, সেই হেজিমনির বলয় বা দিগন্তের অভ্যন্তরেই অবস্থান করে গ্যেটের ওই চিঠিটা। লক্ষ্যে করুন গ্যেটে কীভাবে ওই চিঠিতে ‘আত্মসাৎ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু কে কাকে আত্মসাৎ করবে? গ্যেটে পরিষ্কারভাবেই জানিয়েছেন যে, তাদের নিজস্ব শ্রেয়সের ধারণা অনুযায়ী তারা অন্যদের যা কিছু ভালো তাই আত্মসাৎ করেতে কুণ্ঠাবোধ করবে না।

ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর জন্য এখানে কয়েকটি কথা বলে নেওয়া দরকার। প্রথমত. এখানে আমি গ্যেটের মাত্র একটি চিঠির এক ধরনের সিমপটোম্যাটিক পঠন অগ্রসর করার চেষ্টা করছি। প্রশ্ন জাগতে পারে, মাত্র একটি ছোট চিঠির পঠনের ভেতর দিয়ে কি গ্যেটের মতাদর্শিক অভিমুখ ও অভিক্ষেপের সমগ্রকে ধরা সম্ভব? মোটেই নয়। কিন্তু এও জোর দিয়ে বলা দরকার যে, গ্যেটের ওই চিঠিটা ছোট হলেও অতো ছোট নয় এই অর্থে যে চিঠিটা একদিকে যেমনি প্রাশ্চাত্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি ওই চিঠির তর্জনি নির্দেশকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পরিসরে শিরোধার্য করেছেন পাশ্চাত্যের একাধিক লেখক ও তাত্ত্বিক, বিশেষভাবে তারা যারা তুলনামূলক সাহিত্যের এলাকায় কাজ করে চলেছেন। সম্প্রতি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক ডেভিড ড্যামরোশ একটি বই লিখেছেন, যার শিরোনাম হোয়াট ইড ওয়ার্ল্ড লিটারেচার ? লক্ষ্য করছি, ড্যামরোশ সাহেব গ্যেটের ওই চিঠির একটি পঠন দিয়ে তার বইটি শুরু করেছেন। তিনি গ্যেটের প্রশংসা করেছেন (গ্যেটের অন্যান্য কাজের প্রশংসা আমিও করি) এবং ক্ষেত্রবিশেষে ড্যামরোশ সাহেব গ্যেটের সমস্যাও চিহ্নিত করেছেন। সেটি হলো গ্যেটের নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক এলিটিজম। কিন্তু শুধুই এলিটিজম? গ্যেটের বক্তব্যের সঙ্গে বিশেষ করে ওই চিঠির বক্তব্যের সঙ্গে ইউরোপীয় প্রতার্কিক অনুশীলনের যে হেজিমনি তৈরী হয়েছিল ঊনিশ শতকে, তা ওই ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী এবং এমনকি প্রাচ্যবাদী ও বর্ণবাদী প্রকল্পের স্বার্থেই, সেই হেজিমনির সম্পর্ক নিয়ে একেবারেই চুপ থেকেছেন ড্যামরোশ সাহেব। এসব কারণেই আমার মনে হয়েছে যে, গ্যেটের ওই মহাপ্রভাবশালী চিঠিটা আবারো পড়া দরকার এবং ধরা দরকার। এখানে এও বলে রাখা প্রয়োজন যে, রবি ঠাকুরের ‘বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে আমরা গ্যেটের আধিপত্যবাদী সম্পর্কতত্ত্বের একটা মহড়া লক্ষ্য করি, যদিও রবীন্দ্রনাথ ওই প্রবন্ধে গ্যেটের নাম সরাসরি উল্লখ করেননি।

দ্বিতীয়ত. আমি একেরমানকে লেখা গ্যেটের চিঠিটাকে একটা ছুতো হিসেবে ব্যবহার করেছি কয়েকটি প্রশ্ন তোলার তাগিদেই। অর্থাৎ আমরা যাদেরকে ক্লাসিক লেখক হিসেবে চিহ্নিত করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি বা যেসব লেখক মহৎ বা সর্বজনীন হিসেবে আমাদের মগজের ভেতর ‘স্থায়ী’ আসন গেড়েছে, তারা আসলেই কতটা মহৎ বা সর্বজনীন? তাদের মতাদর্শিক জায়গাটা বৃহত্তর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দিগন্তের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত? আর যে সম্পর্ক বা যোগাযোগ তৈরি করার ওপর গ্যেটে ও রবীন্দ্রনাথ─ অবশ্য দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক-ভৌগোলিক পরিসরে-জোর দিয়েছেন, সেই সম্পর্ক বা যোগাযোগ কী ধরনের? একজন বিত্তশালী ব্যবসায়ী একজন শ্রমিককে বুকে জড়িয়ে ধরলেই কি সেখানে সম্পর্ক স্থাপিত হয়? আমি মনে করি বিউপনিবেশীকরণের স্বার্থেই বা যে কোন সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের স্বার্থেই ওপরের প্রশ্নগুলো তোলা যায়।

সবশেষে এই বলতে চাই যে, আমি মোটেই ‘ক্ল্যাসিকস’ পড়ার বিরুদ্ধে নই কিংবা আমি গ্যেটের মতো একজন প্রভাবশালী সাহিত্যিকের সমৃদ্ধ রচনাগুলোকে মোটেই অবহেলা করার পক্ষে নই। তবে দেখা দরকার আমরা সেগুলোকে কীভাবে পড়ছি এবং কেন পড়ছি। মোহ আর অভিভব মুক্তিকামী সমালোচনার সাক্ষাৎ শত্রু, যেমন তার আরেক শত্রু না বুঝে বা না শুনে তাৎক্ষণিক বর্জন।

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Television Interview on the Politics of Comparative Literature

Television Interview on the Politics of Comparative Literature

2:04 PM Editor 0 Comments


Television Interview on the Politics of Comparative Literature

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে বিভিন্ন বিশেষণে চরিত্রায়িত করার রেওয়াজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই চালু হয়েছে। ২০০...

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাম্প্রতিক ব্যাকরণ - আজফার হোসেন

2:00 PM Editor 0 Comments

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে বিভিন্ন বিশেষণে চরিত্রায়িত করার রেওয়াজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই চালু হয়েছে। ২০০৩ সালে সিয়াটল্‌ মহানগরীতে অনুষ্ঠিত এক বিশাল যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে ফিলিস্তিনি তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংগঠক জুবায়ের বিন তালেব সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন বিশেষণের একটা ফর্দ পেশ করেন এভাবে : ‘নতুন সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘সামরিক সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘অগ্রসর সাম্রাজ্যবাদ’ এবং এমনকি ‘অতিপ্রাকৃত সাম্রাজ্যবাদ।’
এও বলা দরকার যে, ১১ই সেপ্টেম্বরের আগে একদল ‘উত্তর-বাদী’ (পোস্ট-অল্‌) তাত্ত্বিক, অর্থাৎ উত্তর-কাঠামোবাদী ও উত্তর-আধুনিকতাবাদী তাত্ত্বিক, সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী চেহারাকে প্রচ্ছন্ন করার উদ্দেশ্যেই ‘উত্তর-সাম্রাজ্যবাদ’ বা ইংরেজিতে ‘পোস্ট-ইম্পিরিয়ালিজম’ বর্গটি চালু রেখেছিলেন। কিন্তু, না, শেষ পর্যন্ত ওই বর্গটি ধোপে টেকে নি, কেননা সামপ্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে দ্বিধাবোধ করছে না মোটেই। মার্কিন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক জন্‌ বেলামি ফস্টারের মতে ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’-এর ধারণাটিই এখন সবচাইতে যুৎসই ধারণা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে অনেকের কাছে। এ-বিষয়টি তলিয়ে দেখা বর্তমান রচনার একটি উদ্দেশ্য, যদিও একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু তার আগে জুবায়ের বিন তালেবের ওই ফর্দের তাৎপর্য নিয়ে কিছু বলা দরকার।
সাম্রাজ্যবাদকে বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত করার ব্যাপারটি একাধিক ইঙ্গিতকেই সামনে আনে। প্রথমত, সাম্রাজ্যবাদের যুগ শেষ হয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, বরঞ্চ সাম্রাজ্যবাদ আরো আগ্রাসী হয়ে তার উপস্থিতি সরবে ঘোষণা করছে এমনভাবে যে, খোদ মার্কিনীদের মধ্যেই যারা একসময় সাম্রাজ্যবাদকে সেকেলে রেটোরিক বলে উড়িয়ে দিত, এমনকি তারাও সাম্রাজ্যবাদকে ওই সাম্রাজ্যবাদ নামেই ডাকতে বাধ্য হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ওই ফর্দ আরো নির্দেশ করে যে, সাম্রাজ্যবাদের চেহারা একটি নয়, একাধিক। অথবা বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদ বিভিন্ন বেশে বিভিন্নভাবেই উপস্থিত হওয়ার মতা অর্জন করেছে। বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন কায়দায় বিভিন্ন ধরনের অসম মতা-সম্পর্ক তৈরী করে তাকে বিভিন্ন পরিসরে বিকীরিত করে চলেছে আজকের সাম্রাজ্যবাদ। এই সাম্রাজ্যবাদ একই সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক, মতাদর্শিক এবং পরিবেশগতও। সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন কিন্তু পরস্পর-সম্পর্কিত চেহারা ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা করাও বর্তমান রচনার একটি উদ্দেশ্য।



কিন্তু ‘সাম্রাজ্যবাদ বলাটাই যথেষ্ট নয়, বলতে হবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথা’-এমনি একটি স্লোগান ২০০৩ সালেই লাতিন আমেরিকার-বিশেষ করে ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, নিকারাগুয়া, গুয়াতেমালা ও এল সালভেদরের-একাধিক যুদ্ধবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন থেকে অনিবার্য ভাবেই উঠে এসেছিল। জোর দিয়েই বলা দরকার যে, এ-স্লোগান ওই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু উত্তরবাদী কেতাবি তত্ত্বের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে থাকে। এখানে একটি বহুল-আলোচিত ও বিতর্কিত বইয়ের নাম উল্লেখ করতে হয়। বইটির নাম এম্পায়ার। লিখেছেন মাইকেল হার্ট ও আন্তোনিও নেগ্রি। প্রথমজন মার্কিন অধ্যাপক আর দ্বিতীয়জন ইতালীয় তাত্ত্বিক ও এ্যাকটিভিস্ট। উভয়েই হাল আমলের নতুন নতুন ইউরোপীয় তত্ত্বে আগ্রহী। এ-সব তত্ত্বে বুঁদ হয়ে এবং জনগণের চলমান সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন থেকে নাত্রিক দূরত্বে অবস্থান করেই হার্ট ও নেগ্রি তাঁদের ওই ঢাউস বইটি লিখেছিলেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের আগেই, অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক-সামরিক শক্তির প্রতীক নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও ওয়াশিংটন ডিসি’র পেন্টাগন ধসে যাওয়ার আগেই। কিন্তু আমরা দেখছি যে, প্রতীকের চেয়ে আরো বাস্তব এবং নিঃসন্দেহে অনেক বেশি শক্তিশালী হচ্ছে যা প্রতীকায়িত, অর্থাৎ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেই, যা অবশ্য দেখেন নি হার্ট ও নেগ্রি। দেখেন নি বলেই ২০০০ সালে প্রকাশিত ওই বই-এ উত্তর-আধুনিকতাবাদী হার্ড ও নেগ্রি তাঁদের মূল কথাটা বলেন এভাবে :

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বা কোনো জাতি-রাষ্ট্রই, এখন আর সাম্রাজ্যবাদ প্রকল্পের কেন্দ্রে অবস্থান করে না। সাম্রাজ্যবাদ এখন বিগত। কোনো জাতির প েএখন আর বিশ্বের মোড়ল হওয়া সম্ভব নয়, যা একসময় ইউরোপীয় জাতিগুলোর প েসম্ভব হয়েছিল। (পৃ. ীরা)

বলা দরকার যে, হার্ট ও নেগ্রি উত্তর-আধুনিকতাবাদী কায়দায় সাম্রাজ্যের সর্বত্রগামী শক্তির কথা বলতে গিয়েই তার কেন্দ্রকে দেখতে চান নি। তাঁরা অবশ্য ‘সাম্রাজ্য’ কথাটা রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু বাদ ফেলতে চাইছেন ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বর্গটিকে। কারণ-তাঁদের মতে-বর্গটি সেকেলে এবং বর্তমান সময়ে বর্গটি তার বিশ্লেষণী শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এভাবে জোর ক’রে নতুন কিছু বলার এবং চমক দেয়ার তাগিদেই হার্ট ও নেগ্রি বলেছেন নামহীন, অবয়বহীন, সীমাহীন, কেন্দ্রহীন, ভূতুড়ে, সার্বভৌম সাম্রাজ্যের কথা। তাঁদের মতে এই সাম্রাজ্যের ভেতরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল একটি সুবিধাজনক পরিসর দখল করে আছে মাত্র। হার্ট ও নেগ্রির এই ‘যুক্তি’গুলোকে এবং বিশেষ ক’রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়-দেয়ার বিষয়টিকে এর মধ্যেই তুলোধুনো করেছেন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একাধিক লড়াকু তাত্ত্বিক। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন ফিলিপিনি তাত্ত্বিক ই-স্যান হুয়ান, পুর্তো-রিকোর সমাজতাত্ত্বিক হোসে আনাজাগাস্তি, ভারতীয় সংস্কৃতি-সমালোচক এজাজ আহমেদ, কেনিয়ার ঔপন্যাসিক-তাত্ত্বিক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো ও ফিলিপাইনের নারীবাদী তাত্ত্বিক ডেলিয়া আগুইল্যার। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই মান্থলি রিভিউ পত্রিকাটি হার্ট ও নেগ্রির সমালোচনায় মুখর ছিল, যেমন রিথিংকিং মার্কসিজম পত্রিকাও একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে হার্ট ও নেগ্রির যুক্তিগুলোকে বিভিন্নভাবে মোকাবেলা করার ল্যেই।
এখানে ওইসব সমালোচনার খুঁটিনাটিতে প্রবেশ করা সম্ভব না হলেও সমালোচনাগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যকে মোটা দাগে অল্পায়াসেই শনাক্ত করা যায়। সাম্রাজ্যবাদ বিভিন্ন বেশে ও চেহারায় বিভিন্ন পরিসরে বা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় উপস্থিত, প্রভাবশালী ও আগ্রাসী হওয়ার অভূতপূর্ব মতা অর্জন করলেও সাম্রাজ্যবাদ নির্দিষ্ট নামে এবং নির্দিষ্ট জাতীয় পতাকা নিয়েই উপস্থিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, ইরাকে ও আফগানিস্তানে তো বটেই। এই সাম্রাজ্যবাদের নাম মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই, কেননা কোথাও নিজের পতাকা লুকিয়ে ফেলার এখন কোনো ইচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেই। শুধু নিজের দেশের সুপারমার্কেটগুলোতে বিভিন্ন পণ্যের গায়েগায়েই যে মার্কিন পতাকা লেপ্টে থাকে তা নয়, এখন সারাপৃথিবীতেই তৈরী-করা তার প্রায় ৭০০টি সামরিক ঘাঁটিতে পতপত করে উড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। ইউরোপসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় তৈরী-করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রায় ৭০০টি সামরিক ঘাঁটি কোনো অদৃশ্য, বায়বীয়, ভূতুড়ে জায়গা নয় মোটেই। সারা পৃথিবীকে একলা শাসন করবে বলেই এই ঘাঁটিগুলো তৈরী করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে বিষয়টি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এক অভূতপূর্ব সামরিকায়নকেই নির্দেশ করে বটে। এ-অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ এমনকি ঈশ্বরের মতো সর্বময় মতার অধিকারী হতে চাইলেও চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে সে বিভিন্ন েত্েরই দৃশ্যমান। শুধু দৃশ্যমানই নয়, সে কেন্দ্রীয় অবস্থানেই দৃশ্যমান বটে।
দ্বিতীয়ত, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জনগণের চলমান সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনগুলো থেকে উঠে-আসা যুক্তি ও তত্ত্বগুলো সরাসরিই বলে দেয় যে, আমরা এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামপ্রতিকতম স্তরেই বাস করছি। বছর কয়েক আগে ক্যারিবীয় অঞ্চলে-বিশেষ করে গ্রানাডায়-একাধিক যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে গ্রানাডার বিপ্লবী মরিস বিশপের ওই কথাটা নিঃশ্বাসের মতো অনিবার্য হয়ে বারবারই উচ্চারিত হয়েছে : ‘আমাদের সময়ের প্রধান ও প্রাথমিক সমস্যা হলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।’ দুটো বিকল্প বৈশ্বিক মিডিয়া-‘ইন্ডি-মিডিয়া’ ও ‘জি-নেট’-গত কয়েক বছরে ইরাকের প্রায় শতাধিক ছোটো-বড়ো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন ও তৎপরতার খবর আমাদেরকে দিয়েছে। ওইসব তৎপরতা হার্ট ও নেগ্রিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই চিনে নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদকে-যে-সাম্রাজ্যবাদের নাম মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।
তৃতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদের চরিত্রায়নে ‘কেন্দ্রহীন’ বা ‘নামহীন’ বা ‘অবয়বহীন’ বা ‘ভূতুড়ে’ বা ‘ঠিকানা-সীমানাবিহীন’ ইত্যাকার বিশেষণের ব্যবহার ওই সাম্রাজ্যবাদকে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার ঘোর তৈরী করে এমনভাবে যে, সুনির্দিষ্ট সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তখন অর্থহীন ঠেকে। অর্থাৎ হার্ট ও নেগ্রির উত্তর আধুনিকতাবাদী চরিত্রায়ন সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার এক ধরনের বিরাজনীতিকরণকেই উৎসাহিত ও সহায়তা করে।
চতুর্থত, যেখানে হার্ট ও নেগ্রি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আড়াল করতে গিয়েই বলেছেন কেন্দ্রহীন ও অবয়বহীন ভূতুড়ে সাম্রাজ্যের কথা (হায়রে উত্তর-আধুনিকতা-বাদীদের কেন্দ্র-ভাঙার নমুনা!), সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘থিংক-ট্যাংকে’র আলোচনা এবং এমনকি কিছু সরকারি পলিসি-সংক্রান্ত আলোচনা সাম্রাজ্যবাদ কথাটাকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের েত্ের ব্যবহার করেছে নির্দ্বিধায়। অর্থাৎ ৱায়ুযুদ্ধ চলাকালীন পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ছদ্মবেশে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবেই হাজির থেকেছে, সেখানে আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পরিত্যাগ করেছে তার সকল ছদ্মবেশ, এমনকি খুলে ফেলেছে তার সমস্ত বসন। জন বেলামি ফস্টার একেই বলেছেন ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ।’ তিনি তাঁর সমপ্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ নেকেড ইম্পিরিয়ালিজম-এ অসংখ্য প্রমাণ হাজির করেছেন ওই নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের ধারণাকে পরিষ্কার করার জন্যই।



জন বেলামি ফস্টারের নেকেড ইম্পিরিয়ালিজম প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক মহলে তা বেশ সাড়া জাগায়। শুধু তাই নয়, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে বইটি। বইটির মূল বক্তব্য সংেেপ এভাবে পেশ করা যায় : যদিও ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক তৎপরতা অনেকের কাছে ‘নতুন সামরিকবাদ’ ও ‘নতুন সাম্রাজ্যবাদ’-এর আকারে হাজির হয়েছে, আসলে সামরিকবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মোটেই নতুন কোনো বিষয় নয়, কেননা তার জন্মলগ্ন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবেই তার আধিপত্য বৈশ্বিক পরিসরে বিস্তৃত করতে চেয়েছে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সাম্রাজ্যবাদী আকাঙা ঊনিশ শতকে সাংস্কৃতিক বৈধতাও লাভ করে এমনি এক মাত্রায় যে, গণতান্ত্রিক, মহৎ, মানবতাবাদী কবি ব’লে বিশ্বখ্যাত ওয়ল্ট্‌ হুইটম্যানও তাঁর কিছু কিছু কবিতায় সে আকাঙা সরাসরি প্রকাশ করেন।) কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সামরিকবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ নতুন কোনো বিষয় না হলেও তাদের ইতিহাস কি কেবল স্থিরই থেকেছে? উত্তরে ফস্টার ‘না’ বলেছেন অবশ্যই। তবে, ফস্টারের মতে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেহারায় যে পরিবর্তন লণীয়, তা হচ্ছে তার নগ্ন বর্বরতা বা বর্বর নগ্নতার অভূতপূর্ব প্রকাশ, যে-নগ্নতার প্রমাণ বাস্তব পৃথিবীতে তো বটেই, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘অফিসিয়াল রেটোরিক’-এ পাওয়া যায়। এখানে কয়েকটি প্রমাণ হাজির করা যাক।
২০০০ সাল। তখন রিচার্ড হাস্‌ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরা কাউন্সিলের একজন প্রভাবশালী সদস্য। শুধু তাই নয়, প্রথম বুশের একজন বিশেষ সহকারীও সে, যাকে পরবর্তী সময়ে নব্য-নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রতি জর্জ ডাব্লিউ বুশের স্বরাষ্ট্র বিভাগের নীতি প্রণয়ন ও পরিকল্পনার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সেই রিচার্ড হাস্‌ ২০০০ সালের ১১ই নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘পলিসি-পেপার’ পেশ করেন, যার শিরোনাম ‘ইম্পিরিয়াল আমেরিকা’। শিরোনাম নিজেই তাৎপর্যপূর্ণ বটে। নীতিমালা প্রণয়ন-সংক্রান্ত ওই রচনায় পরিষ্কারভাবে বলা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ‘সনাতন জাতি-রাষ্ট্রের ভূমিকা পালনের পরিবর্তে সরাসরি সাম্রাজ্যের শক্তির চেহারা নিয়ে উপস্থিত হতে হবে, (নেকেড ইমপিরিয়ালিজম, পৃ ১৭)। ফস্টার নিজেই ওই রচনাকে এভাবে উদ্ধৃত করেন :

সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্র নীতির জন্য প্রয়োজন এমন এক নীতি যা কতোগুলো বিশেষ কৌশলে পৃথিবীর পুনর্বিন্যাসে সহায়তা করবে...এেত্ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে ঊনবিংশ শতাব্দীর গ্রেট ব্রিটেনের মতোই। (পৃ ১৭)

ঊনবিংশ শতাব্দীর গ্রেট ব্রিটেনের মতো? হ্যাঁ, জোরেশোরেই সেই তুলনাটাকে সামনে এনেছেন রিচার্ড হাস্‌। দরকার হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিরে যাবে ধ্রুপদী উপনিবেশবাদের যুগেই; দরকার হলে সে জোর করেই দখল ও শাসন করবে অন্যের ভূমি। না, এখানে ছদ্মবেশ ধারণ করার কোনো অবকাশ নেই। হাসের বক্তব্য অনুসারে সাম্রাজ্যের কৌশল প্রয়োগই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখন অনিবার্য মিশন। আমরা তো জানিই যে, ১১টি ভার্জিন আইল্যান্ডসহ পুর্তোরিকো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপনিবেশ। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক ও আফগানিস্তান দখল এবং সে-সব অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি শারীরিক উপস্থিতি হার্ট-ও-নেগ্রি-কথিত অবয়বহীন ভূতুড়ে সাম্রাজ্যের উত্তর-আধুনিকতাবাদী ধারণাকে নিমেষেই অকেজো প্রমাণ করে এবং এমনকি যাকে মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও ভূগোলবিদ ডেভিড হারভি তাঁর সমপ্রতি প্রকাশিত দ্য নিউ ইম্পিরিয়ালিজম গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদের ‘টেরিটোরিয়াল লজিক’ বলেছেন, তারই প্রাসঙ্গিকতাকে প্রমাণ করে।
ডেভিড হারভি’র দ্য নিউ ইম্পিরিয়ালিজম দু’টো পরস্পর-সম্পর্কিত সাম্রাজ্যবাদী ‘লজিক’-এর ধারণাকে সামনে আনে : একটি হচ্ছে মতার পুঁজিবাদী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ‘লজিক’ এবং অপরটি মতার ‘টেরিটোরিয়াল’ বা ভূগোল-ও-ভূমি-সংক্রান্ত লজিক। পরের লজিকের মোদ্দা কথাটা হচ্ছে এই : আজকের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কেবল অনানুষ্ঠানিক ও পরো অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শাসনকে বা আধিপত্যকেই নির্দেশ করে না; পুঁজিবাদের বিকাশের ও পুঁজির সংবর্ধনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক তাগিদেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে সরাসরি ভূমিদখল, ভূমিদস্যুতা বা ভূমিলুণ্ঠন, যে-কাজটি করার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এসেছে নিদেনপ েসেই ঊনিশ শতক থেকেই। আজ সেই ভূমিদখল বা ভূমিলুণ্ঠন পেয়েছে আরো তীব্রতা। আসলে শুধু ধ্রুপদী উপনিবেশবাদের েত্েরই নয়, আজকের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেহারা ও চরিত্র বোঝার জন্যই ভূমি-প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়।
‘ভূমিতেই সাম্রাজ্যবাদ সবচাইতে দৃশ্যমান ও নগ্ন হয়’-কথাটা একটি সাাৎকারে বলেছিলেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো। ভূমি যে সাম্রাজ্যবাদের জন্য-বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য-ঐতিহাসিকভাবে কতটা জরুরী হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে ক্যাস্ত্রোর একটি চমৎকার আলোচনা আছে তার সামপ্রতিক গ্রন্থ ওয়ার, রেইসিজম্‌ এ্যান্ড একোনমিক ইনজাস্টিস-এ। সেখানে ক্যাস্ত্রো আমাদের জানাচ্ছেন যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস এবং তার ভূমিদখলের ও ভূমিদস্যুতার ইতিহাস কেবল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কালেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্যাস্ত্রোর মতে সেই ইতিহাসের জন্য আমাদেরকে যেতে হবে ঊনিশ শতকেই। তিনি তিনটি গরুত্বপূর্ণ সনের ওপর জোর দেন। এগুলো হচ্ছে ১৮২৩, ১৮৪৮ এবং ১৮৯৮। হ্যাঁ, ১৮২৩ সালে সরবে ঘোষিত হয় ‘মনরো ডকট্রিন।’ তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতির নামাঙ্কিত এই মতবাদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিদস্যুতার একটি মতাদর্শিক ভিত্তি তৈরি করার তাগিদেই প্রচার করে যে, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের হাত থেকে রা করার জন্যই লাতিন আমেরিকাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে রাখা জরুরী। রাষ্ট্রপতি মনরো নিজেই একটি রূপক চালু করেন : ‘লাতিন আমেরিকা হচ্ছে আমাদের বাড়ীর পশ্চাদ্ভাগের উঠোন।’ কিন্তু মতবাদ ও রূপকের চেয়ে আরো সত্য ও বাস্তব হয়ে থাকে ইতিহাসে মূর্ত-হয়ে-ওঠা ঘটনা। ১৮৪৮ সালে মেঙিকোর অর্ধেকেরও বেশি ভূমি ছিনিয়ে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ভৌগোলিক সীমানা সমপ্রসারিত করে। এভাবে নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে ওঠেন অসংখ্য মেঙিকান। এরপর ১৮৯৮ সালে উঠতি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিদখলের ও ভূমিদস্যুতার চেহারা আরো নগ্ন হয় : কিউবা, পুর্তো-রিকো, গুয়াম, হাওয়াই এবং ফিলিপাইনস্‌ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপনিবেশে রূপান্তরিত হয়। মার্কিন সামরিক ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ব্লামের গবেষণা-মোতাবেক ভূমিদখলের জন্য বিংশ শতাব্দীতে কেবল লাতিন আমেরিকাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় শতাধিক ছোটো-বড়ো ও প্রত্য-পরো সামরিক যুদ্ধ পরিচালিত হয়।
এই ইতিহাস থেকে আজকের নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপতৎপরতাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না মোটেই। এমনকি মার্কিন সরকারের ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীসহ সরকার-প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রিত পত্রিকাগুলো ওই ইতিহাসকেই স্মরণে রেখে আজকের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সরাসরি মতাদর্শিক বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে ইতিমধ্যেই। ফস্টার নিজেই নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের ধারণাকে পরিষ্কার করার জন্য উদাহরণ জড়ো করেছেন একের পর এক। যেমন ধরা যাক, ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশানস’-এর কথা এবং তার সিনিয়র ফেলো ম্যাকস্‌ বুটের একটি রচনার কথা। ২০০৩ সালে ৬ই মে ইউ.এস.এ টুডে নামের একটি প্রধান পত্রিকায় ম্যাকস্‌ বুট-এর যে প্রবন্ধটি ছাপা হয়, তার শিরোনামই চট করে বলে দেয় ওই প্রবন্ধের মূল কথাটাই। শিরোনামটি হচ্ছে ‘আমেরিক্যান ইম্পিরিয়ালিজম? : নো নীড টু রান ফ্রম দি লেবেল।’ ম্যাকস্‌ বুটের মতে সাম্রাজ্যবাদকে গালি হিসেবে বিবেচনা না ক’রে বরঞ্চ ঐতিহাসিকভাবে কার্যকর তাবৎ সাম্রাজ্যবাদী কলাকৌশল ও অনুশীলনকে যথাযথভাবে ব্যবহার করাই হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজ। ওই ২০০৩ সালেই এ্যান্ড্রু বেইস্‌ভিচের সম্পাদনায় বের হয় একটি প্রবন্ধ-সংকলন, যার শিরোনাম দ্যা ইম্পিরিয়াল টেনস্‌। সেখানে দীপক লাল নামের আরেক ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীর একটি প্রবন্ধ আছে। ওই প্রবন্ধটির শিরোনামই বলে দেয় লালের বক্তব্যটা কি। শিরোনামটি হচ্ছে ‘ইন ডিফেন্স অব এম্পায়ারস্‌।’ সেখানে লাল বলছেন :

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক কাজ হবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ব্যবস্থা তৈরী করা। অনেকেই দোষারোপ করে বলেন যে, স্থিতাবস্থার এ-ধরনের পুনর্বিন্যাস সাম্রাজ্যবাদের কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের তেল নিয়ন্ত্রণের আকাঙাকেই নির্দেশ করবে। কিন্তু আপত্তিকর হওয়া তো দূরের কথা, সাম্রাজ্যবাদই এখন জরুরী, ওই মধ্যপ্রাচ্যে একটি ব্যবস্থা নির্মাণের স্বার্থেই (নেকেড ইম্পিরিয়ালিজম-এ উদ্ধৃত, পৃ ৭)

লণীয় যে, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই যেখানে উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবীরা বড়ো জোর আভাসে-ইঙ্গিতে ইনিয়ে-বিনিয়ে সাম্রাজ্যবাদের কথা বলেন, বা যেখানে তাঁরা সাম্রাজ্যবাদ শব্দটিই উচ্চারণ করতে নারাজ, সেখানে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের আলোচনায় বা সরকারী আলোচনায় ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বর্গটি কেবল স্পষ্টোচ্চারণেরই বিষয় থাকছে না, বরঞ্চ তা লাভ করেছে এক অভূতপূর্ব মতাদর্শিক বৈধতা। আবারও ওই ২০০৩ সালের ৫ জানুয়ারী নিউ ইয়র্ক টাইমস্‌ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেই মুদ্রিত হয়েছে এই পঙ্‌ক্তিটি-‘আমেরিকান এম্পায়ার : গেট ইউজড্‌ টু ইট।’ অর্থাৎ পত্রিকাটি ডাক দিচ্ছে আমাদেরকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য। আমাদের প্রাত্যহিক অনুশীলনে বা আমাদের জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতায়, অনুষঙ্গে, অনুপুঙে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ লাভ করুক প্রশ্নাতীত স্বাভাবিকতা, এই ল্যেও তো কাজ করে চলেছে মার্কিন রাষ্ট্রসহ তার মতাদর্শিক ও দমনমূলক সব ‘এ্যাপারেটাস্‌’, বিশেষ ক’রে তার সামরিক বাহিনী, মিডিয়া ও ভাড়াটে বা তাঁবেদার বুদ্ধিজীবীদের দল, যাদের আবার জাতীয় সংস্করণ পাওয়া যাবে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। বাংলাদেশেও আছে ওইসব বুদ্ধিজীবী যাদের কিছুদিন আগেই দেখা গিয়েছে বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিসের বিদায়ী সম্বর্ধনায়। এটা বলাই যথেষ্ট নয়। আসলে গত ছত্রিশ বছরে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেই সংস্কৃতিই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সত্যিকার অর্থে শুধু প্রশ্নাতীত করেই রাখে নি, বরঞ্চ তার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লেনদেনের প্রায়-নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস তৈরী করে রেখেছে। সেটি আরেক প্রসঙ্গ। সে-প্রসঙ্গে পরে ফিরে আসা যাবে।



নিঃসন্দেহে নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঐতিহাসিকতা ও সামপ্রতিকতাকে স্পষ্ট করার ভেতর দিয়ে ওই সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বায়নে জন বেলামি ফস্টারের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁর তত্ত্বায়নের পেছনে রয়েছেন তৃতীয় বিশ্বের-অর্থাৎ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার-এক দল মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তাত্ত্বিক। এখানে তাঁদের প্রসঙ্গে দু-একটা কথা বলা দরকার।
১৯৬৬ সাল। কিউবার হাভানায় অনুষ্ঠিত হয় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবীদের নিয়ে এক মহাসম্মেলন। এর নাম দেয়া হয় ‘ত্রিমহাদেশীয় মহাসম্মেলন’ বা ‘ট্রাইকন্টিনেন্টাল কনফারেন্স।’ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা-বিপ্লবী সংহতি নির্মাণের এক উজ্জ্বল পদপে। এই মহাসমাবেশে ফিদেল ক্যাস্ত্রো উপস্থিত ছিলেন তো বটেই, আরো ছিলেন ভিয়েতনামের হো চি মিন, ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে এইমে সেজেয়ার, ঘানার কোয়ামে নক্রুমা, চিলির সালভেদর আয়েন্দে, কেইপ ভার্দের আমিলকার কাবরালসহ আরো অনেকে। সমাবেশে এশিয়া থেকে ১৯৭ জন ও আফ্রিকা থেকে ১৫০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আরো উপস্থিত ছিলেন লাতিন আমেরিকার ২৭টি দল থেকে ১৬৫ জন প্রতিনিধি। যদিও মহাসমাবেশটি কিউবায় অনুষ্ঠিত হয়, চে গুয়েভারা সেখানে উপস্থিত হতে পারেন নি, কেননা তিনি তখন বলিভিয়ায় বিপ্লবী গেরিলা যুদ্ধে ব্যস্ত। তবে সেখান থেকে তিনি পাঠিয়েছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত ‘মেসেজ টু দ্য ট্রাইকন্টিনেন্টাল।’ বলা দরকার, ‘ত্রিমহাদেশীয়’ বা ‘ট্রাইকন্টিনেন্টাল’ বর্গটি চে গুয়েভারাই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন।
এখানে ‘ত্রিমহাদেশীয় মহাসম্মেলন’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ আখ্যান বা এমনকি তার কোনো সংপ্তি রেখালেখ্যও উপস্থিত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে, ইতিহাসের এ ঘটনাটিকে স্মরণে বা বিবেচনায় রাখা দরকার এ-কারণে যে, ষাটের দশকের শেষ দিক থেকেই, অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রস্থানের মুহূর্তেই, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্নতাকে বিবেচনায় রেখেছিলেন তৃতীয় বিশ্বের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবীরা, যাঁরা সাম্রাজ্যবাদ-বিষয়ক তত্ত্ব উপস্থিত করেছিলেন চলমান আন্দোলনের ভেতর থেকেই। এখানে বলে রাখা দরকার যে, ইতিহাসের সে মুহূর্তে ওই ত্রিমহাদেশীয় সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, ঠিক তখনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চলছিল ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তির লড়াই। একই সময়ে ওই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেই চলছিল ভেনেজুয়েলা, পেরু, গুয়াতেমালা ও কলোম্বিয়ায় জনগণের সশস্ত্র লড়াই। এছাড়া এ-সময় ক্যারিবীয় অঞ্চলের ডমিনিকান রিপাবলিক সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক সন্ত্রাসে আক্রান্ত ছিল এবং একই সঙ্গে সেখানেও চলছিল জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম। এখানেই শেষ নয়। সে সময় পুর্তোরিকো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপনিবেশ তো ছিলই (এখনও আছে), তার ওপর তাকে রূপান্তরিত করা হয়েছিল একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটিতে। এছাড়া পানামার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামাকে একটি স্ট্র্যাটেজিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। আর সেখান থেকে জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারী ক্যারিবীয় অঞ্চলের জনগণের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক আক্রমণ অব্যাহত রেখেছিল।
ইতিহাসের এমনি এক ঘটনাবহুল, মার্কিনআক্রান্ত ও জনবিুব্ধ মুহূর্তেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওই ত্রিমহাদেশীয় মহাসম্মেলন। আর এই সম্মেলন থেকেই বেরিয়ে এসেছে ‘ত্রিমহাদেশবাদ’ নামের এক গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদ-বিষয়ক তত্ত্ব। অবশ্যই বলা যাবে যে, এই তত্ত্ব এখনও প্রাসঙ্গিক। এবং জন বেলামি ফস্টারের নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বকে এই ‘ত্রিমহাদেশবাদ’ বা ‘ত্রিমহাদেশীয়’ তত্ত্ব প্রয়োজনীয় রসদ জুগিয়েছে। ‘ত্রিমহাদেশীয়’ তত্ত্বের পরিসর নিঃসন্দেহে বিস্তৃত। তবে এই তত্ত্বের কয়েকটি মূল বক্তব্যকে দ্রুত চিহ্নিত করা যায়।
প্রথমত, ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাকে-তাদের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও-একটি বৃহৎ ঐক্যের ভিত্তিতে একই সমতলে আনতে চায় এই যুক্তিতে যে, এই তিনটি মহাদেশের ইতিহাসে উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন ধরনের আগ্রাসন বর্তমান। দ্বিতীয়ত, শুধু সাম্রাজ্যবাদের কথা বলাটা যথেষ্ট নয়; বর্তমান সময়ের সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করতে হলে বলতে হবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথা। তৃতীয়ত, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জনগণের ‘পয়লা নম্বর শত্রু’ হচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। চতুর্থত, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই অর্থনৈতিক শোষণের বৈশ্বিক ব্যবস্থার একটি প্রধান ভিত্তি। পঞ্চমত, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একই সঙ্গে যেমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, তেমনি সে একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও সামরিকও বটে। ষষ্ঠত, তবে সামরিক যুদ্ধ ছাড়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প েটিকে থাকা ও আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব নয়। সপ্তমত, সামরিক যুদ্ধের কারণেই যেখানেই যায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সেখানেই সে নগ্ন হয়।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের ধারণাটি ওই ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্বের মধ্যেই নিহিত ছিল। বলা প্রয়োজন যে, এই ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্ব আসলে তৃতীয় বিশ্বের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনৈতিক তত্ত্বায়নের বিপ্লবী ঐতিহ্য বা ধারারই অন্তর্গত। এও বলা দরকার যে, এই ধারা থেকে নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের ধারণা জন বেলামি ফস্টারের কাছে উপস্থিত হলেও তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্নতাকে ধরতে চেয়েছেন মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ভাষ্যে। কিন্তু ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্নতা নির্দিষ্ট হয়েছে তার সামরিক আগ্রাসনের ভেতর দিয়েই। এভাবেও বলা যায় : ৱায়ুযুদ্ধ চলাকালীন পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে নিজেকে সাম্রাজ্যবাদী না বললেও সে নগ্ন হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার সামরিক অপতৎপরতার ভেতর দিয়েই, আজ সেখানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেকে নগ্ন করে রেখেছে ঘোষণা দিয়েই; বলছে সে, সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া তার কোনো বিকল্প নেই।



মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার নগ্নতাকে আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় বেশী স্পষ্ট করেছে বটে, কিন্তু এই বিশেষ চরিত্রায়ন যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেহারা ও চরিত্রের সমগ্রকে নির্দেশ করে তাও বলা যাবে না। একজন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ হিসেবে জন বেলামি ফস্টারও সে-কথা বলেন না। যেমন বলে না ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্বও। প্রশ্ন তো থাকেই : কেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আগের তুলনায় এতো বেশী নগ্ন হয়েছে? এ নগ্নতার ঐতিহাসিক ও বস্তুগত ভিত্তিই বা কি? সাম্রাজ্যবাদ কি কেবলই নীতিমালা-প্রণয়নের বিষয়?
এখানে স্পষ্ট ক’রেই বলা দরকার যে, লেনিন-যিনি নিঃসন্দেহে সাম্রাজ্যবাদের একজন প্রধান ও প্রাসঙ্গিক তাত্ত্বিক-কাউটস্কির সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে বিতর্ক করতে গিয়ে কাউটস্কির যুক্তিকে খণ্ডন করেছেন এই বলে যে, সাম্রাজ্যবাদ কোনো পলিসির বিষয় নয়; সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদী বিকাশের যৌক্তিক পরিণতি। অর্থাৎ, লেনিনের মতে, আমরা সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ উদঘাটনে ব্যর্থ হবো যদি তার সঙ্গে পুঁজিবাদের সম্পর্ককে না-বুঝি। লেনিন তাঁর ইম্পিরিয়ালিজম : দ্য হাইয়েস্ট স্টেইজ অব ক্যাপিটালিজম পুস্তিকায় ওই সম্পর্কের তত্ত্বকে হাজির করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে : ‘সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তর’ (পৃ ৮৮)। লেনিন এও বলেন, ‘পুঁজিবাদের বিকাশের একটি নির্দিষ্ট, খুবই উঁচু স্তরে পুঁজিবাদ রূপান্তরিত হয় পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদে।’ (পৃ ৮৮)
সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে লেনিনীয় তত্ত্বের বিচার-বিশ্লেষণ ও সেই তত্ত্ব ঘিরে বিভিন্ন ধরনের তর্ক-বিতর্ক এখনও চলছে, যেমন চলেছে আগেও। তবে এখানে লেনিনকে আনার কারণ হচ্ছে মূলত এটাই বোঝানো যে, পুঁজিবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া বর্তমান সময়ের নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পুরোটা বোঝা মোটেই সম্ভব নয়।
এখানে এটাও বলা দরকার যে, সামপ্রতিক সময়ে পুঁজির বিচিত্রমাত্রিক বহিরঙ্গ এবং আগ্রাসনের মুখে পুঁজিবাদকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়েছে : ‘বহুজাতিক ফিন্যান্স পুঁজিবাদ,’ ‘নব্য-পুঁজিবাদ,’ ‘অগ্রসর বা ‘লেইট’ পুজিবাদ,’ ‘উত্তরফোর্ডবাদী পুঁজিবাদ,’ ‘উত্তরআধুনিকতাবাদী পুঁজিবাদ,’ ‘ইলেক্ট্রো পুঁজিবাদ,’ এমনকি ‘হাইড্রোকার্বন পুঁজিবাদ’ ইত্যাদি। নামের এই ছড়াছড়ি মাঝে মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলেও লেনিনের ওই কথাটা ফিরে আসে : ‘পুঁজি তার শক্তি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রকাশ করে।’ (দ্য স্টেট এ্যান্ড রেভ্যুলিউশন, পৃ ২২০)। লেনিনের আগে মার্কস নিজেই তাঁর গ্রুনড্রিস-এ বলেছেন ‘বহুরূপী পুঁজি’-এর কথা। এছাড়া পুঁজির ‘নমনীয়তা’ বা ‘ফেকসিবিলিটি’ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন বিশ শতকের একঝাঁক রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ- বেলজিয়ান তাত্ত্বিক আর্নেস্ট ম্যান্ডেল (যিনি তাঁর গ্রন্থ লেট ক্যাপিটালিজম-এর জন্য বিখ্যাত), ইতালীয়-মার্কিন তাত্ত্বিক জিয়োভানি আরিঘি, মিশরীয় তাত্ত্বিক সমির আমিন এবং ইংরেজ তাত্ত্বিক ডেভিড হারভি (যিনি তাঁর ‘পুঁজির নমনীয় সংবর্ধন’-এর তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত)।
বিষয়গত, শৈলীগত ও পদ্ধতিগত ভিন্নতা সত্ত্বেও এঁদের কাজ এক সঙ্গে জড়ো করলে কতোগুলো সাধারণ বিষয় চোখে পড়ে। প্রথমত, পুঁজির ইতিহাসে পুঁজি নিজেই বিভিন্ন চেহারা ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। অর্থাৎ পুঁজির নিজস্ব ইতিহাস থেমে থাকে নি মোটেই। দ্বিতীয়ত, পুঁজির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার নমনীয়তা (কেউ কেউ পুঁজির ‘অসীম নমনীয়তা’র কথাও বলেছেন)। তৃতীয়ত, তবে ‘নমনীয়তা’ মোটেই শেষ কথা নয়; পুঁজি নমনীয় হয় একচেটিয়া হয়ে ওঠার ল্যেই। হ্যাঁ, চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে পুঁজি সবসময়ই একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারে আগ্রহী। আমাদের সময়ে পুঁজিকে যে-নামেই ডাকা হোক না কেন, তার একচেটিয়া হয়ে-ওঠার প্রবণতাকে অস্বীকার করা যাবে না মোটেই। বরঞ্চ জোর দিয়েই এ-কথা বলা দরকার যে, আমরা একচেটিয়া পুঁজিবাদের সামপ্রতিকতম স্তরে বাস করছি। আর ওই একচেটিয়া পুঁজিবাদের সামপ্রতিকতম স্তরের নাম নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। হ্যাঁ, লেনিন বলেছিলেন ‘পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তর’-এর কথা; আর আমরা লেনিনকে খানিকটা সমপ্রসারিত করেই বলতে পারি ‘একচেটিয়া পুঁজিবাদের সামপ্রতিকতম স্তর’-এর কথা। এর আরেক নাম আজকের ‘গোলকায়ন’ (যদিও গোলকায়নের ইতিহাস পুঁজিবাদের ইতিহাসের মতোই দীর্ঘ)। এ-বিষয়গুলোকে উদাহরণ সহযোগে তলিয়ে দেখা যাক।
পুঁজির একচেটিয়া চরিত্র ও আচরণ কোন্‌ জায়গায় আছে-যে-চরিত্র যুগপৎ উৎপাদনম ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে-তা বোঝার জন্য আজকের বহুজাতিক কোম্পানীগুলো কীভাবে এবং কি বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করছে তা বোঝা দরকার, যদিও কোম্পানীগুলো বর্তমান সময়ের পুঁজিবাদের তাবৎ অনুশীলনের একমাত্র ত্রে বা প্রতিনিধি নয়। বিভিন্ন পরিসরেই পুঁজি কাজ করে বা সঞ্চালিত হয় বা সংবর্ধনের পথ খুঁজে পায়। ব্যাংক, ফান্ডস্‌, বন্ড, সিকিউরিটি এবং জাতি-রাষ্ট্র নিজেই পুঁজির বিনিয়োগের সুযোগ বিভিন্নভাবে খোলা রাখে বা সেই বিনিয়োগের সুযোগকে সহায়তা ও ত্বরান্বিত করে। কিন্তু এসব েত্েরর সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানীর সম্পর্ক যে সবসময় সহজ ও খোলামেলা থাকে তাও নয়। মাঝে মাঝে বহুজাতিক পুঁজির সঙ্গে একটি জাতি-রাষ্ট্র সংঘর্ষেও জড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু এরপরেও যদি আমরা বর্তমান সময়ে বহুজাতিক কোম্পানী বা কর্পোরেশনগুলোর কেবল বিক্রির পরিমাণ ল্য করি, তাহলে চট করেই বোঝা সম্ভব কিভাবে ওই কোম্পানী বা কর্পোরেশনগুলো তার শক্তি ও প্রভাব বজায় রেখেছে। তাহলে একটা ছোটো কিন্তু ইঙ্গিতবহ পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যাক। বর্তমান পৃথিবীর সবচাইতে প্রভাবশালী ও ধনবান পাঁচটি বৃহত্তম কর্পোরেশনের নাম হচ্ছে জেনারেল মটরস, ওয়ালমার্ট, এঙন-মবিল, ফোর্ড এবং ডাইমলার-ক্রাইসলার। এই পাঁচটি কর্পোরেশনের সামগ্রিক বিক্রি পৃথিবীর ১৮২টি দেশের জি.ডি.পি’র চেয়েও বেশি। মার্কিন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ রিচার্ড জে বার্নেট-এর মতে,

এসব কর্পোরেশন সারা পৃথিবী চষে বেড়ায়, সস্তা শ্রম খুঁজে ফিরে, লন্ডন থেকে হংকং পর্যন্ত তাদের স্টক বিক্রি করতে থাকে এবং গজিয়ে-ওঠা বাজারগুলোর মক্কেলকে বশ করা শুরু করে। (পৃ ৩৬)

বার্নেট আরো জানাচ্ছেন যে, ১৯৮৩ সাল থেকে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর ১১ পর্যন্ত সময়ে পৃথিবীর ২০০টি কর্পোরেশনের মুনাফা শতকরা ৩৬২.৪ বৃদ্ধি পেয়েছে। আরো উল্লেখযোগ্য হলো এই যে, ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাদের মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে আরো।
কেবল বিক্রি আর মুনাফার অংক কষে বর্তমান সময়ের পুঁজিবাদের মতো একটি জটিল ও অগ্রসর উৎপাদন-প্রণালীর সামপ্রতিক একচেটিয়া চেহারা ও চরিত্রের সমগ্রকে যে ধরা সম্ভব হবে, সেটা আমরা মোটেই বোঝাচ্ছি না। তবে বিক্রি ও মুনাফা সাধারণভাবে কোম্পানী বা কর্পোরেশনগুলোর অর্থনৈতিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আসলে বড়ো আকারের মুনাফা ছাড়া কোনোভাবেই কর্পোরেশন-যাকে মার্কিন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ পল সুইজি ও পল ব্যারান বলেছেন ‘পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের প্রকৃষ্ট নমুনা’-তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারে না। সুতরাং মুনাফা একমাত্র বিবেচ্য বিষয় না, হলেও গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই। কিন্তু কর্পোরেশনগুলোর মুনাফাভিত্তিক অর্থনৈতিক শক্তি নির্দেশ করার পাশাপাশি আরেকটি সংলগ্ন ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে শনাক্ত করা জরুরী। সেটি হলো কর্পোরেশনগুলোর হাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির অভূতপূর্ব কেন্দ্রীভবন। বেশ আগেই ওয়ার্ল্ড ব্যাংক নিজেই তো আমাদের জানিয়ে দিয়েছে যে, পৃথিবীর ৩ থেকে ৬টি সবচাইতে বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানী বৈশ্বিক পরিসরে খাদ্য ও পানীয়, কাঁচামাল এবং খনিজ ও ধাতব পদার্থের শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ রপ্তানী নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
কিন্তু এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থানটা কোথায়? আগেই আমরা বর্তমান পৃথিবীর সবচাইতে বৃহৎ পাঁচটি কর্পোরেশনের নাম উল্লেখ করেছি। এদের মধ্যে প্রথম চারটিই হচ্ছে মার্কিন কর্পোরেশন : জেনারেল মটরস্‌, ওয়ালমার্ট, এঙন-মবিল এবং ফোর্ড। এছাড়া রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরো কয়েকটি কর্পোরেশন, যেগুলো শক্তিতে ও বিস্তারে নিঃসন্দেহে বিশ্বখ্যাত : মাইক্রোসফ্‌ট্‌, কোকা-কোলা এবং আই.বি.এম.। এদের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের সম্মিলিত জি.ডি.পি’র অঙ্ককেও ছাড়িয়ে যায়। এ-কারণেই কোকা-কোলার প্রাক্তন সভাপতি ডনাল্ড আর. কিয়ৌ এক সাংবাদিককে যথার্থই বলেছিলেন যে, আজকের পৃথিবীতে বহুজাতিক কোম্পানীর কথা বলা মানেই আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্যের কথা বলা। কথাটি তিনি অবশ্য বর্তমান সময়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করার জন্য বলেন নি; বলেছেন তিনি তাঁর মার্কিন জাতীয়তাবাদী অহংকার ও গৌরবকে উৎসাহে ও উল্লাসে প্রকাশ করার জন্যই।
মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীর সঙ্গে, বা বৈশ্বিক পুঁজির সামপ্রতিক মার্কিনায়নের সঙ্গে, বর্তমান সময়ের পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তরের যোগাযোগকে দতা সহকারে প্রত্য করেছেন ফরাসী তাত্ত্বিক মিশেল বড্‌। ২০০০ সালে বড্‌ একটি সাড়া-জাগানো গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এর শিরোনাম এ হিস্ট্রি অব ক্যাপিটালিজম। গ্রন্থটিতে তিনি ১৫০০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাদের ঘটনাবহুল, পর্বভিত্তিক, সম্ভাবনাময় ও সংকটাপন্ন ইতিহাসকে তত্ত্ব ও উপাত্ত সহযোগে ধরার চেষ্টা করেছেন। সেই গ্রন্থটির শেষের দিকে মিশেল বড্‌ বলেন,

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র [বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বে] প্রধান আধিপত্যবাদী চালক। কার্যত প্রতিটি েত্েরই সে প্রধান, কাউকেই সে কোনো কিছুর জন্য জবাব দেয় না, বা তোয়াক্কা করেনা; বরঞ্চ সবার ওপরে সে তার আইন-কানুন চাপানোর চেষ্টা করে। (পৃ ২৮৫)

বড্‌ আরো বলেন,

ইতিহাসে আমরা প্রথমবারের জন্য ল্য করছি যে, কর্পোরেশনগুলো এখন একেবারে সেই সব মৌলিক সিদ্ধান্ত নিতে সম, যেগুলো গোটা মানবজাতিসহ জীবন ও পৃথিবীকে আক্রান্ত করে। এসব কর্পোরেশন এখন অভূতপূর্ব আর্থিক, প্রযুক্তিগত, বৈজ্ঞানিক ও শিল্পোপণ্যোৎবাদী শক্তির অধিকারী। অবশ্য মানুষের ক্রয়মতাকে বিবেচনায় রেখেই এসব কর্পোরেশন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। (পৃ ৩১০)

কিন্তু কর্পোরেশনের বা মার্কিন কর্পোরেশনের অভূতপূর্ব মতার অর্থ এই নয় যে, পৃথিবী থেকে জাতি-রাষ্ট্রগুলো উবে যাচ্ছে। না, যাকে কর্পোরেট পুঁজিবাদ বলা হচ্ছে-যা আসলে একচেটিয়া পুঁজিবাদের আরেক নাম-তা মোটেই জাতি-রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘোষণা করে নি, যদিও একদল উত্তর-আধুনিকতাবাদী তাত্ত্বিকসহ কিছু অর্থনীতিবিদ ও সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক এর মধ্যেই জাতি-রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘোষণা করেছেন। চট করেই মনে পড়ে কেনিচি ওহমায়ে’র বহুল-আলোচিত বই দ্য এন্ড অব দ্য নেশান-স্টেট-এর কথা। এই শিরোনাম নিজেই বইটির মূল প্রতিপাদ্যকে সরবে ঘোষণা করছে।
কেন্‌চি ওহমায়ে’র বিপরীতে অবশ্য সমির আমিন এবং ডেভিড হারভিসহ আর্জেন্টিনার মার্কসবাদী চিন্তাবিদ এনরিক ডুসেল এবং মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী সাসকিয়া সাসেন জাতি-রাষ্ট্রের পইে বিভিন্ন পরিপ্রেতিে এবং পরিসরে তাঁদের যুক্তি উত্থাপন করেছেন। তাঁদের মতে কর্পোরেট পুঁজির অভূতপূর্ব উত্থান ও বিস্তারের যুগে সেই পুঁজির সঙ্গে জাতি-রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক সবসময় একমাত্রিক বা একরকম থাকে না সত্য, কিন্তু পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণই জাতি-রাষ্ট্রের উপস্থিতিকে শুরুতেই ধরে নেয়। সত্য, পুঁজির ইতিহাসই আমাদের বলে দেয় যে, পুঁজি আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে চায় বা এমনকি পুঁজি মানেই আন্তর্জাতিক পুঁজি। এও সত্য যে, ত্রেবিশেষে এমনকি ‘জাতীয় পুঁজি’র ধারণাটিও ধোপে টেকে না। তার অর্থ এই নয় যে, পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণে জাতি-রাষ্ট্রের ভূমিকা নেই। আসলে ‘আন্তর্জাতিক’ কথাটার ভেতরেই তো ‘জাতি’ কথাটা থেকে যাচ্ছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে বলা যাবে যে,
আন্তর্জাতিক পুঁজিও জাতীয় রূপ নিতে পারে, যাকে আরেক প্রসঙ্গে আর্নেস্ট ম্যান্ডেল বলেছিলেন পুঁজির ‘ফেনোমেনাল ফর্ম’।
জাতি-রাষ্ট্র কিভাবে কাজ করে, সেটা বোঝার জন্য রিচার্ড রবিনস্‌-এর একটা উদ্ধৃতি ব্যবহার করা যেতে পারে :

জাতিরাষ্ট্রগুলো বাজার উন্মুক্ত করার ল্যেই আইন ও চুক্তি তৈরী করে; একই সঙ্গে জাতিরাষ্ট্রগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর জোর দেয় (রাস্তাঘাট, বিমান ও নৌবন্দর, বিদ্যুৎ সরবরাহ, আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যান্য দিক, ইত্যাদি)। কেননা এ-সব কিছুই পণ্য উৎপাদনে, সার্ভিস বিতরণে এবং মূল্য নির্ধারণে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে পুঁজিকে সাহায্য করে। জাতি-রাষ্ট্রগুলো বিনিয়োগকে রা করার ও বাজারকে উন্মুক্ত করার স্বার্থে এমনকি সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করে। (গ্লোবাল প্রবলেমস্‌ এ্যান্ড দ্য কালচার অব ক্যাপিটালিজম, পৃ ৫৯-৬০)

কিন্তু রিচার্ড রবিনস্‌ যেখানে ছাড়েন, সেখানে আরেকটু অগ্রসর হন এনরিক ডুসেল। তিনি দেখান যে, বর্তমান বিশ্বের মার্কিনায়িত একচেটিয়া পুঁজিবাদের জন্য জাতি-রাষ্ট্র কেবল জরুরীই নয়, বরঞ্চ তা পুঁজিবাদের গতিপ্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যেরই
অন্তর্গত বটে। ডুসেল আরো মনে করেন যে, জাতিরাষ্ট্র মাঝে মাঝে একাই উদ্বৃত্ত মূল্যের স্থানান্তরকে যুগপৎ একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক
বাস্তবতায় রূপান্তরিত করে।
হ্যাঁ, জাতি-রাষ্ট্র থাকেই, যেমন থাকে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের অসম উন্নয়ন, তবে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের সঙ্গে জাতি-রাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময় একরকম বা স্থির থাকে না, যে-বিষয়টির ইঙ্গিত আমরা আগেই দিয়েছি। উভয়ের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের টানা-পোড়েনও থাকতে পারে। এ-সব কিছুই নির্ভর করবে একটি জাতি-রাষ্ট্রের চরিত্রের ওপর।
বর্তমান বিশ্বের একচেটিয়া পুঁজিবাদের সামপ্রতিকতম স্তর হিসেবে নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য অনেকেই ‘আন্তর্জাতিক শ্রেণী জোটে’র ধারণাকে সামনে এনেছেন। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন সমির আমিন ও কেভিন ড্যানাহার। এঁরা মনে করেন যে, জাতি-রাষ্ট্রের ধারক হিসেবে মার্কিন সরকার নিজেই, মার্কিন কর্পোরেশন, মার্কিন সামরিক বাহিনী, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-আই.এম.এফ-ডাব্লিউ.টি.ও) এবং অন্যান্য জাতীয় শাসক শ্রেণী বিভিন্ন কায়দায় জোট বেঁধে এবং বিভিন্ন েত্ের পারস্পরিক লেনদেন ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী উৎপাদন-সম্পর্ক এবং সাম্রাজ্যবাদী মতা-সম্পর্ককে পুনরুৎপাদিত করতে থাকে। ্‌এও বলা যাবে যে, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি বা পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের সংকটের বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে ওই জোট-সম্পর্কেরই সংকট।



ফিরে আসি একচেটিয়া পুঁজিবাদের সামপ্রতিকতম স্তর হিসেবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে বোঝার জন্য কেবল কর্পোরেট পুঁজির একচেটিয়া কর্তৃত্বকে বোঝাই যথেষ্ট নয়। একচেটিয়া পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের আরো প্রকাশত্রে চিহ্নিত করা দরকার। এ-প্রসঙ্গে আমি সমির আমিনের একটি মডেলকে খানিকটা সমপ্রসারিত ক’রে প্রথমত একটা অনুচিত্রের মাধ্যমে তাকে উপস্থিত করতে চাই এভাবে :


হ্যাঁ, আমিন নিজেই সার্বিকভাবে একচেটিয়া আধিপত্যের পাঁচটি পরস্পর-সম্পর্কিত এলাকা বা বলয়কে শনাক্ত করেছেন : ১. প্রযুক্তিগত আধিপত্য, ২. বিশ্বব্যাপী ফাইন্যান্স বাজারের নিয়ন্ত্রণ, ৩. পৃথিবীর তাবৎ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আধিপত্য, ৪. মিডিয়া ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর আধিপত্য, এবং ৫. গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ওপর আধিপত্য (ক্যাপিটালিজম্‌ ইন দ্য এজ অব গ্লোবালাইজেশান্‌, পৃ ৪-৫)। এগুলোকে আমরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পঞ্চবলয়ও বলতে পারি। কারণ, বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রার যোগসাজশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ওই পরস্পর-সম্পর্কিত পাঁচটি বলয়ে তার প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য জারি রেখেছে, যদিও এই আধিপত্য সব েত্ের যান্ত্রিকভাবে একই ধরনের নয়। বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেতিে ওই আধিপত্যের হেরফেরও ঘটে। এই পাঁচটি বলয় নিয়ে এখন সংেেপ আলোচনা করা যাক।
প্রথমেই আসি প্রযুক্তি প্রসঙ্গে। কর্পোরেশনগুলো-বিশেষ করে মার্কিন কর্পোরেশন-ধনবান রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। আর এ-ধরনের আধিপত্য বিশাল ব্যয়ভার বহন ব্যতিরেকে অসম্ভবই বটে। আমিন ঠিকই বলেন, ‘বিশেষ করে সামরিক খরচাপাতির ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের সাহায্য ও সহযোগিতা ছাড়া আধিপত্যের বলয়ের অধিকাংশই টিকে থাকতো না’ (ক্যাপিটালিজম্‌ ইন দ্য এজ অব গ্লোবালাইজেশান, পৃ ৪)। আর মিশেল বড্‌ তো মনে করেন যে, সামপ্রতিক কর্পোরেট পুঁজিবাদ তথা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আসলে মূলত চেনা যায় তার প্রযুক্তিগত আধিপত্যের ভেতর দিয়েই। বড্‌ বলেন,

পুঁজিবাদ আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশী শক্তিশালী হয়েছে আর আমরা দেখছি পুঁজিবাদের এক নতুন যুগের সূচনাকে। এ-যুগে নতুন পণ্য আর প্রকল্পের উদ্ভাবনে কর্পোরেশনগুলো অভাবনীয় মাত্রায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে চলেছে। (এ হিস্ট্রি অব ক্যাপিটালিজম্‌, পৃ ৩০২)

বড্‌ ‘মহাপ্রযুক্তিময় পুঁজিবাদ’-এর কথাও বলেছেন। এ পুঁজিবাদেই আমরা প্রত্য করছি কিভাবে টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কগুলো বেঁধে ফেলেছে কম্পিউটার, ফোন এবং টেলিভিশনকে। আমরা এও দেখছি কিভাবে ‘সাইবার স্পেস’ উঁচুপ্রযুক্তির নমুনা হিসেবে হাজির হয়েছে। এছাড়া তো রয়েছেই কম্পিউটারায়িত শেয়ার বাজার। এভাবে অসংখ্য উদাহরণ জড়ো করা সম্ভব। তবে বোধ করি বিষয়টি এর মধ্যেই পরিষ্কার হয়েছে যে, বাজার থেকে যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত প্রায় সবেত্েরই উন্নত ও অগ্রসর প্রযুক্তির ব্যবহার করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেশনগুলোর প েযতোটা সম্ভব, অন্যদের প েততোটা নয়। আর তাদের জন্য প্রযুক্তি কেবল ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়, তা নিয়ে তাদের বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিস্তৃত হয়েছে অভাবনীয় মাত্রায়।
প্রযুক্তির পরেই আসে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আধিপত্যের বিষয়টি। বিশেষ ক’রে তৃতীয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ ও লুণ্ঠন করার েত্েরও ওই মার্কিন কর্পোরেশনগুলো (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সহযোগিতায়) সবচাইতে এগিয়ে আছে। এখানেও কোনো জাতি-রাষ্ট্রের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া এবং ত্রেবিশেষে এমনকি জাতি-রাষ্ট্রের বিভিন্ন দমনমূলক হাতিয়ার (যেমন সেনাবাহিনী) ব্যবহার করা ছাড়া পুঁজিবাদী কর্পোরেশনগুলো তৃতীয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদকে নিজেদের আয়ত্তে আনতে পারে না। অসংখ্য উদাহরণ দেয়া সম্ভব। তবে একটি পুরাতন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এখানে উপস্থিত করা যায়। নাইজেরিয়ার কথাই ধরা যাক। এই দেশের তেলসম্পদের প্রায় অর্ধেকটা চলে যায় ইঙ্গ-ডাচ কোম্পানী শেল-এর কাছে আর বাকি অর্ধেকের বেশীটা নিয়ে নেয় মার্কিন কোম্পানী শেভরন। এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো তাঁর আপসাইড ডাউন গ্রন্থে আমাদের জানাচ্ছেন যে, তেলসম্পদ লুটপাট করতে গিয়ে শেল ও শেভরন নাইজেরিয়ার অগোনি জনসমপ্রদায়ের ভূমি ও নদী-নালা সহ তাদের সমগ্র পরিবেশকেই ধ্বংস করে ফেলেছে।
নাইজেরিয়ার এ-অবস্থাকে চিত্রায়িত করতে গিয়ে নাইজেরিয়ার লড়াকু লেখক কেন্‌ সারো উইয়া নিজেই বলেছিলেন ‘মার্কিন কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ’-এর কথা। তিনি এ-কথা বলেই ান্ত হন নি। অগোনি জনসমপ্রদায়ের প েএবং সঙ্গে থেকেই সারো উইয়া লড়েছেন ওইসব কোম্পানীর বিরুদ্ধে; তাঁর লেখায় কর্পোরেশনগুলোর নগ্ন অপতৎপরতার বিভিন্ন দিক তিনি তুলে ধরেছেন এবং এও বলেছেন যে, তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট এবং ভূমি-ও-পরিবেশ-ধ্বংসের আরেক নাম ‘গণহত্যা।’ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ যেমন মানুষকে নির্দ্বিধায় হত্যা করে, কর্পোরেট পুঁজির প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটও ভূমি এবং পরিবেশকে ধ্বংস করার ভেতর দিয়েই মানুষকে হত্যা করে। এ-ধরনের অবস্থান থেকে টগবগে ভাষায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লেখালেখির জন্যই নাইজেরিয়ার লেখক কেন্‌ সারো উইয়াকে প্রাণ দিতে হয়। নাইজেরিয়ার সামরিক সরকার-শেল ও শেভরনের সুপারিশেই-সারো উইয়াকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলায়।
অবশ্যই নাইজেরিয়া একমাত্র উদাহরণ নয়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ নিঃসন্দেহে। পৃথিবীর তাবৎ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য প্রসঙ্গে মার্কিন ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড জিন তাঁর এ পিপলস্‌ হিস্ট্রি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস্‌ নামের গ্রন্থে আমাদের জানান যে, পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের শতকরা ষাট ভাগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার কর্পোরেশনগুলো বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ১১টি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদে মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর একচেটিয়া প্রবেশাধিকার রয়েছে। বলার অপো রাখে না যে, ইরাক এখন মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর লুটপাটের একটি প্রধান ত্রে। আর ঐতিহাসিকভাবে লাতিন আমেরিকা তো রয়েছেই। বিনিয়োগের নামে মার্কিন কর্পোরেশন এই মহাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ কিভাবে লুটপাট করেছে তার বোধ করি সবচাইতে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যাবে এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো’র সাড়া-জাগানো গ্রন্থ ওপেন ভেইনস্‌ অব ল্যাটিন আমেরিকা-তে। গ্যালিয়ানো রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি ইঙ্গিতজ্ঞাপক কূটাভাসকে চিহ্নিত করেন এই বলে যে, ‘যে-দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে যত সমৃদ্ধ, সে-দেশ তত দরিদ্র।’ (পৃ ৭৬) হ্যাঁ, বিভিন্ন সময়ে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ সেটাই প্রমাণ করেছে বটে।
এবারে আসি কর্পোরেট পুঁজির একচেটিয়া আধিপত্যের তৃতীয় বলয়ে। এটি গণমাধ্যম ও যোগাযোগের বলয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুগে আজ পৃথিবীর সবচাইতে বড়ো গণমাধ্যমগুলোর স্বত্বাধিকারী হচ্ছে গুটিকয়েক কর্পোরেশন। গণমাধ্যমবিশারদ রবার্ট ম্যাকচেছনি তাঁর দ্য নিউ গ্লোবাল মিডিয়া গ্রন্থে আমাদের জানান,

আটটি বহুজাতিক কর্পোরেশন এখন বৈশ্বিক গণমাধ্যমের বাজারকে শাসন করছে : জেনারেল ইলেকট্রিক (এন.বি.সি.’র স্বত্বাধিকারী), এ.টিএ্যান্ডটি/ লিবার্টি মিডিয়া, ডিজনি, টাইম ওয়ারনার, সনি, নিউজ কর্পোরেশন, ভিয়াকম (সিবিএস-এর স্বত্বাধিকারী) এবং বার্তেলসমানসহ সি-গ্রাম। (পৃ ২২)

এছাড়া তো এটা গত দশ বছরে বেশ পরিষ্কার হয়েছে যে, রূপার্ট মারডোক, সিলভিয়া বার্লুসকোনি এবং ওয়ারনার ভাতৃদয়সহ হেনরি লুচে মিডিয়া সম্রাট হিসেবে তাদের মিডিয়া-সাম্রাজ্য বিস্তৃত করে চলেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ও মহাদেশে। এরা বেতার-শিল্প, মুদ্রণ-শিল্প ও চলচ্চিত্র-উৎপাদনের ওপর তাদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব জারি রেখেছে, যেমন তারা নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে স্যাটেলাইট ও কেব্‌ল নেটওয়ার্কগুলো।
হ্যাঁ, বইপত্র এবং পত্রপত্রিকা থেকে শুরু ক’রে ভিডিও এবং খেলনাসহ টেলিভিশন প্রোগ্রাম এবং চলচ্চিত্র পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া-পণ্যের উৎপাদন, বিনিময়, বণ্টন ও ভোগের বিষয়টি গণমাধ্যম ও যোগাযোগের রাজনৈতিক অর্থনীতিকেই সামনে আনে। আর এই রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর আবারো ওই মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য জারি রয়েছে। নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারমান তাঁদের গ্রন্থ ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট-এ বর্তমান বিশ্বের মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদকে মার্কিন আধিপত্য দিয়েই বিচার করেছেন। তাঁরা বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব চাইতে উঁচু পর্যায়ের ২৪টি বৃহৎ মিডিয়া-সংস্থার আধিপত্যের কথা। চমস্কি ও হারমান আরো বলেন

এই চব্বিশটি মিডিয়া-সংস্থা নিজেরাই বড়ো আকারের মুনাফাভিত্তিক কর্পোরেশন। এদের মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ একচ্ছত্র ভাবে ধনবান ব্যক্তিদের হাতেই।...একটি বাদে উঁচু পর্যায়ের সকল কোম্পানীরই সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি...এই বৃহৎ মিডিয়া-সংস্থাগুলোর প্রায় তিন-চতুর্থাংশের কর-পরবর্তী মুনাফার পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন ডলারকেও ছাড়িয়ে যায় এবং তাদের গড় মুনাফা দাঁড়ায় ১৮৩ মিলিয়ন ডলারে। (পৃ ৪)

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, বর্তমান বিশ্বের মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে একচেটিয়া কর্পোরেট পুঁজির সামপ্রতিকতম স্তর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ কেবল রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয় নয়; তা সাংস্কৃতিকও বটে। প্রকৃতপ,ে মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির উৎপাদন-বিনিময়-ভোগ-বন্টনের েত্ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মার্কিন মিডিয়া-সংস্থাগুলো ব্যবসায় করার পাশাপাশি এবং ব্যবসার স্বার্থেই বাজারের মতাদর্শ ও পুঁজিবাদী মূল্যবোধ বিভিন্নভাবেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে থাকে। হ্যাঁ, সত্য, মিডিয়া তো কেবল প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠানই নয়, তা আখ্যানও বটে, যে-সব আখ্যানের পুনরাবৃত্ত প্রাত্যহিকতায় মগজ ও মনোজগতেরও বাজারায়ন ঘটে চলেছে এমনি এক মাত্রায় যে, মানুষের চিন্তা ও জ্ঞানের মূল্যও নির্ধারিত হয় বিনিময়-মূল্যের নিরিখে। ‘সবার ওপরে বাজার ও বিনিময়-মূল্য সত্য, তাহার ওপরে নাই’-এই মতাদর্শটাকে আধিপত্যবাদী এবং এমনকি একচেটিয়া করার েত্ের মার্কিন মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন গত দশ বছরে অভূতপূর্ব তীব্রতা লাভ করেছে, যে-কথাটি আমাদের জানাচ্ছেন মিডিয়া-নৃতাত্ত্বিক কেলি আসকিউ ও রিচার্ড উইলক্‌। তাঁরা আরো বলেন যে, মানুষের জন্য ‘বিশ্বের সংস্কৃতি’কে সংজ্ঞায়িত করার কাজ নিয়েছে এখন মার্কিন মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ।
এবারে আসকিউ ও উইলক্‌ থেকে একটি উদ্ধৃতি :

পৃথিবীর অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর সামনে এখন সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করে সি.এন.এন., হলিউড ও এম.টি.ভিসহ অন্যান্য মতাবান বৈশ্বিক মিডিয়া। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই স্থানীয় জনগণ মুদ্রিত চিত্রকল্পে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা চলচ্চিত্রে দূর-দেশের জীবনাচরণকে দৃশ্যমান দেখে। বেতার-সমপ্রচার, সঙ্গীত-ভিডিও এবং গণহারে উৎপাদিত ক্যাসেটের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ অপরিচিত গান-বাজনা এবং ভাষা শোনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। (পৃ ১)

অভিজ্ঞতা অর্জনের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়া তো ভালো কথা, কিন্তু সমপর্কিত হওয়ার অর্থ যদি দাঁড়ায় অসম বা বৈষম্যমূলক উৎপাদন-সম্পর্কের ও মতা-সম্পর্কের বিস্তার ও আগ্রাসন, তাহলে তো প্রশ্ন থাকবেই। এখানে মার্কিন মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদের আরেকটি আগ্রাসী চেহারার দিকে তাকানো যাক। হলিউডের চলচ্চিত্র, ম্যাকডোনাল্ডের বার্গার, লেভি-স্ট্রাউস কোম্পানির জিনস্‌, নাইকি কোম্পানীর জুতো, কোকা-কোলা কোম্পানীর পানীয়সহ অন্যান্য পণ্যকে জনগণের আফিমে
রূপান্তরিত করার মাধ্যমে। তৃতীয় বিশ্বে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীর কার্যকলাপ সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক শক্তি অর্জন করে। তাহলে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে: মার্কিন মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ নিজেই সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক-অর্থনীতিকে সাংস্কৃতিক করে তুলেছে। প্রকৃত প্রস্তাবে, একচেটিয়া পুঁজিবাদের সামপ্রতিকতম স্তরে সংস্কৃতির আলোচনা রাজনৈতিক অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনা সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে সবসময়ই অপর্যাপ্ত থেকে যায়।
এবারে ফেরা যাক একচেটিয়া আধিপত্যের আরেকটি বলয়ে-গণবিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র প্রসঙ্গে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান সময়ে যেমন, পুঁজিবাদের আগের পর্বেও তেমনি স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে, অস্ত্রের বিষয়টি একই সঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। মার্কিন পুঁজিবাদের প্রধান মুখপত্র ফরচ্যুন পত্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচ্ছদের উদাহরণ ব্যবহার করা যাক। ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের কিছু দিন পরে প্রকাশিত ফরচ্যুন পত্রিকাটির একটি বিশেষ সংখ্যার প্রচ্ছদে একটি ছবি ছাপা হয়। সে-ছবিটি ফোর্ড কোম্পানীর একজন হিসাব-ব্যবস্থাপকের। কিন্তু ছবিতে সেই ব্যবস্থাপককে দেখা যায় সামরিক পোশাকে। আর ছবির নিচে বেশ বড়ো হরফে লেখা আছে : ‘বাণিজ্য যুদ্ধে যায়।’
হ্যাঁ, যেখানেই যুদ্ধ, সেখানেই তো অস্ত্রের ব্যবসায় জমে ওঠে। আর যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের ব্যবসায়কেই আকৃষ্ট ও ত্বরান্বিত করে না; তা একই সঙ্গে ‘যুদ্ধকালীন পণ্যে’র উৎপাদন-বিতরণ-বিনিময়-ভোগের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকেও চালু রাখে। আর এভাবেই তো কর্পোরেশনগুলো মুনাফা লোটে। এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো তাঁর আপসাইড ডাউন গ্রন্থে লেখেন,

আমরা জানি যে, সন্ত্রাস উস্কে দেয় সন্ত্রাসকে, কিন্তু সন্ত্রাস আবার কোম্পানীগুলোর মুনাফাকেও বৃদ্ধি করে, যে-কোম্পানীগুলো সন্ত্রাসকে পণ্যে রূপান্তরিত করে তাকে পরে দৃশ্যকল্প হিসেবে বিক্রি করে। (পৃ ২৭১)

এ-প্রসঙ্গে অবশ্যই বলা দরকার বেলজিয়ামের প্রভাবশালী রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ আর্নেস্ট ম্যান্ডেল-এর লেট ক্যাপিটালিজম গ্রন্থটির কথা। যুদ্ধের সঙ্গে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ককে তিনি তত্ত্বায়িত করেছেন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই। লেট ক্যাপিটালিজম্‌-এ ম্যান্ডেল লেখেন,

তিরিশের দশকের শেষ দিক থেকেই সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতিতে অস্ত্রের উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।...অদূর ভবিষ্যতে এমন কোনো সম্ভাবনা নেই যে, চিরস্থায়ী অস্ত্রের অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতি কোনোভাবে হ্রাস পাবে। আর এভাবেই তো আমার ল্য করি সামপ্রতিকতম পুঁজিবাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিরস্থায়ী অস্ত্র অর্থনীতিকে। (পৃ ২৭৩-৭৪)

হ্যাঁ, অস্ত্র অর্থনীতির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিঃসন্দেহে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনিবার্য সামরিকায়িত চেহারাকেই নির্দেশ ও নির্দিষ্ট করে। আর ঊনিশ শতক থেকে আজ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের ইতিহাস একই সঙ্গে মার্কিন পুঁজিবাদের ইতিহাসও বটে। মার্কিন সামরিক ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ব্লাম আমাদেরকে জানান যে, ১৯৪৫ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বের ৬৯টি দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক যুদ্ধ পরিচালিত করেছে বা সামরিক হামলা চালিয়েছে। এবং ১৯৪৫ সাল থেকেই সারা পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ-অর্থনীতির ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর পরিসংখ্যান মোতাবেক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই অস্ত্র-ব্যবসায় পয়লা স্থান অধিকার করে আছে।
অস্ত্রের ব্যবসায় থেকে কিভাবে মার্কিন কর্পোরেশনগুলো মুনাফা লোটে তার অনেক উদাহরণ জড়ো করা সম্ভব। তবে এখানে শুধু বোয়িং কোম্পানীর কথা উল্লেখ করাটাই যথেষ্ট হবে। বোয়িং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম রপ্তানীকারী পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান, দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র-উৎপাদক এবং জাতীয় মিসাইল প্রতিরা প্রকল্পের বৃহত্তম ঠিকাদার। কেভিন মার্টিন ও তাঁর দলের একটি সমীা অনুসারে ‘বোয়িং-এর বার্ষিক আয় ২০০০ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মোট ৫১.৩ বিলিয়ন ডলারে’, (‘বোয়িং কর্পোরেশন,’ পৃ ৩৪)। ওই সমীা থেকে একটি উদ্ধৃতি :

বোয়িং-এর ‘এ-এইচ-৬৪/এ আপাচে’ বিক্রি করা হয়েছে মিশর, গ্রীস, ইজরায়েল, সৌদি আরব এবং যুক্ত আরব আমিরাতের কাছে। ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে ইজরায়েল ব্যবহার করেছে বোয়িং-এরই তৈরী করা হেলিকপ্টার। বোয়িং-এর ‘এফ-১৫ ঈগল’ বিক্রি করা হয়েছে ইজরায়েল, জাপান এবং সৌদি আরবের কাছে। আর অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফিনল্যান্ড, কুয়েত, মালয়েশিয়া, স্পেন এবং সুইজারল্যান্ডের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বোয়িং-এর ‘এফ/এ-১৮ হর্নেট।’ ইরাকের বিরুদ্ধে ১১ বছর ধরে বোমাবাজি অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ব্যবহার করেছে বোয়িং-এর ‘এফ-১৫’। বোয়িং তার নিজস্ব যুদ্ধ-বিমানের চাহিদাকে চিরস্থায়ী করার জন্যই কৌশলে অস্ত্র রপ্তানী করে থাকে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য আবার বোয়িং নিজেই নতুন নতুন অস্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদন করে। একই অস্ত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তিদের কাছেও বিক্রি করে থাকে বোয়িং। অস্ত্রের রপ্তানী আবার নিজেই উন্নততর ও ব্যয়বহুল প্রযুক্তির উদ্ভাবন দাবি করে, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যকে সবসময়ই নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। (‘বোয়িং কর্পোরেশন’, পৃ ৩)

ওপরে উদ্ধৃত আখ্যানটি চিরস্থায়ী অস্ত্র-অর্থনীতির চেহারাকেই তুলে ধরে। এই অর্থনীতির সঙ্গে পৃথিবীব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক উপস্থিতির বিষয়টিও যুক্ত বটে। জন বেলামি ফস্টার তাঁর ‘ইম্পিরিয়ালিজম এ্যান্ড এম্পায়ার’ নামের প্রবন্ধে জানান, ‘পৃথিবীর ৬৯টি দেশে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি আছে; এ-সংখ্যা কেবলই বাড়ছে।’ (পৃ ৫) হ্যাঁ, এভাবেই মার্কিন কর্পোরেশন, চিরস্থায়ী অস্ত্র-অর্থনীতি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়-বিশেষ করে এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকায়-মার্কিন সামরিক বাহিনীর সরাসরি উপস্থিতি ও হামলা গভীর ভাবে পরস্পর-সম্পর্কিত হয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামপ্রতিক ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককেই নির্দেশ করে।
এবারে আসা যাক আধিপত্যের পঞ্চম ও শেষ বলয়ে। সমির আমিন এ-বলয়ের নাম দিয়েছেন ‘অর্থের বাজারের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ।’ বিশ্বব্যাপী ফাইন্যান্স পুঁজির আনাগোনা বা আমদানী-রফতানী একচেটিয়া পুঁজিবাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বিদেশী মুদ্রার লেনদেনের বৈশ্বিক বাজার পর্যবেণে নিয়োজিত ‘ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস্‌’-এর পরিসংখ্যান মোতাবেক পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে যে-পরিমাণ অর্থ বিনিময় করা হয়, তার অংক ১,৪৯০,০০০,০০০,০০০ ডলার। শূন্যের এই অব্যাহত মিছিল কোনো পরাবাস্তববাদী প্রপঞ্চকে নির্দেশ করে না; বরঞ্চ তা নির্দেশ করে বিশ্বায়িত ফাইন্যান্স পুঁজির বাজারের বৈভব ও বিস্তার, গতি ও শক্তিকেই। এই বাজারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যাকে রাজনৈতিক-অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় ‘ফো’ বা ‘প্রবহ’। ওই বাজারের মোট আটটি প্রবহকে অল্পায়াসেই শনাক্ত করা যায় : ১. দেশ থেকে দেশে নিট দীর্ঘমেয়াদী সম্পদের প্রবহ; ২. প্রাতিষ্ঠানিক প্রবহ ; ৩. প্রাইভেট প্রবহ; ৪. প্রাইভেট ঋণ প্রবহ; ৫. বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রবহ; ৬. বন্ডের প্রবহ; ৭. পোর্টফোলিও ইকুইটির প্রবহ; এবং ৮. সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের প্রবহ। এ-সব প্রবহই অর্থের বাজারের চেহারাকে তুলে ধরে। আর মিশেল বড্‌ ও সমির আমিনের মতে এ-প্রবহের ওপর প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য করছে মার্কিন কর্পোরেশনগুলোই।
এখানে বলা দরকার যে, অর্থের বাজারকে গতিশীল করার েত্ের প্রযুক্তির ভূমিকা আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে অনেক। প্রযুক্তির কারণেই ল্য করছি ‘ভারচুয়াল’ শেয়ার বাজারের অভূতপূর্ব বিস্তৃতি। আর প্রযুক্তির কারণেই তো উদ্ভাবিত হয়েছে যাকে বলা হচ্ছে ‘ইলেকট্রনিক অর্থ’। হ্যাঁ, ওই প্রযুক্তির কারণেই অভাবনীয় অংকের টাকা বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে স্থানান্তরিত হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই। উড়ে-উড়ে ঘুরে-বেড়ানো এবং জুড়ে-বসা পুঁজির আরেক নাম ওই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই। আর এই পুঁজির দুনিয়া-সফরকে অবাধ করার েত্ের সহায়কের ভূমিকায় থাকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আই.এম.এফ. এবং ডাব্লিউ.টি.ও.।
তবে অর্থের বাজারের সঙ্গে পণ্যের বাজার যুক্ত থাকে বটে। বস্তুত, অর্থের বাজার পণ্যের বাজারকেও গতিশীল করে। সামপ্রতিক কালে পশ্চিমা মুলুকের কিছু কিছু রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক পুঁজির নতুন চেহারাকে বোঝার জন্য জল্পনামূলক পুঁজির ওপর জোর দিয়েছেন। এঁদের ভাষ্য অনুসারে বর্তমানের কর্পোরেশনগুলো পণ্যোৎপাদনের চেয়ে জল্পনামূলক পুঁজিতে বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের চেয়ে অর্থ দিয়ে অর্থ আনার বিষয়টিতে বেশী আগ্রহী হয়ে উঠেছে আজকের কর্পোরেশনগুলো। কিন্তু এর অর্থ আবার এও নয় যে, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে এখন উৎপাদন ও পণ্যের মৃত্যু ঘটেছে। মিশেল বড্‌ আমাদের জানাচ্ছেন যে, ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এই দশ বছরে পণ্যোৎপাদনের পরিমাণ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্যই ল্য করা যাবে বিশ্বব্যাপী মার্কিন পণ্যের ছড়াছড়ি-গাড়ি ও অস্ত্র থেকে টুথব্রাশ ও দাঁতের খিলাল পর্যন্ত। পুঁজিবাদের সেই পুরনো সংজ্ঞার্থটা এখনো কার্যকর ঠেকে : পুঁজিবাদ হচ্ছে সাধারণীকৃত পণ্যোৎপাদনের বৈশ্বিক ব্যবস্থা, যে-ব্যবস্থার বিকশিত রূপ আজ আমরা প্রত্য করি ওই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেই।



আগের অংশে আলোচিত আধিপত্যের পাঁচটি বলয়-যা আসলে পরস্পর-সম্পর্কিত-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামপ্রতিক ব্যাকরণকেই নির্দেশ করে। তবে আবারও বলা দরকার যে, বলয়গুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক সবসময় যে যান্ত্রিকভাবে কাজ করে তা নয়। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। আমরা জানি যে, তৃতীয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটের ইতিহাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে এগিয়ে আছে। কিন্তু এ লুটপাটের জন্য প্রয়োজন পড়ে প্রযুক্তির। প্রযুক্তির উদ্ভাবনে, উন্নয়নে এবং প্রয়োগেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আছে। কিন্তু নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির সরবরাহের েত্ের প্রচণ্ড সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। এ-সংকট একই সঙ্গে অর্থের ও পণ্যের বাজারের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছিল। এছাড়া আধিপত্য রা ও বিস্তারের েত্ের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অবশ্যই তার আপাত-প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপ ও জাপানকে মোকাবেলা করতে গিয়েও সংকটে পতিত হয়েছে একাধিকবার।
বলা দরকার, একচেটিয়া পুঁজিবাদ প্রতিযোগিতাকে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত করতে পারে না এবং পারে নি। এখানে আধিপত্য মানেই নিরঙ্কুশ আধিপত্য নয়; আর একচেটিয়া পুঁজিবাদ মানেই প্রতিযোগিতাহীনতা নয়। বস্তুত, আন্তঃপুঁজিবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ১৯৪৫ সাল থেকেই বিভিন্নভাবেই সংকটে পতিত হয়েছে, যার একটি খতিয়ান পাওয়া যাবে হাওয়ার্ড জিন-এর এ পিপলস্‌ হিস্ট্রি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস্‌-এ। এ খতিয়ান মার্কসের সেই পুরনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বকেই সামনে আনে : একচেটিয়া আধিপত্যই প্রতিযোগিতাকে উস্কে দেয় আর প্রতিযোগিতাই তৈরী করে একচেটিয়া আধিপত্য। ‘এ-দ্বান্দ্বিকতা আবার সাম্রাজ্যবাদকে সংকটাপন্ন করে,’ যে-কথাটা বলেছেন ডেভিড হারভি।
এখানে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সামপ্রতিকতম স্তর হিসেবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দুটো বড়ো সংকটকে মোটা দাগে চিহ্নিত করা যাক। প্রথম সংকটটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ঘিরেই আবর্তিত। এ-সংকটের বয়ান উপস্থিত করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই একাধিক তাত্ত্বিক ও লেখক : নোম চমস্কি, ম্যানিং ম্যারাবেল, মাইকেল এ্যালবার্ট ও পেরি নেলসন। এঁদের মতে গত প্রায় দুই দশক ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট বেড়েই চলেছে, যাকে আসলেই মোকাবেলা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প েসম্ভব হয় নি। এ-সংকটের খুঁটিনাটিতে প্রবেশ না-করেও কয়েকটি কথা অনায়াসেই বলা যায়। হ্যাঁ, সামরিক খাতে দানবীয় হারে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য খাতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। এর ফলে মধ্যশ্রেণীসহ শ্রমিক শ্রেণী ও দরিদ্র মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে। তার ওপরে রয়েছে শ্রম-সরবরাহের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। প্রকৃতপ,ে গত পনের বছরে বিত্তশালী হয়েছে আরো বিত্তশালী, দরিদ্র হয়েছে আরো দরিদ্র। পেরি নেলসন তাঁর দ্য ফিউচার ইজ আপটু আস গ্রন্থে লিখছেন, ‘সারা পৃথিবীতে তো বটেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও শ্রেণী সংগ্রাম আগের তুলনায় প্রবল হয়েছে।’ (পৃ ২১) হ্যাঁ, গত পনের বছরে বেড়েছে যেমন বেকার-সমস্যা, মার্কিন মধ্যশ্রেণী ও দরিদ্র জনগণের জন্য তেমনি কমেছে শিা ও স্বাস্থ্যের সুযোগ-সুবিধা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক সংকটের আরেকটি মাত্রা নিহিত আছে তার রাষ্ট্রীয় ঋণেই। এ ঋণের পরিমাণও মোটামুটিভাবে গত পনের বছরে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-এ কথাটা নোম চমস্কি ও হাওয়ার্ড জিন বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন একাধিকবারই।
কিন্তু আমরা তো দেখেছি যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুগে আধিপত্যের বিভিন্ন বলয়ে একচেটিয়া কর্তৃত্ব জারি রেখেই মার্কিন কর্পোরেশনগুলো তাদের লুটপাট ও মুনাফা বৃদ্ধি করেছে। তাহলে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট? হ্যাঁ, পুঁজিবাদের ইতিহাস বিসংগতি ও দ্বন্দ্ব উৎপাদনের ইতিহাসও বটে। পুঁজিবাদের বিকশিত রূপ হিসেবে সাম্রাজ্যবাদ সেই সব বিসংগতি ও দ্বন্দ্বকে জিইয়ে রাখে, এমনকি সমপ্রসারিতও করে। হ্যাঁ, মুনাফা-বৃদ্ধি মানেই জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। আসলে ওই মুনাফা-বৃদ্ধির সঙ্গে শ্রেণী-বৈষম্যেরই বিচিত্রমাত্রিক যোগাযোগ রয়েছে। লাতিন আমেরিকার লড়াকু কবি এনরিক লিন কথাটা তাঁর কবিতাতেই বলেন এ-ভাবে :‘তোমার ২+২ মানেই আমার ২-২’। মুনাফা প্রসঙ্গে আরেকটি কথা এখানে বলে নেয়া দরকার। ডেভিড হারভিসহ একাধিক রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ বলেছেন যে, মুনাফা বৃদ্ধির েত্েরও মার্কিন কর্পোরেশনগুলো ত্রেবিশেষে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, কারণ মুনাফা বৃদ্ধির হার আর মুনাফার পরিমাণ বা অঙ্কের বৃদ্ধি এক জিনিস নয়। হারভির মতে, কিছু কিছু মার্কিন কর্পোরেশনের মুনাফার সার্বিক পরিমাণ বছরে বছরে বেড়ে গেলেও বৃদ্ধির হার ন্বিমুখী হওয়ার প্রবণতাও দেখাচ্ছে। এই আপাত-পরো মুনাফা-সংক্রান্ত সংকটকেও খেয়াল করা দরকার।
এবারে আসি দ্বিতীয় সংকটের প্রশ্নে। আন্তোনিও গ্রামসির ওই পুরাতন কথাটা বোধ করি আরো সহজে বলা যায় এ-ভাবে : পৃথিবীতে এমন কোনো আধিপত্য নেই, যে-আধিপত্য একই সঙ্গে সকলকেই বশ করতে পারে, অধীনস্থ করতে পারে। আর আধিপত্য আবার তার বিপরীতকে অর্থাৎ বিদ্রোহকেও উস্কে দেয়। তরুণ চিকানো তাত্ত্বিক টোনি সারাগোসা তাঁর ‘কাস এ্যান্ড লেবার স্ট্রাগল’ প্রবন্ধে আমাদেরকে জানান, ‘কেবল ২০০০ সালেই এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং আই.এম.এফ.-এর বিরুদ্ধে প্রায় ২০০টি আন্দোলন শুরু হয়েছে।’ (পৃ ১) হ্যাঁ, বর্তমান সময়ের একচেটিয়া পুঁজিবাদকে বিভিন্নভাবে সংকটাপন্ন করে চলেছে পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনগুলো নিজেই। টোনি সারাগোসা একুশ শতকের একচেটিয়া পুঁজিবাদের ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের একটি আখ্যান তুলে ধরেন এভাবে :

সিয়াটল ও লস এঞ্জেল্‌সের রাস্তায় বিুব্ধ মানুষ নেমেছিল ডাব্লিউ.টি.ও. ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বিরুদ্ধে; মেলবোর্ন ও ডেভোসেও দেখা গেছে ওয়ার্ল্ড একনমিক ফোরামের বিরুদ্ধে জনতার ঢল। এছাড়া ওয়াশিংটন ডি.সি., ফিলাডেলফিয়া, এবং কিয়েভে মানুষ তাদের দুর্বৃত্ত পুঁজিপুষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। আই.এম.এফ.-এর নীতিমালার বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে মানুষ আর্জেন্টিনায়, বলিভিয়ায়, ব্রাজিলে, কলাম্বিয়ায়, কোস্তারিকায়, ইকুয়েডরে, হনডুরাসে, কেনিয়ায়, নাইজেরিয়ায়, তুরস্কে, দণি আফ্রিকায়। এছাড়া আই.এম.এফ. ও পুঁজিবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার হয়েছে প্রাগে। এশিয়া ডেভলপমেন্ট ব্যাংককে বন্ধ করে দেয়ার জন্য আন্দোলন চলছে হাওয়াই-এ। এমনকি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চলছে কলাম্বিয়ায়, ফিলিপাইনসে, ইন্দোনেশিয়ায়, পেরুতে, মেঙিকোতে। এছাড়া তো রয়েছেই মধ্যপ্রাচ্যসহ আরবজগত। (পৃ ১)

বলা দরকার যে, টনি সারোগোসা সে-সময়টাকে ওপরের আখ্যানে ধরেছেন, তা ১৯৯৯-২০০১। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত পুঁজিবাদবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে তীব্র মাত্রায়। ২০০৬ সালে একটি সাাৎকারে মার্কিন তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মী উইলিয়াম টাকামাৎসু টমসন জানান,

সেপ্টেম্বর ১১ থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, পেশাজীবী মানুষের আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, জাতীয় মুক্তির আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলন ইত্যাদি একটি কথা স্পষ্ট করেই বলে : একদিকে সাম্রাজ্যবাদ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় যেমন আগ্রাসী হয়েছে, ঠিক তেমনি বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়।

টমসনের ফর্দের অন্তর্ভুক্ত আন্দোলনগুলোর অনুপুঙ্খে প্রবেশ করার অবকাশ এখানে নেই। তার জন্য একটি আলাদা প্রবন্ধই রচনা করতে হয়। তবে বলা যাবে যে, ওই আন্দোলনগুলোরই তীব্র ধারাবাহিকতা ও সমন্বয় সাধন ছাড়া পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। ওই আন্দোলনগুলো এও বলে যে, আমাদের সময়ের একটি প্রধান ও প্রাথমিক সমস্যা হলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেই। এবং আরো বলে যে, বর্তমান সময়ের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে গেলে একই সঙ্গে সে-লড়াইকে জোরদার করতে হবে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যুক্ত তাবৎ মতা-সম্পর্কসহ জাতীয় শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধেও। এভাবেও বলা যায় : বর্তমান সময়ের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করার জন্য শ্রেণী সংগ্রাম যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি জাতীয় মুক্তির লড়াইও। অবশ্য এ দুয়ের মধ্যে যোগসাধন করা বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
সেই চ্যালেঞ্জকে বিবেচনায় রেখেই এও বোঝা দরকার যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একই সঙ্গে বর্ণবাদী ও পিতৃতান্ত্রিক। ফিলিপিনি মার্কসবাদী সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক ই. স্যান হুয়ান তাঁর রেইসিজম্‌ এ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ গ্রন্থে জানান যে, বর্ণবাদবিরোধী ও পিতৃতন্ত্রবিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতাকে পুঁজিবাদবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বিত না করলে এইসব আন্দোলনের কোনোটাই শক্তিশালী হবে না। মার্কস ও এঙ্গেলসের ওই কথাটা আবারো সময়ের তাগিদে জরুরি হয়ে ওঠে : সকল ধরনের শোষণ, নিপীড়ন ও শ্রেণী বৈষম্য থেকে সমাজকে মুক্ত না-করলে শ্রমিক শেণীসহ কোনো শোষিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জনগণ এখনও কোনোভাবেই মুক্ত নয়। ১৯৭১ সালে একটি পৃথক রাষ্ট্রিক সত্তা হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত ছত্রিশ বছরে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন কায়দায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেনদেন অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কিভাবে কাজ করেছে, তা বিশদভাবে বোঝাতে গেলে একটি আলাদা প্রবন্ধই লিখতে হয়। তবে একচেটিয়া আধিপত্যের যে পাঁচটি বলয়কে আমরা এর মধ্যেই চিহ্নিত করেছি, সেগুলো বিবেচনায় রাখলে অবশ্যই আমাদের শাসক শ্রেণীর সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যে-সম্পর্ক অব্যাহত আছে তা চট করেই বোঝা সম্ভব। আর এ সম্পর্কটা সবসময় খেয়ালে রেখেই আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনকে জোরদার করতে হবে। কিন্তু এ-আন্দোলনকে একই সঙ্গে হতে হবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। আসলে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতাকে আমাদের প্রাত্যহিক অনুশীলনে রূপান্তরিত করে তাকে অভ্যেসে পরিণত করাও আমাদের সময়ে সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজ।

তথ্যসূত্র

Amin, Samir, Capitalism in the Age of Globalization, London: Zed Books, 1997
Arrighi, Giovanni, The Long Twentieth Century, London: Verso, 1994
Askew, Kelly & Richard R. Wilk, eds. The Anthropology of Media. Malden: Blackwell Publishers, 2002
Bagdikian, Ben, The Media Monopoly. Boston: Beacon Press, 2000
Beaud, Michel, A History of Capitalism: 1500-2000. trans. Tom Dickman & Anny Lefebvre. New York: Monthly Review Press, 2001
Bishop, Maurice, Maurice Bishop Speaks: The Grenada Revolution, 1979-82. New York: Pathfinder Press, 1983
Blum, William, “War Against Terrorism or Expansion of the American Empire?” in Abuse Your Illusions: The Disinformation Guide to Media Mirages and Establishment Lies. ed. Russ Kick. New York: The Disinformation Company Ltd. 2003
Brewer, Anthony, Marxist Theories of Imperialism: A Critical Survey. 2nd ed. London and New York: Routledge, 1989
Chomsky, Noam, Hegemony of Survival: America’s Quest for Global Dominance. New York: Metropolitan Books, 2003
---, Pirates and Emperors, Old and New: International Terrorism in the Real World. Cambridge, MA: South End Press, 2002
---, Rogue States: The Rule of Force in World Affairs. Cambridge, MA: South End Press, 2000
Danaher, Kevin, ed. Corporations are Gonna Get Your Mama: Globalization and the Downsizing of the American Dream. Monroe: Common Courage Press, 1996
Dussell, Enrique, “Marx’s Economic Manuscripts of 1861-63 and the ‘Concept’ of Dependence,” Latin American Perspectives 65 (17/2) (Spring 1990): 62-101
Dyer-Witheforde, Nick, Cyber-Marx: Cycles and Circuits of Struggle in High-Technology Capitalism, Urbana: University of Illinois Press, 1999
Fortune Magazine, “Business Goes to War” (cover page). October 15, 2001. 144.7
Foster, John Bellamy, “Imperialism and ‘Empire.’” Monthly Review 53.7 (2001): 1-9
--- Naked Imperialism, New York: Monthly Review Press, 2006
Galeano, Eduardo, Open Veins of Latin America: Five Centuries of the Pillage of a Continent. trans. Cedric Belfage. New York: Monthly Review Press, 1973
--- Upside Down: A Primer for the Looking-Glass World. New York: Picador USA, 2000
Hardt, Michael and Antonio Negri, Empire, Cambridge, MA: Harvard University Press, 2000
Harvey, David, The New Imperialism. Oxford : Oxford University Press, 2003
--- Spaces of Hope, Berkeley: University of California Press, 2000
Harman, Edward and Noam Chomsky, Manufacturing Consent: The Politcal Economy of the Mass Media, New York: Pantheon Books, 2002
Lenin, V. I. Imperialism: The Highest Stage of Capitatism. San Francisco: Chian Books, 1965
- - -, “The State.” In Paul Le Blanc, ed. From Marx to Gramsci: A Reader in Revolutionary Marxist Politics. New Jersey: Humanities Press, 1996. 208-222
Magdoff, Harry, Imperialism Without Colonies. New York: Monthly Review Press, 2003
Mandel, Ernest. Late Capitalism, trans. Joris Des Bres. Norfolk: Lowe and Brydon, 1975
Marable, Manning, “The Economic Crisis and Globalization.” Left Turn 1 (2001): 1-4
Martin, Kevin, Tim Nafziger, Jeremy Schenk, & Mark Swier, “Boeing Corporation.” Z Magazine 14.11 (November 2001): 31-36
Marx, Karl, A Contribution to the Critique of Political Economy. New York: International Publishers, 1970
- - -, Capital Vol. 1, trans. B. Fowkes. New York: Vintage, 1977
- - -, Capital Vol. 2-3. trans. D. Fernbach. New York: Vintage, 1981
- - -, Grundrisse: Foundations of the Critique of Political Economy. trans. M. Nicoleus. New York: Random House, 1973
Marx, Karl and Friedrich Engels, The Communist Manifesto. intro. Eric Hobsbawm, London: Verso, 1998
McChesney, Robert W, “The New Global Media.” Nation 29 Nov. 1999. 23 Aug. 2001
McMurty, John, The Cancer Stage of Capitalism, London: Pluto Press, 1999
Murdock, Graham & Peter Golding, “Digital Possibilities, Market Realities: The Contradictions of Communications Convergence.” Socialist Register 2002. eds. Leo Panitch & Colin Leys. London: Merlin Press, 2001. 111-129
Ohmae, Kenichi, The End of the Nation-State: The Rise of Regional Economies, New York: Free Press, 1995
Robbins, Richard, Global Problems and the Culture of Capitalism, 2nd ed. Boston: Allyn and Bacon, 2002
San Juan, E. Jr, Racism and Cultural Studies. Durham : Duke University Press, 2002
Zaragosa, Tony, “Class and Labor Struggle.” dis / content 4.1 (2001) : 1-5
Zinn, Howard, A People’s History of the United States. New York : Harper Perennial, 2003

0 comments:

Note: Only a member of this blog may post a comment.